03/06/2025
১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে বিপর্যস্ত সমস্ত পৃথিবী। অ্যামেরিকাও এর বাইরে না। অভাব আর বেকারত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য, কাজের অভাবে এক শহর থেকে আরেক শহরে পানির স্রোতের মত ভেসে চলেছে মানুষ। ঠিক এই রকমই এক হট্টগোলের মধ্যে এই গল্পের সূচনা।
আমার বয়স তখন মাত্র ৫। স্কুলে যাওয়ার বয়স তখনও হয়নি। আমরা থাকতাম ৮৪১, ইনউড স্ট্রীটে। বাড়িটা অবশ্য এখন আর নেই। মা মারা যাওয়ার পর একবার দেখতে গিয়েছিলাম, ছিল না বাড়িটা, ফাঁকা প্লট আর একধারে একটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে, এই গাছের নিচেই একসময় খেলধুলা করতাম।
বাড়িটা খুব সুন্দর ছিল, আমার বাচ্চা বয়সের চোখে অনেক বড় মনে হত। আমরা রাস্তার উপরের দিকটাতে থাকতাম, প্রতিদিনই গোয়ালা, আইসক্রিমওয়ালা আর হরেকমাল বিক্রির ফেরিওয়ালারা ঘোড়ার ওয়াগন টানতে টানতে আসত দিনের বেচাকেনা করতে।
বাড়ির পিছনে ছিল একচিলতে উঠোন আর একটা গাছ। পিছনের গলি থেকে উঠোনটাকে আলাদা করার জন্য লাগোয়া একটা কাঠের বেড়া ছিল, গলির রাস্তাটা একটু ঢালু হয়েই নেমে গিয়েছিল একটা বিশাল ফাঁকা মাঠে, এখানেই এলাকার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত। মাঠের পিছন দিকটায় ছিল রেললাইন। প্রতিদিন ট্রেনে চলাচল করত, ট্রেনে করে মাঝে মাঝে সার্কাস আসত শহরে, আবার কখনও সৈন্য নিয়ে যেত রাতের অন্ধকারে, শ্ত্রুপক্ষের চোখ এড়াতে কামরার সব আলো নিভিয়ে ছায়ার মত চলে যেত। মাঝে মাঝে ট্রেনে কয়লা, গরু, সব্জি, আলু আর অন্যান্য রসদও যেত, আমি জানতাম কারন, সপ্তাহে অন্তত একবার মা আমাকে নিয়ে যেতেন রেললাইনের ধারে, ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়া আলু ব্যাগে করে আনতাম আমরা, এক ব্যাগ মাঝে মাঝে দুই ব্যাগও ভরে যেত আলু দিয়ে। আলুগুলো সিদ্ধ করে রাতের খাবার তৈরি করতেন মা। যেকোন জিনিষ সেটা যাই হোক না কেন সেটা দিয়েই মজাদার সব খাবার বানিয়ে ফেলা ছিল মায়ের অনেক গুণের ভিতর অন্যতম একটা গুন। এইকারনেই অভাব অনটনকে মোটেই পাত্তা দিতেন না তিনি। খুব সাহসী ছিলেন, কিছুকেই ভয় পেতেন না! ওহ না, ভুল হল, বজ্রপাতে অসম্ভব ভয় ছিল উনার!
ট্রেনে করে মাঝে মাঝে ভবঘুরেরাও আসতো, কাজের খোঁজে। প্রায় সপ্তায় একজন দুইজন আমাদের বাড়িতে আসতো সাহায্যের আশায়। মা অপরিচিত মানুষকে ভয় পেতেন না। বাড়ির দরজা বন্ধ করেই রাখতেন কিন্তু কেউ এসে কড়া নাড়লে খুলে দেখতেন, সাহায্যের জন্য যখন কেউ আসত, প্রথমে এক গ্লাস দুধ ধরিয়ে দিতেন হাতে, বারান্দায় বসিয়ে খাবার তৈরি করে দিতেন, তারপর যতক্ষন না তার খাওয়া শেষ হয়, পাশে বসে গল্প করতেন, দেশের অবস্থা, পারিবারিক অবস্থা এসব বিস্তারিত জানতে চাইতেন। আমাকে সবসময় বোঝাতেন, “এরা আমার বাবার মতই কাজের মানুষ, তফাত হল বাবার কাজ আছে কিন্তু এদের নেই তাই অভাবও তাদের অপরিসীম, কাজের খোঁজে এরা এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়ায়। এদেরকে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।“ আমাদের বাড়ির কাঠের বেড়ার গায়ে এক ধরনের সংকেতও লিখে রেখেছিলেন মা, বলেছিলেন এটা ভবঘুরেদের সংকেত, ওরা দেখলেই বুঝবে এখানে সাহায্য পাওয়া যাবে।
আমার গল্পের সাথে এই ভবঘুরেদের কিছুটা সম্পর্ক আছে আবার নেইও, সেটা বিবেচনাটা আপনাদের। আর বিবেচনার সুবিধার্থেই এই প্রেক্ষাপট রচনা করা।
মূল গল্পে ফিরে আসা যাক......
শরৎকাল, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। হাল্কা মেঘ আছে আকাশে, বেশ গরমও পড়েছে। আমি বাড়ির নিচতলায় বসার ঘরে খেলনা সৈন্যসামন্ত আর ট্রাক নিয়ে মশগুল। যুদ্ধ নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও সৈন্যদের প্যারেড খুব পছন্দের। তাই আমার সৈন্য আর ট্রাকগুলোকে প্যারেডের মত করেই কার্পেটর ধার ঘেঁষে বসার ঘর থেকে খাবার ঘর পর্যন্ত সাজিয়ে নিয়ে খেলছিলাম। ঘণ্টার উপর সময় চলে গেছে। মা উপরতলার ঘরগুলো পরিস্কারে ব্যাস্ত ছিলেন।
হটাত রান্নাঘরের বাইরের দিকের দরজায় ঠক্ঠক্ শব্দ। আমি সাধারণত গিয়ে দেখি কে এসেছে, প্রতিবেশি বা আমার দাদিদাদিদের কেউ হলে তবেই দরজা খুলে দেই, নাহলে মাকে ডাকি। দরজায় আমার সমান উচ্চতায় কাঁচের একটা জানালা লাগানো আছে তার ভিতর দিয়ে দেখা যায় বাইরের দিকটা। তাই ঠক্ঠক্ শুনে অভ্যাসমত উঠে গেলাম দরজার কাছে কিন্তু বাইরে কাউকে দেখলাম না। ফিরে এসে আবার খেলতে শুরু করলাম। আবার ঠক্ঠক্ আওয়াজ। উপর থেকে মা বলে উঠলেন, “তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না, দেখো না কে এসছে!”
আবারও দেখতে গেলাম। যথারীতি কেউ নেই। কিন্তু যেইমাত্র ঘুরে দাঁড়াতে গেলাম তখনই হ্যাট মাথায় দেয়া একজন মানুষের চেহারা ভেসে উঠল জানালার ওপাশে। হ্যাটটাও কেমন জানি অদ্ভুত, পুরনো আর আকৃতিহীন, কোন একসময় হয়ত ফেডোরার হ্যাট ছিল, এখন চাপ খেয়ে বসে গিয়ে মাথার মুকুটের মত লাগছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, হ্যাটটার নিচে কোন মুখে নেই, যেখানে মুখ থাকার কথা সেখানে হ্যাট থেকে একটা ন্যাকড়া মত কাপড় ঝুলে আছে নিচের দিকে, যেখানে চোখ থাকার কথা সেখানে শুধু একটা চেড়া দাগ। এইই— ধুসর রঙের ময়লা একটা ন্যাকড়া কাপড় ঝুলে আছে শরীরের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত, ব্যাস আর কিচ্ছু নেই। কাপড়ের নিচেও কাঁধ বা বুক বলে কিছু আছে মনে হল না, কাপড়টাই শুধু ঝুলে আছে উপর থেকে নিচের দিকে। হাতে হাতমোজা, সেটাও ওই ময়লা ন্যাকড়া কাপড়ের, সেই হাতটাই এখন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে জানালার দিকে, শূন্যে কিছুক্ষন ঝুলে থাকল তারপর হটাত ইশারা করল দরজাটা খুলতে একই সাথে মাথাটাও নোয়ানোর ভঙ্গিতে একটু নড়ে উঠল।
আমি নড়াচড়া করলাম না, করতে পারলাম না বলা ভালো। নিজের কাছেই নিজের গলার স্বর অদ্ভুত লাগলো, অনেকটা দুঃস্বপ্ন দেখে তীব্র আতংকে কেঁদে উঠার মত শোনা গেল। প্রথমে চিঁ করে ছোট একটা শব্দ তার পরপরই তীব্র চিৎকার। গা শিউড়ে উঠার জন্য যথেষ্ট।
সাথে সাথেই মা এসে হাজির। আমি তখন বাঁশপাতার মত থরথর করে কাঁপছি। কি দেখেছি বললাম, আদ্যোপান্ত। উনি দরজা খুলে দেখতে গেলেন, কিন্তু চতুর্দিক খুঁজেও কিছু পেলেন না, কোথাও কিছু নেই, না পায়ের ছাপ, না গ্লাসের টুকরা, জনমানুষ তো দুরের কথা কোন পশুপাখিরও চিহ্নমাত্র নেই। মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আমার কল্পনা শক্তি নাকি অসাধারণ! একটু বিরক্তও মনে হল, হয়ত ভাবছেন তাকে নিচে আনানোর জন্যই এসব ফন্দী বের করছি আমি। নিজের কাজে ফিরে গেলেন আবার।
মিনিটও পার হয়নি আবার ঠক্ঠক্। এইবার সামনের বারান্দার দরজায়, মা আবার দেখতে বললেন, কে এসেছে । প্রচন্ড দ্বিধা আর ভয় নিয়ে দরজার কাছে গেলাম। যেই ভয়টা পাচ্ছিলাম, ঠিক তাই, দরজার কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সেই মাথায় হ্যাট, ময়লা কাপড় পড়া লোকটা, অস্থিরভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর হাত দিয়ে ইশারা করছে দরজাটা তাড়াতাড়ি খুলতে । শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি, প্রায় একযুগ পরে মনে হল নড়ার শক্তি পেলাম, ধীরে ধীরে পিছাতে শুরু করলাম, তারপরই চিৎকার করে মাকে ডেকে উঠলাম। মা আবারও চলে আসলেন চোখের পলকে, এবার উনাকেও কিছুটা ভীত মনে হল। প্রতিবারই দরজায় ধাক্কানোর শব্দ পেয়েছেন উনি। দ্বিতীয়বারের ধাক্কাটা এতটাই জোরে ছিল, যেটা পাঁচ বছর বয়সী একটা বাচ্চার পক্ষে করা অসম্ভব। চট করে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে সামনের আর পিছনের দরজার কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন, সামনের দরজা খুলে বারান্দায় বের হয়ে আসলেন, নাহ, কিছু নেই, কিচ্ছু নেই।
মিসেস হোয়াইট তার বাড়ির উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিলেন। নাহ তিনিও কিছু দেখেননি। মা আমাকে নিয়ে বাড়ির পিছনের উঠোনে গেলেন, আমি তার গলা শক্ত করে ধরে ছিলাম, আমার হাত ছাড়িয়ে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। আমি কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম তারপর খুব আত্নবিশ্বাস আর দৃঢ়তার সাথে বললাম, ওটা স্বয়ং “মৃত্যু” ছিল।
মা চমকে উঠলেন, ভয়ে কেঁপে উঠলেন যেন একটু, “এসব কি কথাবার্তা?”
আমরা বাড়িতে এসব কথা কখন আলোচনা করি না। সমস্ত পৃথিবীতেই যুদ্ধ হচ্ছে, আমার চাচারাও যুদ্ধে গেছেন, কিন্তু আমার কাছে যুদ্ধটা শুধুই পতাকা আর প্যারেড ছাড়া আর কিছু না। মৃত্যু কি, কেন এসব আমার জানার বাইরে।
“বাজে কথা বলছো কেন?”
“ওটা মৃত্যুই,” নির্বিকারভাবে বলে উঠলাম আমি, “মৃত্যুই হবে”। তারপরই কান্না শুরু করলাম, “আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি মা, না বাবা?” এই প্রশ্নগুলো শেলের মত এসে বাঁধল বুকের ভিতর, হেঁচকি দিয়ে কেঁদে উঠলাম, পায়ের নিচে মাটি যেন সরে যাচ্ছে।
“না, না, এসব বাজে কথা, কোন ভবঘুরে হবে হয়ত, বা কোন গরিব মানুষ, আগুনে পুড়ে ঝলসে গেছে শরীর আর তুমি ভয় পেয়েছ দেখে পালিয়ে গেছে।” সান্ত্বনা দিলেন মা।
খেলায় ফিরে গেলাম আবার, বাবা কাজ থেকে ফিরে এলেন, রাতের খাওয়া সেরে ঘুমাতে গেলাম সবাই, সবকিছুই স্বাভাবিক।
সেই রাতে আমাদের পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মিসেস রায়ান ঘুমের ভিতরেই মারা গেলেন। ঘুম থেকে উঠে মা আর মিসেস হোয়াইটকে বাড়ির পিছনের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ করছেন শুনলাম। রোদ্রস্নাত পরিষ্কার সকাল। আমি পাজামা পড়েই তাদের কাছে গেলাম, যেতে যেতে শুনলাম চাপা স্বরে তারা গতকালে আমার অভিজ্ঞতা আর আমার বলা কথা নিয়ে আলাপ করছেন। আমি কাছে যেতেই মা আমার হাত ধরে বাড়ির ভিতর ফিরে আসলেন।
বললাম, “ওটা মৃত্যুই ছিল, ঠিকানা ভুলে আমাদের বাড়িতে এসেছিল।”
“বোকার মত কথা বল না” ধ্মকে উঠলেন মা, “ এটা কাকতালীয় ঘটনা ছাড়া কিছু না।” কথাটা নিজেও খুব একটা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হল না, আমিও তেমন গুরুত্ব দিলাম না উনার কথাকে, কারন আমি জানি, আমি কি দেখেছি।
তারপর আর কোনদিন দেখিনি ওই ময়লা কাপড় পড়া লোকটাকে। মৃত্যু আমাদের আশেপাশে অনেকবারই এসেছে কিন্তু ওই বেশে আর দেখিনি কোনদিন। মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এইরকমই ছিল ব্যাপারটা।
২০০০ সাল। মা বাড়িতে একাই থাকেন। একজন নার্স আর একজন কেয়ারটেকার দেখাশুনা করে উনার। ৯২ বছর বয়স হতে আর মাত্র এক মাস বাকি, প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে গেছেন, স্মৃতিশক্তি প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে, খাবার খাওয়ার তিন মিনিট পরেও বলতে পারেন না খেয়েছেন কিনা। একমাত্র আমাকে একটু চিনতে পারেন, কথা বলেন, হটাত হটাত বাবার সাথে গুলিয়ে ফেলেন যদিও, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৩০, ১৯৪০ এমনকি ১৯৫০ সালের কিছু কিছু ঘটনা উনার ভালোই মনে আছে। মাঝে মাঝে গল্পের ছলে ময়লা কাপড় পড়া লোকটার কথা তুলি আমি, উনি তখন চুপ করে থাকেন, বুঝি তার ঠিকই মনে আছে, কিন্তু এই ব্যাপারে কথা বলতে চান না উনি।
অফিসের কাজে আরেক শহরে যেতে হয়েছিল, প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে ফ্যাটে ফিরলাম, ফ্রেস হয়ে, রাতের খাওয়া খেয়ে শুয়ে পড়লাম, ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ব্যাস্ততার কারনে মায়ের খবর নেয়া হয়নি এই কয়দিন, সকালবেলায় অবশ্যই ফোন করব আর সম্ভব হলে বিকালে গিয়ে দেখা করে আসব এই প্রতিজ্ঞা করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
হটাতই ঘুম ভেঙ্গে গেল, চুপচাপ শুয়ে থেকে বুঝার চেস্টা করছি, কেন ভাংলো। দুরের গির্জায় রাত দুইটা বাজার সংকেত দিচ্ছে। নাহ এই শব্দে তো ঘুম ভাঙ্গার কথা না। আমার রুমটা দোতালায় সামনের দিকে রাস্তার উপর, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো রুমের ভিতর হাল্কা একটা আভা ছড়াচ্ছে। শুয়ে শুয়েই এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে চেস্টা করছি সমস্যাটা কি, হটাত মনে হল পায়ের দিকে জানালাটার ওপাশে কি যেন একটা, ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, সেই মাথায় হ্যাট পড়া, মুখের সামনে কাপড় ঝুলে থাকা লোকটা, জানালার একদিক থেকে হেটে আরেকদিকে চলে গেল, এটা কিভাবে সম্ভব? জানালার ওপাশে তো কোন বারান্দা নেই! লাফ দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকালাম, শূন্য রাস্তা খাঁ খাঁ করছে, একটি মাত্র ল্যাম্পপোস্ট তার দুর্বল আলোয় রাতের অন্ধকার দূর করেতে গিয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্ধকার যেন আরও জেঁকে বসেছে রাস্তার আনাচেকানাচে। জনমানুষের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। হটাত ছোটবেলার সেই ভয়টা ফিরে আসল, শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোতের একটা ধাঁরা বয়ে গেল উপর থেকে নিচের দিকে, মে মাসের গরমেও একটা শীতল অজানা ভয়ে হাতপা কাঁপছে, যুগযুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছি যেন আমি, নড়তে পারছি না কোনভাবেই, কিছুক্ষন পরে হটাত শরীরে একটু যেন শক্তি ফিরে পেলাম, পিছন দিকে হেঁটে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসলাম তারপর চট করে বালিশটা নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লাম, ভয়ে ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারি না, ঘুম ভাঙ্গল ফোনের শব্দে, রিসিভার তুলতেই ওপাশ থেকে মায়ের নার্স জানালো, মা আর পৃথিবীতে নেই, ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, গত রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে কোন এক সময় উনার মৃত্যু হয়েছে।
------
অজ্ঞাত ভবঘুরে এবং একটি সত্যি ঘটনা।
মূল গল্প - কিম –জি ডেল
অনুবাদক - হাফিজুর রহমান।