10/08/2026
বাবুনগরীর দরবারে প্রধানমন্ত্রী: এ কি জমিয়তের সেই স্বপ্নের প্রতিফলন?
গতকাল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। সাক্ষাৎকালে তিনি আল্লামা বাবুনগরীর দোয়া নেন এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেন। এ সময় হেফাজতে ইসলামও উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছে।
ঘটনাটিকে নিছক একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম-প্রধান দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন ব্যক্তির দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ, দোয়া গ্রহণ এবং দিকনির্দেশনা নেওয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই পরিবর্তনের তাৎপর্য উপলব্ধি করছি?
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উলামায়ে কেরাম, দীন-ধর্ম ও ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যথাযথ সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শনের পথ যেন কখনো বন্ধ হয়ে না যায়, বরং রাষ্ট্র ও উলামায়ে কেরামের সম্পর্ক যেন আরও গভীর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হয় এবং এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়, সেটিই ছিল জমিয়তের রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। পাশাপাশি ইসলামকে ব্যবহার করে ধর্মের নামে ব্যবসা করা কোনো চক্রের ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে যেন উম্মাহর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়, সেই বিষয়টিও জমিয়তের চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কারণ রাষ্ট্রের বৃহৎ একটি অংশ যদি দীন, ধর্ম ও উলামায়ে কেরামের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর পরিণতি কখনোই শুভ হতে পারে না। একইভাবে উলামায়ে কেরাম ও দীনদার জনগোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতমুখী অবস্থানে চলে যায়, তাতেও দেশ ও জাতির কোনো কল্যাণ নেই।
বরং প্রয়োজন ছিল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রাষ্ট্র উলামায়ে কেরামকে সম্মানের জায়গায় রাখবে এবং উলামায়ে কেরামও রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।
বিগত নির্বাচনের সময় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ সেই চিন্তা ও লক্ষ্য নিয়েই রাজপথে ছিল। জমিয়তের সেই অবস্থানকে হেফাজতে ইসলামসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম স্বাগত জানিয়েছিলেন।
এটি শুধু একটি নির্বাচনী সিদ্ধান্ত ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরও বড় একটি বিষয়। দেশের বৃহৎ একটি দীনদার জনগোষ্ঠী যেন রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে না দাঁড়ায়, উলামায়ে কেরাম ও রাষ্ট্রের মধ্যে যেন স্থায়ী দূরত্ব তৈরি না হয় এবং দেশ যেন অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের দিকে না যায়, সেই চিন্তাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম সে সময় যে ভূমিকা পালন করেছেন, তার গুরুত্ব আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। একই সঙ্গে ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ও স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি করা একটি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র থেকেও জাতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।
আজকের বাস্তবতা দেখলে সেই সময়কার অনেক সিদ্ধান্তের তাৎপর্য নতুন করে বোঝা যায়।
একসময় যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্বকে প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখানো হতো, আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাই তাদের দরবারে যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে বসছেন, কথা বলছেন, দোয়া নিচ্ছেন এবং দিকনির্দেশনা শুনছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ তারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
এখানে জমিয়তের জন্য আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। বরং এটিকে বৃহত্তর একটি সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত। কারণ জমিয়ত যে পরিবেশের কথা বলেছিল, রাষ্ট্র ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে যে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল, আজ তার কিছুটা বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তবে মজার বিষয় হলো, এই সফলতার সুফল একা জমিয়ত ভোগ করছে না। ভোগ করছে গোটা বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রের সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সম্পর্ক ভালো হলে এর সুফল কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মান পেলে এর সুফল শুধু আলেমসমাজ পায় না। দীনদার জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে তার সুফল পুরো সমাজই পায়।
এমনকি আজ যারা সকাল-সন্ধ্যা জমিয়তের বিরোধিতা করছেন, জমিয়তের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তারাও এই পরিবেশের সুফল থেকে বাইরে নন। তারাও এই পরিবর্তনের সুবিধা ভোগ করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে অনেক সময় মানুষ বাস্তবতাকে স্বীকার করতে সংকোচবোধ করেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দুর্ভাগ্যজনক দিক।
রাজনীতিতে সব সিদ্ধান্তের ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। কোনো কোনো সিদ্ধান্তের ফলাফল বুঝতে সময় লাগে। কখনো কখনো একটি সিদ্ধান্তের সুফল সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দলটির চেয়েও বেশি ভোগ করে তার বিরোধীরাই।
তাই জমিয়তের রাজনীতিকে শুধু নির্বাচনে কতটি আসন পেল, কতটা সাংগঠনিক সাফল্য অর্জন করল কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে কী রাজনৈতিক সুবিধা পেল, এসব দিয়ে বিচার করলে জমিয়তের ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যাবে।
দেখতে হবে, দীন, উলামায়ে কেরাম, ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক কোন দিকে এগিয়েছে। দেখতে হবে, দেশের বৃহৎ একটি দীনদার জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ না হয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক রাখার সুযোগ পেয়েছে কি না। দেখতে হবে, দেশ ও জাতিকে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম ও ধর্মীয় নেতৃত্ব কী ভূমিকা রেখেছেন।
আমার কাছে জমিয়তের অন্যতম সফলতা এখানেই।
আজ হয়তো জমিয়ত এই সফলতার পুরো রাজনৈতিক সুফল ভোগ করছে না। কিন্তু যে পরিবেশ তৈরির জন্য জমিয়ত রাজপথে ছিল, তার সুফল আজ বাংলাদেশের মানুষ পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর দরবারে গিয়ে দোয়া নেন এবং দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেন, তখন এটিকে শুধু একটি দিনের সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করা হবে না।
এর মধ্যে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথের প্রতিফলন আছে। সেই পথের কোথাও জমিয়তের ভূমিকা আছে, উলামায়ে কেরামের দূরদর্শিতা আছে এবং সর্বোপরি আছে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণের চিন্তা।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির বক্তব্যকে নয়, সময়ের বাস্তবতাকেই সাক্ষী হিসেবে সামনে আনে।
আজ যারা জমিয়তের বিরোধিতা করছেন, তারাও হয়তো একদিন উপলব্ধি করবেন, কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য দলীয় লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাষ্ট্র ও উলামায়ে কেরামের সম্পর্ককে সুন্দর করে, দীনদার জনগোষ্ঠীকে সংঘাত থেকে দূরে রাখে এবং দেশ ও জাতির জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তাহলে তার সুফল শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই।
জমিয়তের সেই রাজনীতির মূল্যায়নও তাই সময়ের আলোকে হওয়া উচিত।
কারণ জমিয়ত যে পরিবেশ চেয়েছিল, আজ তার সুফল শুধু জমিয়ত নয়, গোটা বাংলাদেশই ভোগ করছে।
— কে এম তাহমীদ হাসান
সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ