04/10/2026
ইলমের আমানতদার ও সময়োপযোগী রাহবার: মুহাক্কিকুল আছর মাওলানা আব্দুল মালেক (হাফিজাহুল্লাহ)
জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে মুহাক্কিকুল আছর মাওলানা আব্দুল মালেক (হাফিজাহুল্লাহ)-কে নিয়ে যারা খতিবে আজম মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)-এর সাথে অহেতুক তুলনা টেনে খোঁচা দিচ্ছেন, তারা মূলত হিংসা ও অজ্ঞতার বহিরপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। সত্য কথা হলো, এমন তুলনা যারা করছেন—তারা এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের কারোরই প্রকৃত মাকাম অনুধাবন করতে পারেননি।
প্রথমত: এক অসম ও ভুল কিয়াসের প্রয়াস
মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)-কে এই আলোচনায় টেনে আনা এক চরম ভুল কিয়াস। তিনি ছিলেন স্বীয় যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খতিব এবং রাজপথের বীর সেনানী। তাঁর হক ও সত্যের গর্জন, তাঁর প্রজ্ঞা এবং রাজপথ কাঁপানো নেতৃত্ব এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। আমরা তাঁকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে রাখি, তিনি আমাদের মাথার তাজ।
কিন্তু আজ মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে সেই একই ছাঁচে মেপে মূল্যায়ন করতে চাওয়া ইতিহাসের গতিধারা না বোঝার শামিল। উবায়দুল হক (রহ.)-এর যুগ আর বর্তমান বাস্তবতা এক নয়। যেখানে জাতীয় মসজিদের মিম্বরকে রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের নোংরা চক্রান্ত চলে, সেখানে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মতো নিরপেক্ষ, নির্লোভ ও ইলমি গাম্ভীর্যসম্পন্ন ব্যক্তিত্বই সবচেয়ে বেশি অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত: কে এই মাওলানা আব্দুল মালেক?
যাঁকে নিয়ে অমূলক সমালোচনার তীর ছোড়া হচ্ছে, তাঁর জ্ঞানগত উচ্চতা সম্পর্কে আপনাদের সঠিক ধারণা আছে তো? তিনি কেবল একজন খতিব নন; বরং এই উপমহাদেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদদের একজন। তিনি মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং মাসিক আল-কাউসারের সম্মানিত সম্পাদক। এ দেশের দ্বীনি শিক্ষা অঙ্গনে তাঁর তাহকিক ও মতামত ছাড়া যেকোনো ফতোয়া বা হাদিসের উদ্ধৃতি একপ্রকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ছাত্র থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী—সবাই বিনম্রে যাঁর জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহন করতে ছোটেন। দারুল উলূম দেওবন্দের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বৈশ্বিক ইসলামী জ্ঞানমনীষীরা যাঁর ইলমি যোগ্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উলামা সম্মেলন থেকে শুরু করে ভারতের 'মাজমাউল ফিকহী'র কেন্দ্রীয় সেমিনারে যাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়—তাঁকে আজ রাজনীতিসর্বস্ব রাহবারি শেখানো এক পরম হাস্যকর চেষ্টা।
তাঁর রাহবারি কোনো মিছিলের অগ্রভাগে স্লোগান দেওয়া নয়; তাঁর রাহবারি হলো পুরো উম্মাহকে ভিত্তিহীন ফতোয়াবাজি, জাল হাদিসের বিভ্রান্তি, গোমরাহি এবং দ্বীনের বিকৃতি থেকে রক্ষা করা। উম্মাহর ঈমান ও ইলম হেফাজতের এই নীরবিচ্ছিন্ন সাধনাই কি সবচেয়ে বড় রাহবারি নয়?
তৃতীয়ত: রাহবারির রূপরেখা কেবল রাজনৈতিক হুংকার নয়
অনেকের কাছে রাহবারির একমাত্র সংজ্ঞা—মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক হুংকার দেওয়া, সরকারের সমালোচনা করা আর রাজপথ উত্তপ্ত করা।
মাওলানা আব্দুল মালেক (হাফিজাহুল্লাহ) সেই সংকীর্ণ সংজ্ঞার রাহবার নন; তিনি হলেন ‘ইলমের রাহবার’। তিনি এই ফিতনার যুগে বায়তুল মোকাররমের মিম্বরকে যাবতীয় নোংরা রাজনীতি ও সংঘাত থেকে মুক্ত রেখেছেন। যে মিম্বর থেকে একসময় সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের আওয়াজ উঠত, আজ সেখানে সহীহ হাদিসের দরস হয়, তাকওয়া ও আখলাকের কথা বলা হয়। জাতীয় মসজিদকে কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির দালানে পরিণত হতে না দিয়ে একে কুরআন-সুন্নাহর খাঁটি মারকাজ বানানোই তো মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)-এর আমানত রক্ষার আসল রূপ।
আসলে সমস্যার মূল উৎস অন্য জায়গায়। সমস্যা হলো—আপনারা মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে নিজেদের কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন না। তিনি কারো তল্পীবাহক নন, কারো ক্ষমতার রাজনীতির ঘুঁটি নন। আর এই সত্যনিষ্ঠ নিরপেক্ষতার কারণেই হয়তো আপনাদের চোখে তিনি "সফল রাহবার" হতে পারেননি।
এক জীবন্ত মহীরুহ ও জাতির জন্য অনুগ্রহ
জাতীয় মসজিদের খতিবের পবিত্র আসনে একজন চরম আমানতদার, মুত্তাকি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুহাক্কিক আলেম আসীন হয়েছেন—এটি আমাদের জাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অপার নিয়ামত। আসলাফ ও আকাবিরের জ্যান্ত নমুনা এই ইলমে নববির নীরব সাধক নাম-যশ বা খ্যাতির পেছনে ছোটেন না। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উম্মাহর আত্মশুদ্ধিই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। এ দেশের উলূমুল হাদিসের তিনি এক আলোকবর্তিকা ও অবিসংবাদিত "প্রাণপুরুষ"। আমাদের ভাগ্য যে, এই মহান মনীষী এই বাংলার বুকেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এখানেই দ্বীনের খিদমত করে যাচ্ছেন।
আসুন, এই মহান নিয়ামতের কদর করতে শিখি। অহেতুক সমালোচনা ও হিংসা ছড়িয়ে আলেমকুলের এই রত্নকে খাটো করার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকি।
মহান আল্লাহ তায়ালা হযরতকে পূর্ণ সুস্থতা ও সালামাতের সাথে দীর্ঘায়ু দান করুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর ইলমি ফয়েজ ও হেদায়েত থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
-মুফতি রেজাউল করিম আবরার
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক,
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ