24/08/2026
অফিসের সহকর্মীদের সুন্দরী বউদের দেখে আমার হিং*সা হতো। সেদিন সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে মেজাজ হারিয়ে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম— "তোমার মতো সাধারণ চেহারার মেয়েকে বিয়ে করে আমার জীবন টা শেষ হয়ে গেছে একদম রস কসহীন। তোমাকে সাথে নিয়ে গেলে সবার সামনে আমার প্রেস্টিজ নষ্ট হয়!" আমার এই কথা শুনে ও একটুও তর্ক করেনি, শুধু হাত থেকে শাড়িটা নামিয়ে রেখে বলল— "তুমি একাই যাও, আমি ঘরেই থাকি বাচ্চাদের নিয়ে।"
পুরো অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরে দেখি, ও এক কোণে বসে আছে ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আর বড় মেয়েটা ৬ বছর সে সোফায় শুয়ে আছে। অনুষ্ঠান থেকে আসতে সময় বড় মেয়ের জন্য হোটেল থেকে ২ প্যাক বিরিয়ানি নিয়ে আসছি। মেয়েটা তার মায়ের গায়ের রং পেয়েছে শ্যামলা। তাও সে আমার কাছে ভীষণ প্রিয়। আমি আমার মেয়েকে আমার ছোট ছেলের থেকে ভালোবাসি। সেও আমাকে ভালোবাসে। তার কাছ থেকে বাবা ডাক শুনলে আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।
মেয়েকে তুলে বিরিয়ানি খাওয়ালাম। ছোট ছেলের জন্য রাখলাম একটু। তার বয়স ২ বছর। কিন্তু আমার স্ত্রীর জন্য কিছু রাখলাম না। তার এই চেহারা আমার আর ভালো লাগে না। কেন যে টাকা নিয়ে বিয়ে করতে গেলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী আমাকে প্রচুর ভালোবাসে।
হাত-মুখ ধুয়ে এসে সোফায় বসতেই বড় মেয়েটা আধো আধো গলায় বলে উঠল, "বাবা, তুমি এসেছ? আমার জন্য বিরিয়ানি এনেছ?"
আমি মুচকি হেসে ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "হাঁ মা, তোমার জন্যই তো এনেছি। ওঠো, খেয়ে নাও।"
মেয়েটা আনন্দ নিয়ে খেতে বসল। কিন্তু আমার স্ত্রী রোকেয়া তখনও ঘরের কোণে বসেই ছোট ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ওর মুখে কোনো টু শব্দ নেই। আমার কথায় হয়তো ওর বুকে খুব লেগেছে, কিন্তু ওর সেই শান্ত চেহারা দেখে আমার উল্টো আরও বিরক্ত লাগছিল। রূপ নাই, সাজগোজের কোনো ঢং নাই, একটা ধ্যাবড়া সাধারণ চেহারা নিয়ে সারা দিন ঘরে পড়ে থাকে।
অথচ অফিসে আমাদের স্যার এবং সহকর্মীদের বউদের দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ফর্সা ত্বক, সুন্দর জামাকাপড়, কত চটপটে কথা বলা! তাদের পাশে আমার এই স্ত্রী যেন একদম বেমানান। বিয়ের সময় ওর বাবার বাড়ি থেকে বেশ কিছু টাকা আর গয়না দিয়েছিল বলে লোভে পড়ে বিয়েটা করেছিলাম। তখন ভেবেছিলাম টাকা থাকলে সব হবে। কিন্তু এখন বুঝি, একটা সুন্দরি বউ পাশে না থাকলে পুরুষের সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায় না।
খাওয়া শেষ করে মেয়েটা আমার কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। রোকেয়া তখনও ছেলেটাকে কোলে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। আমি ঘরে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম, রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। রান্নাঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার, চুলাও ধরানো হয়নি বোঝা যাচ্ছে।
রা*গটা আবার মাথায় চড়ে বসল। আমি গলার আওয়াজ একটু চড়িয়ে বললাম, "কী ব্যাপার? রাতে খাবার কিছু রান্না করোনি? আমি হোটেল থেকে এনেছি ঠিক আছে, কিন্তু তোমার তো নিজস্ব দায়িত্ব বলতে কিছু থাকা দরকার! শুধু কোণে বসে থাকলে তো সংসার চলে না।"
রোকেয়া আস্তে করে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে জল ছিল কি না অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না। ও খুব নিচু গলায় বলল, "দুপুরে যা ছিল তাতেই হয়ে যেত। তোমার তো অনুষ্ঠান থেকেই খেয়ে আসার কথা ছিল, আর বাচ্চাদের কথা ভেবে কিছু রাঁধিনি। বিরিয়ানি তো এনেছই।"
"আমি এনেছি বলেই তো বেঁচে গেলে! নইলে তো বাচ্চারাও না খেয়ে ঘুমায়ে থাকত," আমি বিরক্ত হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে আড়চোখে রোকেয়ার দিকে তাকালাম। সাধারণ একটা সুতি শাড়ি পরা, চুলগুলো এলোমেলো করে বাঁধা। ওর এই ছাদহীন, সাজগোজহীন রূপ দেখে নিজের ওপরই রা*গ হচ্ছিল।
"তোমার মতো মেয়েকে কেন যে ঘরে এনেছিলাম," আমি বিড়বিড় করে বললাম। "আজ অনুষ্ঠানে সবাই কত সুন্দর সুন্দর বউ নিয়ে এসছিল। আর আমি বউ নিয়ে গেলে লোকে হাসাহাসি করত। আমার প্রেস্টিজের বারোটা বাজত।"
কথাগুলো শুনে রোকেয়া এবারও কোনো প্রতিবাদ করল না। ও ছেলেটাকে কাঁথা জড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে এল। ওর চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো রা*গ বা ক্ষো*ভের বহিঃপ্রকাশও নেই। একদম শান্ত, যেন ও এসব কথায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
ও আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে আমার ঘড়ি আর মানিব্যাগটা তুলে নিয়ে ঠিক জায়গায় গুছিয়ে রাখল। তারপর বলল, "তোমার গায়ের জামাটা খুলে দাও, ধুয়ে দেব। আর কাল সকালে তো অফিসে জলদি যেতে হবে, আমি টিফিন তৈরি করে রাখব।"
ওর এই সহজ কথাগুলো আমাকে আরও বেশি অচেনা আর অদ্ভুত শোনাল। কোনো মেজাজ দেখাল না, কোনো গা*লমন্দ করল না। উল্টো আমারই খেয়াল রাখছে! কিন্তু আমার মন তাতেও গলল না। মনে হচ্ছিল, এই ভালোবাসা আর যত্ন সবই তো সাধারণ, কিন্তু সুন্দর চেহারা কই? একটা পুরুষের মন ভরাতে গেলে যে রূপের প্রয়োজন, তা তো ওর মধ্যে বিন্দুমাত্র নেই।
আমি বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিলাম। রোকেয়া লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে ঘরের কোণে ফ্যানের নিচে নিজের জন্য একটা পাতলা কাঁথা পাতল। ও সবসময় মেঝেশুতেই পছন্দ করে, বিশেষ করে যখন আমি রাগ করে থাকি।
অন্ধকারে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম আমার জীবনের কথা। চাকরি করি, মোটামুটি ভালোই মাইনে পাই তবে চাকরি টা রোকেয়ার বাবার টাকা দিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ি ফিরলেই একটা বিষণ্ণতা আমাকে চেপে ধরে। আমার সব সহকর্মীরা বউ নিয়ে উইকএন্ডে ঘুরতে যায়, ছবি তোলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে। আর আমি? রোকেয়াকে নিয়ে কোথাও যেতেও আমার লজ্জা করে। লোকে হয়তো ভাববে আমি টাকার লোভে একটা কালোর রূপহীন মেয়েকে ঘরে এনেছি। কথাটা সত্যি হলেও শুনতে তো ভালো লাগে না!
হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে রোকেয়ার আস্তে করে শ্বাস ফেলার শব্দ শুনলাম। ও হয়তো ঘুমানোর চেষ্টা করছে, কিংবা চুপচাপ কাঁদছে। আমার মনের এক কোণে সামান্য অপরা*ধবোধ উঁকি মা*রলেও পরক্ষণেই অহংকার আর হিং*সা সেটাকে চাপিয়ে দিল। আমার মতো পুরুষের পাশে একটা রূপসী মেয়েই মানায়, এই রোকেয়া নয়।
চলবে...?
অন্ধ রূপের অর্ঘ্য
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven (শাহেদ খান)
প্রথম পর্ব কেমন লাগলো? আজকেই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে। ধন্যবাদ