23/05/2026
এক প্লেট ভাতের আশায় ১২ বছর বয়সে চাচার ঘরের মেজেতে বসে টিভি দেখার বাহানায় বসে থাকতাম। তারা আমার সামনে খাবার খেতো কিন্তু আমাকে কখনো বলতো না। আয় সোহান ভাত খা কয়টা সকাল থেকে তো না খেয়ে বসে আছিস। কিন্তু তারা কখনো এটা বলতো না। তাদের খাওয়া শেষ হলে আমি মন খারাপ করে ঘর থেকে চলে আসতাম। আর মায়ের জন্য অপেক্ষা করতাম বিকেল পযন্ত।
আমার বাবা যখন স্ট্রোক করে মা**রা গেলেন । আমাদের মাথার ওপরের আকাশটা যেন এক নিমেষেই ভেঙে চুরমা*র হয়ে গেল। বাবা মা**রা যাওয়ার পর আমাদের র**ক্ত মাংসের আপন চাচা রাতারাতি কেমন যেন পর হয়ে গেলেন। যে মানুষটা বাবার জানাজায় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিলেন, তিনিই কদিন পর থেকে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। মা আর আমার জীবনের কষ্টের দিনগুলো ঠিক তখন থেকেই শুরু।
ক্ষুধা জিনিসটা বড় বালাই। ১২ বছরের একটা বাচ্চার পেট তো আর বোঝে না যে তার বাবা নেই, ঘরে চাল নেই। সকাল থেকে পেটে এক দানা দানাপানি পড়েনি। দুপুরের দিকে যখন ক্ষুধার তীব্রতায় পেটটা চোঁ-চোঁ করত, তখন আমি নিরুপায় হয়ে চাচার ঘরের দিকে হেঁটে যেতাম।
চাচার ঘরের মেঝেতে বসে থাকার আমার একটা চেনা বাহানা ছিল—টিভি দেখা। তখন গ্রামে খুব বেশি ঘরে রঙিন টিভি ছিল না। চাচার ঘরে রঙিন টিভি চলত, আর আমি এককোণে গুটিসুটি মে*রে বসে থাকতাম। আমার চোখ টিভির পর্দায় থাকত ঠিকই, কিন্তু কান দুটো পড়ে থাকত রান্নাঘরের দিকে। কখন থালাবাসনের শব্দ হবে, কখন খাবার টেবিলে সাজানো হবে।
একটু পরেই চাচি এসে খাবার বেড়ে দিতেন। চাচা, চাচাতো ভাইয়েরা সবাই মিলে গোল হয়ে বসতেন। তরকারির সুগন্ধ যখন আমার নাকে আসত, তখন মুখ ভরে লালা চলে আসত। আমি আড়চোখে দেখতাম ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর মাছের ঝোল। তারা আমার সামনেই আয়েশ করে করে খাবার খেতেন, চিবানোর শব্দ হতো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, কেউ একটিবারের জন্যও আমার দিকে তাকিয়ে বলত না—
"আয় সোহান, ভাত খা কয়টা। সকাল থেকে তো না খেয়ে বসে আছিস।"
না, তারা কেউ এই কথাটি কোনোদিন বলেনি। আমি টিভির দিকে তাকিয়ে শুকনো থুতু গিলতাম আর মনে মনে ভাবতাম, কেউ একজন অন্তত ডাকুক। কিন্তু তাদের খাওয়া শেষ হয়ে যেত, তারা হাত ধুয়ে উঠে যেতেন। কেউ আমার দিকে একটা রুটি বা এক দলা ভাতও বাড়িয়ে দিত না। যখন বুঝতাম আর কোনো আশা নেই, তখন তীব্র এক মন খারাপ আর চোখে জল নিয়ে গুটিসুটি মে*রে চাচার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতাম।
নিজের ভাঙা ঘরের বারান্দায় এসে বসে থাকতাম। মা মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে যেতেন সকালবেলা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো, আমার চোখ দুটো তাকিয়ে থাকত রাস্তার দিকে—কখন মা ফিরবে? মা যখন বিকেলে ক্লান্ত শরীরে আঁচলে করে বা কোনো বাটিতে করে মানুষের বাড়ির বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে আসতেন, তখন মনে হতো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হাতে পেয়েছি। মা নিজের মুখে এক লোকমা না দিয়ে আমার মুখে তুলে দিতেন, আর আমি গোগ্রাসে তা গিলতাম।
এরই মধ্যে মাঝে মাঝে একটু আনন্দের আলো আসত। আমাদের বড় চাচাতো বোন, যিনি শহরে থাকতেন। তিনি যখন মাঝে মাঝে গ্রামে আসতেন, তার মনটা ছিল খুব নরম। আমাকে দেখলেই ডেকে বলতেন, "সোহান, এদিকে আয়। এই নে মিষ্টি খা, ফল খা।" চাচির চোখের আড়ালে তিনি আমাকে এটা সেটা খেতে দিতেন। উনার ভালোবাসাটুকু পেয়ে আমার মনে হতো, এ পৃথিবীতে মা ছাড়া আমিও বোধহয় কারো আপন। কিন্তু কপাল খারাপ, কিছুদিন পরই উনার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর তিনি পুরোপুরি সংসারী হয়ে গেলেন, গ্রামে আসা কমে গেল। আর সেই সাথে চাচার ঘর থেকে আমার ওই সামান্য ভাগটুকুও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
দিন তো আর থেমে থাকে না। ক্ষুধা আর অপমা*নকে সঙ্গী করেই আমি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম। শরীরে একটু শক্তি আসতেই আমি আর মায়ের ওপর পুরো বোঝা হয়ে থাকতে চাইলাম না। গ্রামের মানুষের জমিতে, হাটে-বাজারে ছোটখাটো টুকটাক কাজ করে দিতে লাগলাম। কেউ বিশ টাকা দেয়, কেউ খুশি হয়ে দুটো খেতে দেয়। এভাবেই আমাদের মা-ছেলের টানাটানির সংসার কোনোমতে চলতে লাগল। কষ্টের দিনগুলোর মধ্যেই আমি কৈশোর পেরিয়ে একটু একটু করে তরতাজা তরুণ হয়ে উঠছি।
ঠিক এই রকম এক সময়ে, সেদিন দুপুরে চাচার বাড়িতে এক বিশাল শোরগোল। শহর থেকে চাচির বড় বোন, তার স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। ধনী আত্মীয়, তাই চাচার বাড়িতে এলাহী কাণ্ড। বাজার থেকে রুই মাছ, খাসির মাংস, পোলাওয়ের চাল—সব আনা হয়েছে।
হঠাৎ চাচি আমাদের ঘরের সামনে এসে মাকে ডেকে বললেন, "ও সোহানের মা, ঘরে মেহমান আসছে। একলা হাতে সব রান্ধন পারতাছি না। একটু আইসা হাত লাগাও তো।"
মা আমার চিরকালই সরল আর পরোপকারী। চাচির ডাক শুনে মা নিজের ঘরের কাজ ফেলে মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে চলে গেলেন চাচার রান্নাঘরে। মা পোলাও চড়ালেন, খাসির মাংস কষাতে লাগলেন। মাংস কষানোর সেই স্বর্গীয় সুবাস আমাদের ঘর পর্যন্ত আসছিল। রান্নাঘরে মা হাসিমুখে চাচির সাথে কাজ করছেন, আর সুস্বাদু সব পদ রাঁধছেন।
দূর থেকে মায়ের সেই রান্নার দৃশ্য দেখে আমার মনে এক চিলতে আশার আলো জাগল। আমি ভাবলাম, মা যখন নিজের হাতে এত ভালো ভালো রান্না করছে, চাচি নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আজ আমাদের মা-ছেলেকেও একটু খেতে দেবে। অন্তত মেহমানরা খাওয়ার পর মা আর আমার পাতেও একটু মাংস-পোলাও জুটবে।
টানা কয়েকদিন ধরে ভালো কোনো খাবার পেটে পড়েনি। খাসির মাংসের সেই সুবাসে আমার জিভে জল চলে এলো। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না। পা টিপে টিপে রান্নাঘরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাচি তখন অন্য ঘরে মেহমানদের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। মা একা একা মাংসের ডেকচি নাড়ছেন।
আমি চুপিচুপি রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে মায়ের শাড়ির আঁচল টানলাম। ফিসফিস করে বললাম, "আম্মা, আমারে এক টুকরো মাংস দেও না এখান থেকে? খুব ক্ষুধা লাগছে আম্মা, একটুখানি দেও।"
মা আমার কথা শুনে চমকে উঠলেন। উনার চোখ দুটো ভয়ে আর আত*ঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। মা হড়বড় করে চারপাশটা দেখে নিয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে সরাসরি না করে দিলেন, "হায় হায় বাজান! এগুলো বলিস না এখন। তোর চাচি যদি দেখে তুই এখান থেকে মাংস খাচ্ছিস, তা হলে আর রেহায় থাকবে না। আমাদের পিঠের চা*মড়া তুলে নেবে। যা এখান থেকে, পরে দেখব।"
কিন্তু ক্ষুধার্ত ১২-১৩ বছরের জেদের কাছে তখন মায়ের ভয় হেরে গেল। আমি মায়ের বারণ শুনলাম না। ডেকচির পাশেই একটা বাটিতে কষানো মাংসের কয়েকটা টুকরো রাখা ছিল মেহমানদের দেওয়ার জন্য। আমি মায়ের চোখের তোয়াক্কা না করে, লোভ সামলাতে না পেরে চট করে হাত বাড়িয়ে সেখান থেকে বড় এক টুকরো মাংস তুলে নিলাম।
মা "না না" করে ওঠার আগেই আমি সেই গরম মাংসের টুকরোটা মুখে পুরে দিলাম। মাংসের স্বাদটা জিহ্বায় লাগার সাথে সাথেই আমার মনে হলো যেন অমৃত খাচ্ছি। কিন্তু সেই সুখ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী ছিল।
"ওরে চু*রের দল! ঘর তো না, চোরের আস্তানা বানাইছে!"
হঠাৎ দরজার গোড়া থেকে এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। আমি চমকে তাকিয়ে দেখি, চাচি দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। উনার চোখ দুটো রাগে লাল, আর মুখটা হিং*স্র দেখাল।
চাচি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রান্নাঘরে ঢুকে আমার হাতটা ঝটকা মে*রে ধরলেন। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন, "চো*রের ঘরের চো*র! যেমন মা, তেমন তার পোলা! নিজে তো চো*র, এখন পোলারেও চু*রি করে মাংস খাওয়ানো শিখাইতাছে! মানুষের বাড়ির মেহমানের খাবার চু*রি করতে তরগো লজ্জা করে না?"
মায়ের মুখটা পলকে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মা হাতজোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আপা, আমার পোলডারে বইকেন না। ও ছোট মানুষ, লোভ সামলাইতে পারে নাই। ও চু*রি করে নাই আপা..."
কিন্তু চাচি তখন থামার পাত্র নন। তিনি উঠোনে গিয়ে চিৎকার করে চাচাকে শোনানোর জন্য বলতে লাগলেন, "সবাই আইসা দেখে যাও, চো*রের মা ছেলেকে চু*রি করে মাংস খাওয়াচ্ছে! এদের ঘরে আশ্রয় দেওয়াই আমাদের ভুল হইছে!"
মুখের ভেতর সেই মাংসের টুকরোটা তখন আমার কাছে বিষের মতো লাগছিল। আমার চোখের সামনে আমার মায়ের আঁচলটা অপমা*নে কাঁপতে লাগল।
চলবে..
অভাব
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven
খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন