08/04/2026
রিপন ভিডিওর কথা আপনাদের মনে আছে? সহজসরল একটা মানুষ, ক্যামেরার সামনে বলেছিলো, "হাই, আই এম রিপন ভিডিও"। মনে থাকারই কথা। সরল একটা লোক হটাৎ করেই ভাইরাল। দেশব্যাপী আলোড়ন জাগলো। রিপনের পেইজ বড় হলো। রিপন টাকা ইনকাম করতে লাগলো।এই সমাজে ভাইরাল হওয়া মানে মানুষ হওয়া না। এটা একটা “কনটেন্ট” হয়ে যাওয়া।
এরপর তার পেছনে ব্যাক আপ দিতে লাগলো কিছু এক্সপার্ট লোকজন। তারা রিপনকে নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যান সাজালো। বিভিন্ন পন্য,এজেন্সী প্রমোট করালো। রিপন যে নেপাল গেলো, তাও কিন্তু একটা এজেন্সীর প্রমোটার হিসেবেই। টাকা ইনকাম করলো। অনেক গোবরমার্কা তথাকথিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা তার সাথে ভিডিও করেও নিজেদের আখের গুছানো শুরু করলো। ছাপড়ি মিডিয়ারাও দেশের এত এত সমস্যা রেখে রিপনকে হেডলাইন করে ফেললো। কারণ এদেশে সমস্যার চেয়ে “ট্রেন্ড” বেশি লাভজনক।
বললে অনেক কথা আসবে সব বাদ আপনারা জানেন রিপন এখন কি করে? কেমন আছে? হাইপ দেখেন? ভিডিও দেখেন?আমার জানতে ইচ্ছে করতেছে।আছে হয়তো ভালোই।
বলছিলাম তাজুর কথা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাদাসিধা একটা লোক। নিজের গ্রামের কথা অকপটে নিজের সামর্থ্যমতো ফুটিয়ে তুলতেন। চরাঞ্চলে গরু নদী সাতরেই পাড় হয় স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ব্রিজ চাইলেন, উপস্থাপন ও আউটফিটের জন্য ভাইরাল হলেন। টাকা পাচ্ছেন। এসব কিছুই সমস্যা না। সমস্যা হলো তার পিছনেও একদল সুযোগসন্ধানী লোক লেগে গেলো। পরশু একটা ভিডিও দেখলাম। একটা বাইক বিলের পথে কাত করে ফেলার পর ক্যামেরা অন করে তাজুকে দিয়ে বলাচ্ছে“ দেখুন ভাই দেখুন, আমাদের এখানে রাস্তাঘাট নাই এভাবে গাড়ি পড়ে যায়।”
ব্যাপারটা হলো এমন যে আমরা অনেক ভিডিও প্লে করলেই দেখি হালকা পানিতে অনেক মাছ। যাদের মাথায় ব্রেইন আছে তারা জানে মাছগুলো ওখানে ওরাই রাখে এবং ওভাবে ভিডিও করে পোস্ট করে। তাজুকে দিয়েও একই কায়দায় স্ক্রিপ্ট করে ভিডিও বানানো শুরু হয়ে গিয়েছে।। সমস্যার শুরুটা হয় যখন বাস্তবতা “স্ক্রিপ্টেড” হয়ে যায়। আর তাজুর ক্ষেত্রেও এটা শুরু হয়ে গিয়েছে।
তাজু এখন তাজু নেই,সে এখন অন্যদের হাতের পুতুল এখন তাকে শুধু ব্যাবহার করাই হচ্ছে। মিডিয়া, গণ্যমান্য ব্যক্তি,ছাপড়ি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর মাদা রচো দগন সবাই ওরে নিয়ে ফুটেজ খাচ্ছে। ওর এখন কোনো নিজস্বতা নাই। আর “নিজস্বতা হারানো মানুষই জগতে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।”
সে বেঁচে থাকে, কিন্তু নিজের মতো না। এই দেশে ওর থেকেও কষ্টে দিননিপাত করা সার্ভাইব করা অনেক মানুষ দেশের আনাচে-কানাচে রয়েছে। সব ফুটেজখোররা কিন্তুই ওরে নিয়ে মাতামাতি করে ওর জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলতেছে। মূলত দারিদ্র্যতাও এখন ভাইরাল না হলে অদৃশ্য।
সিলেটে ফুল বিক্রি করা মেয়েটা যথেষ্ট সুন্দর। হাসিটা মায়াভরা। যখন ভাইরাল হলো,বহু ফুটেজখোর মা দারচো দদের দেখলাম দায়িত্ব নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে গেছে। এই সমাজে এখন সহানুভূতিও প্রতিযোগিতা। “কে আগে দেখাতে পারে।” নামক এক প্রতিযোগিতা। অথচ আশেপাশে কত বাচ্চা সেসবের খবর নাই। আজকে একটা ভিডিও দেখলাম মেয়েটাকে দিয়ে একটা টিকটক ভিডিও করছে,মেয়েটা নাচতেছে। শিশুত্ব এখানে এখন আর টিকে না। ভাইরাল হলেই তাকে বানিয়ে ফেলা হয় চরিত্র।
সরল মানুষ এখানে সবচেয়ে সহজ পণ্য। তার অনুভূতি, তার ভাষা, তার সরলতা; সব বিক্রিযোগ্য। এই বর্বর, অসভ্য, ফুটেজখোর জাতি মানুষকে মানুষ ভাবে না,
একটা সুযোগ ভাবে। কেউ ভাইরাল হলেই তার জীবনে ঢুকে পড়ে অসংখ্য হাত।
সহায়তার নামে ব্যবহার, ভালোবাসার নামে শোষণ।হাইপ শেষ, মানুষও শেষ।
এই ফুটেজখোর মানসিকতা, এই সুযোগসন্ধানী সামাজিক অসুখ আসলেই কি কোনোদিন ভালো হবে?
-নিশান আহমেদ