24/05/2025
ক্লায়েন্ট আর ডিজাইনার—দুইটা প্রাণীই মানুষ, কিন্তু কথায় কথায় এমন লাগে যেন একজন জলজ আর একজন স্থলজ। এরা একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু মাঝেমধ্যে যা হয় না, সেটা বিটলামি নামে ইতিহাসে ঢুকে পড়ে।
একদিন মাঝরাতে ফ্রী ফায়ার গেইম খেলে কনটেস্টের জন্য লোগো বানাতে বসলাম, আমার আবার মাঝরাত ছাড়া কনসেপ্ট আইডিয়া মাথায় আসে না।🥺 ইনবক্স খুলতেই ক্লায়েন্ট এর একখানা মেসেজ:
"ভাই, আমার একটা লোগো দরকার। ব্র্যান্ডের নাম এখনও ঠিক করিনি, কিন্তু লোগোটা যেন নাম অনুযায়ী হয়!" এইটা হচ্ছে ‘আলু দিয়ে মুরগি রান্না, কিন্তু আলু-মুরগি দুটোই অনুপস্থিত’ টাইপ অনুরোধ।
অবশ্য, কিছু ক্লায়েন্ট থাকেন যারা খুব আন্তরিক। "ভাই, সময় নেন, আমি প্রেশার দিচ্ছি না। তবে আজ রাতের মধ্যেই যদি হয়ে যেতো..." মানে, ১ কেজি মুড়ি মাত্র ৫ টাকা কিন্ত ৩ মিনিটে খেতে হবে এইরকম অবস্থা।😒
তবে কিছু ক্লায়েন্ট আছেন, যাদের জন্য ডিজাইনারদের ঈমান-আখলাক ঠিকঠাক থাকে। "ভাই, আমি কিছুই বুঝি না। আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে আমার বউকে দেখিয়ে একবার নেব..." বউ দেখেই যদি ফাইনাল হয়, তাহলে ভাই ডিজাইন বাদ দেন, বাসি ভাত গরম করেন।😁
অন্যদিন আরেক ক্লায়েন্ট বললেন, ভাই, সময় একদম নাই, ৩ দিনের মধ্যে লোগো লাগবেই। আমি বললাম, ভাই, আপনার ব্রান্ডের মিশন, ভিশন, টার্গেট অডিয়েন্স, কালার প্যালেট, টাইপোগ্রাফি সহ বিস্তারিত ব্রিফ দেন। উনি বললেন, লোগোর নাম দিচ্ছি সময় কম, আপনি নিজেই কিছু আইডিয়া করে দেন। আমি তো জানি আপনি জিনিয়াস। (এইখানে আমি বুঝে গেলাম, আমার মাথার ঘাম দিয়ে উনি তার ব্র্যান্ডের ছাতা বানাবেন।)
আমি কথা মতো দীর্ঘ সময় ধরে উনার ব্র্যান্ডের যারা কম্পিটিটর আছে ওইগুলা রিসার্চ করলাম, তাদের টার্গেট অডিয়েন্স, ভিজুয়াল আইডেন্টিটি, অ্যাড ক্যাম্পেইন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, ব্রান্ড স্টাইল গাইডলাইন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করলাম। পরে উনার জন্য ৩টা কনসেপ্ট বানালাম—প্রেজেন্টেশন, কালার থিওরি, টাইপোগ্রাফি ইত্যাদি রিসার্চ করে। সময় তো নাই, তাইই না? ৩ দিন পর প্রেজেন্ট করলাম। ক্লায়েন্ট বললেন, ভাই, দেখি ভেবে জানাচ্ছি।
..৩ দিন পরও ভাবছেন। ...৭ দিন পর বললেন, ভাই, তখন একটু ব্যাস্ত ছিলাম। ...১০ দিন পর বললেন, পার্টনারের পছন্দ হইছে না। ...১৩ দিন পর বললেন, ভাই, একটা দারুণ আইডিয়া পাইছি, নতুন কিছু করে ফেলেন। আমি বললাম, ভাই, সেই তো ৩ দিনের কাজ, এখন ১৩ দিনে পুরাই নতুন আইডিয়া? উনি বললেন, ভাই, কাজটা তো মন থেকে হইলে ভালো হয়।
(মানে তখন সময় নাই, এখন মন নাই!)🙂
নতুন আইডিয়াতে উনি চান, ভাই, কিছু বাংলাদেশি ফিল দিবেন। আমি বললাম, ঠিক আছে, টাইপোগ্রাফিতে একটা লোকাল essence রাখি। উনি বললেন, ভাই, ফন্টটা stylish করেন, কিন্তু যেন কোনো স্টাইল না বোঝা যায়। (এখন বুঝেন, উনি চান invisible style!)😑
নতুন ডিজাইন বানিয়ে দিলাম। এবার বললেন, ভাই, আসলে আমার আরেকজন পার্টনার আছেন, উনি কিছু বলবেন, তার পরেই ফাইনাল।
পার্টনার ভাই ঢুকলেন গুগল মীট মিটিংয়ে। বললেন, ভাই, আপনার কাজ ভালো, কিন্তু আমার মনে হয় লোগোতে কিছু না থাকলে ভালো হয়। আমি চুপ।
উনার মতে, “Minimal মানে almost nothing।” আমার মতে, “Minimal মানে thoughtful simplicity।” কিন্তু কে শুনে কার কথা? কাজ করতে করতে আমি নিজেই মিনিমাইজড হয়ে গেলাম।
এদিকে পেমেন্ট এখনো পাই নাই। জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, পেমেন্ট কবে দিবেন? উনি বললেন, ভাই, আপনি তো বন্ধু মানুষ। আমি কি ভাবছি জানেন? আমি বললাম, “না ভাই, জানি না।” উনি বললেন, চাইতেছি আপনাকেই আমার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বানাই। (মানে এখন আমি ব্র্যান্ড কনসাল্টেন্ট না, অ্যাম্বাসেডর হয়ে গেলাম।)😂
শেষে একটা দিন হুট করে মেসেজ, “ভাই, ফাইনাল লোগোটা আবার দেন।” আমি বললাম, “ভাই, আপনি তো একটাও ফাইনাল বলেন নাই!” উনি বললেন, “ভাই, যা আছে তাই দিয়া দেন।” আমি চুপচাপ লোগো ডেলিভারি করলাম।
আর পেমেন্ট? ৫০% আগেই আমি এডভান্স নিয়ে রাখি, যতই খাতির থাকুক ফর্মালিটিজ বজায় রাখি, বাকি ৫০% পেমেন্ট কাজ পছন্দ হবার পর যখন ফাইনাল ফাইল ডেলিভারি করবো তখন আগে পেমেন্ট নিয়ে পরে ডেলিভারি করি। আলহামদুলিল্লাহ অনেক ক্লায়েন্ট ডিল যত হইছিলো এর সাথে টিপস এড করে দেয় 🥰
পরদিন উনার ফেসবুকে পোস্ট— "আমার ব্র্যান্ডের নতুন লোগো, ডিজাইন করেছেন দেশের অন্যতম সেরা ডিজাইনার শরিফুল ভাই।" আমি ট্যাগড, লোকজন কমেন্ট করতেছে, “ভাই, অসাধারণ!”, “ভাই, inspiration!” "ডিজাইনের জন্য শরিফুল ভাই সেরা রে" "আগুন বস" আরও কত শত কমেন্ট। আমি ভাবি কি এমন করলাম! নাকি বুদ্ধির বদলে ধৈর্য খরচ করছিলাম ? আমিতো আবার চালাকি বিক্রি করে মুগ্ধতা কিনে আনার লোক।🤭
আসলে গত ৫ বছরে অনেক ক্লায়েন্ট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করেছি আলহামদুলিল্লাহ। বিটলামি মার্কা ক্লায়েন্ট এর সাথে সাথে অনেক ভালো ক্লায়েন্ট পেয়েছি তারা এখনো ডিজাইন লাগলে আমাকে আগে নক করে। অনেক ক্লায়েন্ট রেফারেন্স করে আমাকে অনেক ক্লায়েন্ট এনে দিয়েছেন। এমনও ক্লায়েন্ট পেয়েছি যার রেফারে সেই ক্লায়েন্ট আমার কাছে আসছে সেই রেফারকারী ব্যাক্তিকেও আমি চিনি না।
ডিজাইন সেক্টরে পথ চলতে চলতে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে এই যেমন আপনি নিজেও একজন! এই যে এত বড় একটা লেখা পড়তে পড়তে এতটুকু আসছেন। বলতে পারেন কোন সে মায়ার টানে? আসলে এমন এক জোরালো আঠা তার নাম মায়া। আপনি যেমন আমার লেখা আর ডিজাইন পড়তে পড়তে আমার পেশাদার জীবনকে ভালোবেসে ফেলেছেন! আসলেই শুধু একটু না অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলছেন! এই লাইন পড়তে গিয়ে মুচকি হাসি আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করেও জোরে হেসে ফেলা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। 😁 আপনার মন চায় উনি আরও হাসির কিছু মজাদার এবং পেশাদার এমন কিছু লিখুক যা আমাদের উপকারে লাগে।
তবে সেরা বিটলামি হয় রিভিশনে।
"ভাই, একটু বড় করেন... না না, একটু ছোট। আচ্ছা, আগেরটাই ভালো ছিল!" একটা রিভিশন করতে করতে ডিজাইনার বুঝতে পারে যে নিজের চোখের পাওয়ার বদলে গেছে। মাউসের কার্সারও তখন বলে: "ভাই, আমি আর পারছি না!" সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন অনেকবার রিভিশন দেয়ার পর ক্লায়েন্ট প্রথম কনসেপ্ট টাই সিলেক্ট করে।😒
তবে শেষ পর্যন্ত সব কাজই হয়। বিটলামি শেষে একদিন ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে বলেন, "ভাই, এইটাই চাইছিলাম! একদম পারফেক্ট! আমার সেজো ফুপির মেয়েও বলেছে, অসাধারণ!"
সব ডিজাইনারদের অনুরোধ—ক্লায়েন্টকে সম্মান করুন। আর ক্লায়েন্ট ভাইদের বলি—ডিজাইন একখান আর্ট, একটু ভরসা রাখেন। আর ডিজাইনার ভাইয়া আপুদের জন্য বলি — "বিটলামি হবে, তবুও লোগো হোক শিল্পের মতন!" 😊
ডিজাইনার হলে লাগে স্কিল আর ধৈর্য মিলিয়ে। ক্লায়েন্ট হলে লাগে ভিশন আর একটু ভরসায় ভরিয়ে। এই দুজন মিলে হয় জাদু, কখনো বিটলামি, কখনো শিল্প। পাঁচ বছরে অনেক কিছুই শিখেছি—হাসতে হাসতে ধৈর্য ধরেছি। তবু কাজের প্রতি ভালোবাসা কমেনি, বরং আরও পোক্ত হয়েছে।
আপনারা যারা পড়লেন, আপনারাও আমার যাত্রার যাত্রী, এই গল্পগুলো শুধু হাসায় না—গড়ে তোলে আত্মার আত্মীয়তা। সবশেষে বলি, লোগো শুধু চিহ্ন নয়—একটা অনুভব। আর সেই অনুভব গড়ে ওঠে ধৈর্য, রেসপেক্ট আর রিলেশনশিপের উপর। চলুন, আমরা সবাই মিলে বিটলামির মধ্যেও সম্মানের গল্প লিখি। হাসতে হাসতেই শিখি, কাজকে ভালোবেসে এগিয়ে যাই। আল্লাহ সবাইকে উপকারী জ্ঞান, হালাল রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল করার তৌফিক দান করুন,,,আমিন। ভালোবাসা অবিরাম।❤️
✍️শরিফুল ইসলাম বিজয়
ব্রান্ড কনসালটেন্ট ও ব্রান্ড ডিজাইনার।