22/08/2023
পুরুষের টাকনুর নিচে কাপড় পরা অর্থাৎ প্যান্ট-পায়জামা-লুঙ্গি পরার বিষয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা বা ভ্রান্ত প্রচার সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যাঃ
" টাকনু-গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলানো সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানঃ আমাদের হুজুরদের বিজ্ঞান ভাবনা"
-------------------------------------------------
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
ইদানীং আমাদের কিছু হুজুরদের ট্রেন্ড হয়ে গেছে, সাইন্স সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান না থাকার পরও কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফ থেকে সাইন্স খুঁজে বের করতে চেষ্টা করা। এটা মূলতঃ খারাপ না। কুরআন হাদিসে সাইন্টিফিক ফ্যাক্টস খুঁজে পেলে ইমান তাজা হয়, মানুষের কাছে বর্ণনা করলে তাদেরও ইমান তাজা হয়। কুরআন হাদিসে এরকম বহু সাইন্টিফিক ফ্যাক্টস আছে, যা ই'জাযুল কুরআন বা পবিত্র কুরআনের মু'জিযা নামে পরিচিত।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হুজুরদের সাইন্স সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান না থাকার কারণে এমন সব আজগুবি কথা বলেন যে, ইসলাম বিদ্বেষী শিক্ষিত ও এলিট সোসাইটিতে ইসলাম নিয়েই মানুষ উপহাস করে, কারণ সবার তাকওয়া ও সহনশীলতার লেভেল এক সমান না। তেমনি একটি সমস্যা নিয়ে আজ কিছুটা আলোকপাত করব ইন শা আল্লাহ।
আমি শতভাগ নিশ্চিত যে, অল্প কিছু হুজুরকে ওয়াজে বলতে শুনেছি এবং এটা ফেসবুকে লিখিত আকারেও ভাইরাল করা হয়েছে, টাকনুতে সেক্স হরমোন থাকে এবং টাকনু গিড়া খোলা রাখলে তাতে বাতাস লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি, এতে বায়োলজিকাল উপকার আছে। টাকনুতে বাতাস লাগলেই যদি হরমোন বের হয়, তো প্রিয় নবিজির ﷺ সব সময়ের আমল ছিল মোজা দিয়ে টাকনু ঢেকে রাখা। তো তখন বাতাস কিভাবে লাগত?
মোজা পড়া সুন্নাত, তাও চামড়ার তৈরি মোজা। তো বাতাস কেমনে লাগত টাকনুতে তখন?
আসলে টাকনু গিড়াতে সেক্স হরমোন থাকে এটা বায়োলজির বইয়ের দূর দূর থেকে কোথাও নেই। যতটুকু আমি রিসার্চ করেছি। এমন কোন কথা বলা উচিত না যা শুনে ইসলাম বিদ্বেষীরা মুখ টিপে হাসে। আজগুবি কথা থেকে আমরা দয়া করে বিরত থাকি। ইসলাম এমনিতেই সাইন্টিফিক। বানোয়াট আজগুবি কথা বলে ইসলামকে সাইন্টিফিক প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
মূলতঃ টাকনুর নিচে, কব্জির নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়াকে হুজুর রাসূলুল্লাহর ﷺ জমানাতে কিংবা জাহেলিয়াতের যুগে অহংকার ও শৌর্য বীর্যের পরিচায়ক মনে করা হত। সেজন্য এই কাজ থেকে হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন।
সকল ফুকাহায়ে কেরামগণ (ইসলামিক আইনবেত্তাগণ) এই বিষয়ে একমত যে, অহংকার (الخيلاء ও বাতরান দুটো শব্দ এসেছে, দুটোর অর্থই অহংকারবশতঃ) বশতঃ টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়া হারাম এবং কবিরা গোনাহ। কিন্তু অহংকার ছাড়া টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়া যাবে কিনা এ নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামগনের মাঝে মতপার্থক্য আছে। কেউ বলেছেন হারাম, কেউ বলেছেন মাকরুহ , কেউ বলেছেন জায়েজ। তবে চার মাজহাবের বেশিরভাগ ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, এটা হারাম নয়।
১.ইবনু মুফলিহ "আদাবুশ শরীয়াহ" কিতাবে লিখেছেন, (খন্ড ৩: পৃষ্ঠা ৫২১) ইমাম আজম হজরত আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ কে মাটিতে কাপড় ঝুলিয়ে চলতে দেখে জিজ্ঞেস করা হলো "আমাদেরকে কি এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়নি?" তখন তিনি জবাব দিলেন নিশ্চয় তা অহংকার (الخيلاء) বশত টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে যারা চলে তাদের ব্যপারে, আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। ( আরো দেখুন: ফতোয়া আল হিন্দিয়া , খন্ড ৫: পৃষ্ঠা ৩৩৩)
২.মালেকি মাজহাবের কেউ কেউ একে হারাম বলেছেন। যেমন ইবনুল আরাবী, কারাফি প্রমুখ।
কিন্তু মালেকি মাজহাবের বিখ্যাত আলিম হাফিজ ইবনু আব্দিল বার তাঁর "তামহিদ" কিতাবে( খন্ড:৩/পৃষ্ঠা ২৪৪) বলেছেন, হাদিছ অনুযায়ী অহংকার ছাড়া যারা কাপড় ঝুলিয়ে চলবে তারা এই শাস্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এটা ভাল কাজ নয়।
৩.শাফেয়ী মাজহাবের বেশিরভাগের মত হচ্ছে অহংকারবশত: না হলে এটা জায়েজ।
ইমাম নববী তাঁর "আল-মাজমু " কিতাবে (খন্ড:৩/পৃষ্ঠা ১৭৭) লিখেছেন,ইমান শাফেয়ী (রাহ:) বলেছেন, নামাজে এবং নামাজের বাইরে সর্বাবস্থায় অহংকার (الخيلاء) বশত: টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়া হারাম। কিন্তু অহংকার ছাড়া টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়াতে অসুবিধা নাই।
৪.হাম্বলী মাজহাবের মত: বেশিরভাগই বলেছেন হারাম নয়। "আল ইকনা" কিতাবে (খন্ড:১/পৃষ্ঠা ১৩৯) বলা হয়েছে, পুরুষের কাপড় কারণ ছাড়া টাকনুর নিচে পড়াকে মাকরুহ করা হয়েছে।
ইমাম ইবনে কুদামাহ আল হাম্বালী যিনি ইবনে তাইমিয়্যার দাদা শায়খ "আল মুগনী" কিতাবে বলেছেন, জামা, পায়জামা টাকনুর নিচে পড়া মাকরুহ। আর যদি কেহ অহংকার (الخيلاء) বশত: টাকনু গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়ে তবে তা হারাম।
ইবনু মুফলিহ "আল-আদাবুশ শরীয়াহ" কিতাবে লিখেছেন, (খন্ড ৩: পৃষ্ঠা ৫২১) , হাম্বলী মাজহাবের বিখ্যাত আলিম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও একে হারাম নয় বলেছেন। (আরো দেখুনঃ ইবনে তাইমিয়্যাহ রচিত "শরহুল উমদা" পৃষ্ঠা: ৩৬১-৩৬২)
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: হাম্বালী মাজহাবের অনুসারী দাবীদার (আসলে তারা লা মাজহাবী) শায়খ ইবনে উসাইমিন, বিন বাজ সাহেবসহ সমসাময়িক আলিমরা একে হারাম বলেছেন।
এখন দয়া করে আমাকে ভুল বুঝার আগে, যেসব হাদিসের ভিত্তিতে উপরের আলোচনা এবং হুকুমসমুহ ফুকাহায়ে কেরাম দিয়েছেন সেসব হাদিস একটু দেখে নিন নিচের ফটো কমেন্টগুলোতে। সবগুলো হাদিসই বোখারী শরীফের পোশাক পরিচ্ছদ অধ্যায়ের। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অনুবাদ করা।
আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসুল ﷺ ই সর্বাধিক জ্ঞাত।