03/03/2026
🌟 মানবতার আলোকবর্তিকা
আলো ছড়ানো সুহৃদের অনন্ত গল্প | পর্ব–১
(এই ধারাবাহিকে থাকছে সেইসব অজানা সুহৃদের গল্প, যারা সমাজের অন্ধকারে আলো হয়ে জ্বলে উঠেছেন।)
রাজবাড়ীর ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’
ডাঃ এম এ করিম মোল্লা: এক দেশপ্রেমিক ও নীরব নায়কের অমর উপাখ্যান
রাজবাড়ীর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সমাজসেবার ইতিহাসে ডাঃ এম এ করিম মোল্লা এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ চিকিৎসক, সফল জনপ্রতিনিধি, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী এবং অদম্য দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের প্রভাবশালী নায়করা কখনোই আত্মপ্রচার করেন না—তারা নীরবে, নিঃশব্দে, আলো ছড়িয়ে দেন।
---
🇬🇧 বিদেশের প্রলোভন বনাম দেশপ্রেমঃ
একবার তাঁর একমাত্র ছেলে, ডাঃ আবুল হোসেন, লন্ডনে বাবাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাবা যেন বিদেশের জীবন ও সুযোগ-সুবিধা নিজ চোখে দেখেন।
ছেলে: "আব্বা, এবার আমি তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাচ্ছি। কোনো আপত্তি শুনবো না।"
বাবা (শান্তভাবে): "না বাপ, আমি যাবো না। আমাকে জোর করো না।"
ছেলে: "কেন বাবা? তোমার কি ইচ্ছা করে না আমি সেখানে কেমন থাকি তা দেখতে?"
বাবা: "অনেক বড় হও। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক। মানুষের ভালো হোক। কিন্তু আমাকে বিদেশে যেতে বলো না। যদি সেখানে গিয়ে আমি মারা যাই, নিজের দেশে মরার সুযোগ হারানোর দুঃখ মৃত্যুর পরও থাকবে।"
এই সংলাপই প্রমাণ করে, নিজ জন্মভূমিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁর দেশপ্রেমের মূল দর্শন। বিদেশের চাকচিক্য তাঁর হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারেনি।
---
🏥 শাসনের আড়ালে বাবার মমতা: ‘বিলা’ গল্প
প্রতিবেশী মোঃ বেলায়েত হোসেন (বিলা) ছিলেন তাঁর কাছে সন্তানের মতো। একবার বিলা গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাঃ করিম মোল্লার অনুমতি ছাড়া পায়ের আঙুল কেটে ফেলে।
ডাঃ করিম মোল্লার রাগ তখন দৃশ্যমান হলেও, সেই রাগের আড়ালে ছিল অশেষ মমতা ও মানবিকতা। তিনি ক্রুদ্ধভাবে বলেন,"বিলা যদি আমার সন্তান হত, তবে কি এমন সাহস দেখাত?"
শেষ পর্যন্ত তাঁর শাসন এবং চিকিৎসা এর মাধ্যমে বিলা মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পান। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর চিকিৎসা কখনো কেবল রোগ নিরাময়ের জন্য ছিল না, বরং মানবতার প্রতি নিবেদিত ছিল।
---
📜 জীবনী সংক্ষেপ
১. জন্ম ও পরিবার
জন্ম: ১৯০৫ সালের ১লা জানুয়ারি, ভবদিয়া গ্রাম, বরাট ইউনিয়ন, রাজবাড়ী
পিতার নাম: মরহুম মোহাম্মদ আলী মোল্লা
পরিবার: সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার, যেখানে শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
২. শিক্ষা ও পেশাজীবন
চিকিৎসাবিদ্যা: আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ, কলকাতা
পেশা: নিজ গ্রামে ফিরে চেম্বার খুলে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান
বিশেষত্ব: দরিদ্র রোগীরা প্রায়শই তাঁর কাছে বিনা খরচে ওষুধ ও চিকিৎসা পেত
৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদান
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সফল চেয়ারম্যান
শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক:
আলহাজ্ব এম. এ. করিম উচ্চ বিদ্যালয়, ভবদিয়া – গ্রামীণ জনপদে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া
আলহাজ্ব এম. এ. করিম শিশু সদন (এতিমখানা) – দুঃস্থ ও এতিম শিশুদের শিক্ষা, থাকা-খাওয়া ও দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা
ভবদিয়া এবতেদায়ী মাদ্রাসা
ধর্মীয় ও সামাজিক অবদান: মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ ও সংস্কার, শীতবস্ত্র বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি
৪. পারিবারিক উত্তরাধিকার
একমাত্র ছেলে: ডাঃ মোঃ আবুল হোসেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত কার্ডিওলজিস্ট, রাজবাড়ী হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা
পরিবার তাঁর দর্শন ও প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে
৫. মৃত্যু ও প্রয়াণ
মৃত্যু: ১৯৯৪ সালের ১১ই জানুয়ারি, বয়স ৮৯
আজও প্রেরণা:
> "নিজ দেশে মরতে না পারার দুঃখ মৃত্যুর পরে যাবে না।"
--
✨ নীরব নায়ক ও তার দ্যুতি
ডাঃ এম এ করিম মোল্লা প্রমাণ করেছেন যে মানবতা বেঁচে থাকে এমন মানুষদের কারণে।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সৎ দেশপ্রেম, নিঃস্বার্থ সেবা এবং মানবিকতা কোনো দেশে বা প্রজন্মে হারায় না।
> “মানবতা বেঁচে থাকে এমন মানুষদের কারণে—আর তাদের গল্প বলা আমাদের নৈতিক দায়।”
চলবে… কারণ আলো থেমে থাকে না।
#মানবতার_আলোকবর্তিকা #নীরব_নায়ক #আলোর_মানুষ #সুহৃদের_গল্প