06/04/2025
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের বর্বরতা: মুসলিম দেশগুলোর নীরবতা ইতিহাসের কালো অধ্যায়।
ফিলিস্তিনের মাটিতে আজ রক্তের হোলি চলছে। ইসরায়েলের বোমা, গুলি আর ট্যাঙ্কের নিচে শিশুদের লাশ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাসপাতাল, খাবার-পানির জন্য হাহাকার—এই দৃশ্য আর কতদিন দেখতে হবে? গাজায় যা চলছে, তা কোনো যুদ্ধ নয়, এটা স্পষ্ট গণহত্যা। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার পথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, যারা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কথা বলার কথা—মুসলিম দেশগুলো—তারা কোথায়? ইতিহাস বলে, তাদের নীরবতা আর ব্যর্থতা নতুন নয়, বরং এটা একটা পুরনো অভ্যাস।
ইতিহাস কী বলে?
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ফিলিস্তিনিদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়। সেই সময় আরব দেশগুলো—মিশর, জর্ডান, সিরিয়া—যুদ্ধে নামে বটে, কিন্তু ঐক্যের অভাব আর নিজেদের স্বার্থের কারণে তারা হেরে যায়। এরপর ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে আরব দেশগুলো আবার পরাজিত হয়, আর ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। কিন্তু এই পরাজয়ের পেছনে শুধু সামরিক দুর্বলতা নয়, মুসলিম নেতাদের দূরদর্শিতার অভাব আর পারস্পরিক দ্বন্দ্বও দায়ী ছিল। ১৯৭৩ সালে মিশর ও সিরিয়া কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও, শেষ পর্যন্ত মিশর ১৯৭৯ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি করে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করে, ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের দিকে না তাকিয়ে। এই বিশ্বাসঘাতকতা কি আমরা ভুলে যাব?
আধুনিক সময়ের ব্যর্থতা
আজকের দিনে এসে মুসলিম দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তা আরো স্পষ্ট। সৌদি আরব, যারা নিজেদের মুসলিম বিশ্বের নেতা বলে দাবি করে, তারা কী করেছে ফিলিস্তিনের জন্য? তাদের তেলের সম্পদ দিয়ে ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেত, কিন্তু তারা বরং আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে ব্যস্ত। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে (আব্রাহাম অ্যাকর্ড), ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছুরি মেরে। এই দেশগুলোর শাসকরা বিলাসিতায় ডুবে আছে, দুবাইয়ে আকাশচুম্বী ভবন বানাচ্ছে, আর গাজায় শিশুরা বোমার নিচে মরছে। এটা কি ন্যায়?
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু তুরস্ক এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক থেকে ইসরায়েলে তেল ও পণ্য রপ্তানি অব্যাহত ছিল, যখন গাজায় হামলা চলছিল। এই দ্বিচারিতা কি মুসলিম উম্মাহর জন্য গ্রহণযোগ্য? পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আছে, কিন্তু তারা ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যস্ত, ফিলিস্তিন তাদের অগ্রাধিকারে নেই। ইরান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলে, কিন্তু তাদের সমর্থন বেশিরভাগই প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে, সরাসরি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
OIC-এর অকার্যকারিতা
৫৭টি মুসলিম দেশের সংগঠন OIC কাগজে-কলমে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে কী? ২০২১ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলার সময় OIC একটি জরুরি বৈঠক করে, নিন্দা জানায়—এর বেশি কিছু নয়। তারা জাতিসংঘে একটি যৌথ প্রস্তাব আনতে পারত, ইসরায়েলের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দাবি জানাতে পারত। কিন্তু নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর পশ্চিমা শক্তির ভয়ে তারা পঙ্গু হয়ে আছে। ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে OPEC তেলের অস্ত্র ব্যবহার করে পশ্চিমাদের চাপে ফেলেছিল। আজ কেন সেই কৌশল ব্যবহার করা যায় না?
আমাদের দায়
ইসরায়েলের বর্বরতা থামাতে শুধু ফিলিস্তিনিদের লড়াই যথেষ্ট নয়। মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের ঘুম ভাঙা উচিত। তেল বন্ধ করুন, বাণিজ্য বন্ধ করুন, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করুন—এসব না করলে ফিলিস্তিনের রক্ত তাদের হাতেও লেগে থাকবে। সৌদি যদি আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের বদলে ফিলিস্তিনকে প্রাধান্য দেয়, আমিরাত যদি ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি না করে প্রতিবাদ করে, তাহলে কি পরিবর্তন সম্ভব ছিল না? এই নীরবতা আর স্বার্থপরতা ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আমরা সাধারণ মানুষ হয়তো সরাসরি যুদ্ধে যেতে পারি না, কিন্তু কণ্ঠ তুলতে পারি। ফিলিস্তিনের জন্য দাঁড়ান, সচেতনতা ছড়ান, মুসলিম নেতাদের চাপ দিন। এটা আমাদের ঈমানি ও মানবিক দায়িত্ব। ফিলিস্তিন একা নয়, আমরা তাদের সঙ্গে আছি।
#ইসরায়েলেরবর্বরতা #গাজায়গণহত্যা #মুসলিমঐক্য #ফিলিস্তিনেরপক্ষে #মানবাধিকার #মুসলিমবিশ্ব #ইসরায়েলেরগণহত্যা #মুসলিমবিশ্বেরব্যর্থতা