14/07/2025
আজকে শাহবাগে ছাত্রদলের মিছিলে “৭১ এর রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়” স্লোগান শুনে আমি বিস্মিত, ব্যথিত ও হতাশ। যে শাহবাগ একদিন ছিলো ফাঁসির মঞ্চ। যেখান থেকে ধ্বনিত হয়েছিলো "ফাঁসি চাই" স্লোগানে সাকা চৌধুরীসহ বহু আলেমের রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস, সেই শাহবাগ আজ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলো সেই বিএনপির কাছেই।
যে বিএনপি একদিন এই মঞ্চের বিরুদ্ধে বুক চাপড়ে শপথ নিয়েছিলো, আজ তারাই মাথা নত করলো সেই মঞ্চের সামনে। আজ যেন বিএনপি তার প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধেই স্লোগান দিল।
বাংলাদেশ কিংবা বিএনপি’র নতুন প্রজন্মের কতজন আছেন যারা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার “রাজনীতির যাদুকরী রাজনীতি” সম্পর্কে জানেন ? নতুবা শ্রদ্ধেয় যাদু মিয়াই যে শহীদ জিয়ার সাথে বিএনপি গড়ার অন্যতম সেরা কারিগর সেই সম্পর্কে অবগত আছে?
শ্রদ্ধেয় জিয়াউর রহমানের বিএনপি গড়া কারিগরদের অন্যতম সেরা কারিগর হলেন এই শ্রদ্ধেয় মশিউর রহমান যাদু মিয়া। প্রতিটি সমাজ তার ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই জন্ম দেয় শ্রেষ্ট সন্তানদের। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের তেমনই এক শ্রেষ্ঠ সন্তান হচ্ছেন যাদু মিয়া। যে কোন ধরনের সমস্যা নিজের হাতে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রনের জুড়িও ব্যতিক্রম। কোথায় কী বলতে হবে, কতটুকু বলতে হবে-সবই যেন ছিল তাঁর নিক্তিতে মাপা। সব কিছু মিলিয়েই যাদু মিয়া অপ্রতিদ্ধন্দী, অদ্বিতীয় ছিলেন। ব্যক্তি যাদু মিয়া এবং নেতা যাদু মিয়ার পার্থক্য খুঁজে পাওয়া বড়ই কষ্টের।
কথা বলতেন মেপে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলতেন না। আর যা বলতেন গুছিয়ে বলতেন। তাঁর কথার ভিতর যেন যাদুর স্পর্শ ছিল। অসামান্য ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। তাই বলে তিনি ‘অতিমানব’ ছিলেন না। রাজনৈতিক ক্যারিশমা কিংবা কর্মদক্ষতাই তাঁকে কিংবদন্তী করে তুলেছিল সারা দেশে।
১৯৭৫ পরবর্তী পরিস্থিতির প্রয়োজনেই যাদু মিয়া জিয়াউর রহমানের সাথে আলোচনা শুরু করেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিলো সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরন। সেদিন তিনি একাজে এগিয়ে এসেছিলেন শান্তিপূর্ন উপায়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তনের লক্ষ্যে। যাকে তিনি ‘গণতন্ত্রে উত্তরনের প্রক্রিয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রথমে ফ্রন্ট পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তিনি সেদিন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন নিজ হাতে গড়া প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে।
১৯৭৯ সালের ১৮-ই ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়ান। এতটুকু ক্লান্তি বা বিরক্তিবোধ করেননি।
মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ভাই মোখলেসুর রহমানের (সিধু ভাই)একটি সাক্ষাতকারকে উদ্ধৃত করে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “জিয়া বাংলা লিখতে-পড়তে জানতেন না। প্রথম দিকে তিনি বাংলায় যে বক্তৃতা দিতেন, সেগুলো উর্দুতে লিখতেন। তারপর সেটি দেখে বক্তৃতা দিতেন। তিনি ভালো করে বক্তৃতা দিতে পারতেন না। দিতে গেলে খালি হাত-পা ছুঁড়তেন।”
মোখলেসুর রহমানের সাক্ষাতকার গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর বইতে এভাবে তুলে ধরেছেন, “এসব দেখেটেখে যাদু একদিন আমাকে বললো যে, এ রকম হলে কী করে তাঁকে আমি চালিয়ে নেব?আমি বললাম, দেখো জিয়া বক্তব্য দিতে পারেন না ঠিক আছে। তিনি সবচেয় ভালো-ভাবে কী করতে পারেন, সেটা খুঁজে বের করো। জবাবে যাদু বললেন, হাঁটতে পারেন এক নাগাড়ে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত। আমি বললাম এইতো পাওয়া গেল সবচেয়ে ভালো একটা উপায়, তুমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পাড়াগাঁয়ে হাঁটাও। …. গাঁও গেরামের রাস্তা দিয়ে যাবে আর মানুষজনকে জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছেন? প্রেসিডেন্ট দেশের মিলিটারী লিডার, তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কানাকানচি দিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন আর লোকজনের ভালো-মন্দের খোঁজ খবর করছেন, তাতেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন।
মোখলেসুর রহমানের ভাষ্য হচ্ছে, এভাবে দেখতে দেখতে জিয়াউর রহমান বক্তব্য দেয়াটাও রপ্ত করে ফেললেন। যেখানে কোনদিন ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানও যাননি, সেখানে খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট যাচ্ছেন। সেটা এক বিশাল ব্যাপার।
“এসব দেখে গ্রামের লোকজন ভাবল, জিয়াউর রহমান এমন লোক, যিনি আমাদের খোঁজ খবর রাখেন,” মোখলেসুর রহমানের সাক্ষাতকার এভাবেই উঠে এসেছে মহিউদ্দিন আহমদের বইতে।
১৯৭৮ সালের ২৮শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হলো। জুন মাসে অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ৭৬.৩৩ ভাগ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ নিয়োগ করা হয়। বিএনপি’র রাজনীতি থেকে শ্রদ্ধেয় যাদু মিয়ারা হারিয়ে গেলে, শহীদ জিয়ার যাদুকরী রাজনীতির সাফল্যময় অতীত কথা নতুন প্রজন্মের কাছে ধীরে ধীরে ম্লান হযে যাবে।
এতখনে যে যদু মিয়ার কথা বলছি যদু সেই যদু মিয়া ছিলেন একজন যুদ্ধাপরাধী। তথ্য সুত্রঃ বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত "মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস রংপুর" থেকে নেয়া।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন তার নাম ছিলো শাহ আজিজুর রহমান।
এমনকি তিনি জেনেভা কনভেনশনে গিয়ে পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা এদেশে চালিয়েছিলো সেটাকেও মিথ্যা আখ্যায়িত করেছেন।
যুদ্ধে বিরোধীতা করার দায়ে ‘পাকিস্তানের সহযোগী’ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দালাল আইন ১৯৭২ এ তার বিচার হয়।
১ ডিসেম্বর ১৯৭৩ তারিখে" দৈনিক বাংলা" পত্রিকা সূত্রে জানা যায় , “শাহ আজিজুর রহমান সাধারণ ক্ষমার অধীনে তিনি ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পান।
যে ইতিহাস আপনি জানেন না- ৭১ এর রাজাকারের প্রতীক আখ্যা পাওয়া এই আজিজুর রহমানকে মেজর জিয়া বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা বানিয়েছিলেন।
এমনকি ১৯৭৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বসিয়েছিলেন শহীদ জিয়া।
রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটিসহ স্বাধীনতাবিরোধী ১০ হাজার ৭৮৯ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করলে এতে স্থান পাই শহীদ জিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এর নাম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব রাজাকার, আলবদর, আলশামস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেছে তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি এই দালাল প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় ২,৮৮৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় সাজা দেওয়া হয় ৭৫২ জনকে। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই তাদের জন্য শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ৩৭ হাজারের অধিক ব্যক্তির ভেতর থেকে প্রায় ২৬ হাজার আভিযুক্ত যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিলো না তারা ছাড়া পায়। শেখ মুজিব সরকার কর্তৃক ৩১ অক্টোবর ১৯৭৩ এর মধ্যে ৭৫২ জন অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা প্রদান করা হয়েছিল। বাকি স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান ছিলো।
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, তৎকালীন সেনাপ্রধান ও ডেপুটি চিফ মার্শাল ল’অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জিয়াউর রহমান নেতৃত্বে এক আদেশে দালাল আইন বাতিল করে এবং কমপক্ষে ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়।
১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বর সকাল ১১ টা ঠাকুরগাঁও এ সালাহউদ্দিন নামের এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকাররা ধরে পাক হানাদারদের কাছে নিয়র আসে।
সালাহউদ্দিনকে ধরে এনে বলা হলো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দাও না হয় তোমাকে বাঘের খাঁচায় দেয়া হবে। সে তথ্য দেয়নি।
সালাহউদ্দীনের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। চোখের মণিতে বড়শি বিঁধে নিষ্ঠুরভাবে টানা হয়। এক পর্যায়ে কেটে নেয়া হয় হাতের আঙুল। হাতে পায়ে পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তারপরও তথ্য দেননি অকুতোভয় সালাহউদ্দিন।
এক পর্যায়ে শহরজুড়ে মাইকে প্রচারণা চালিয়ে মানুষজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১২ নভেম্বর শুক্রবার বেলা ১১ টায় সালাহউদ্দিনের দুই হাত বেঁধে বাঘের খাঁচায় ছেড়ে দেয়া হয়। হানাদারদের ক্যাম্পের কাছেই ছিল বাঘের খাঁচা। সেই খাঁচায় রক্ষিত দুটো বাঘ ক্ষত বিক্ষত করে টেনে ছিঁড়ে খেয়ে ফেললো তাঁকে। সেই দৃশ্য দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ে রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা।
তথ্য সূত্র (বাঘের খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধার প্রাণোৎসর্গ) লেখক -বিলু কবীর।
সালাহউদ্দিনকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন মৌলানা তমিজউদদীন, মির্জা রুহুল আমিন চোখা মিয়া। চোখা মিয়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাবা। তিনি তখন ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও রাজাকার।
মুক্তিযুদ্ধের পর এদের দালাল আইনে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও যারা হত্যা,ধর্ষণ, লুটপাটে জড়িত ছিল এদের ক্ষমা করা হয় নি। এদের সংখ্যা ছিলো ১১ হাজার। এই তালিকায় ছিলো মির্জা রুহুল আমিন চোখা মিয়ার নাম। যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় তার নম্বর ছিলো ৭১০।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর পিতা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, যিনি নবী চৌধুরী নামেও পরিচিত। তিনি রাজনৈতিক ভাবে অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং-সীতাকুন্ড থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে গণ-যোগাযোগ মন্ত্রী এর পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও রয়েছে কাজী ফারুক কাদের (নীলফামারী-৩ প্রাক্তন সংসদ সদস্য সাবেক) মোশাররফ হোসেন শাহজাহান (পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন) আহসানুল হক মোল্লা যিনি পচা মোল্লা নামেও পরিচিত। (সাবেক ডাক ও টেলি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী) চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ( সাবেক খাদ্যে ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় মন্ত্রী) চৌধুরী আকমল ইবনে ইউসুফ (ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ) আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা (বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক) কাজী ফারুক কাদের (নীলফামারী-৩ প্রাক্তন সংসদ সদস্য সাবেক) ড. ওসমান ফারুক (বাংলাদেশের সাবেক প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী) আব্দলু আলিম (জয়পুরহাট-১ এর সাবেক সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী) সহ অসংখ্য মানুষ যারা জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পরিষদে স্থান পেয়েছিলেন।
যারা আজ মুখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেন, তারা কি ইতিহাস ভুলে গেছেন? স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং জিয়াউর রহমান। তিনি শুধু দালাল আইন বাতিল করেননি, সেই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হওয়া হাজার হাজার রাজাকার ও আলবদরকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাদের অনেককেই তিনি পুরস্কৃত করেছিলেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ এমপি, কেউ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামী যাকে আপনাদের ভাষায় পাকিস্তানপন্থী যুদ্ধাপরাধী দল, তাদের রাজনীতি করার বৈধতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান নিজেই। এদেশে আবার তাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে তারই কল্যাণে।
তাই আজ যদি সত্যিকার অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার শুরুটা হওয়া উচিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিচার দিয়ে। কারণ, তিনি শুধু যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করেননি, তাদের পুনর্বাসন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
যুদ্ধাপরাধের বিচার যদি সত্যিই কেউ চান, তবে সেই বিচার প্রক্রিয়ার শুরু হওয়া উচিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া থেকে। কারণ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো তিনিই যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। আপনাদের ভাষায় কথিত রাজাকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এই স্বাধীন দেশের গৌরবময় প্রতীক!
খালেদা জিয়া শুধু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটই করেননি, বরং সেই যুদ্ধাপরাধী নেতাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বানিয়েছেন। ২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বে সরকারে এসে তিনি নিজ হাতে মন্ত্রী বানিয়েছেন রাজাকারদের। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদদের মতো যুদ্ধাপরাধীরা তাঁর আমলেই পেয়েছে ক্ষমতার স্বাদ।
একাত্তরে যারা এই দেশের বিরুদ্ধে ছিল, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা গণহত্যা চালিয়েছিল তাদের সাথে হাত মিলিয়ে বিএনপি শুধু রাজনৈতিক সুবিধা নেয়নি, বরং তাদের পুনর্বাসন করেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন আসলে, সেই দায় থেকে খালেদা জিয়াও মুক্ত নন। বিচার যদি হয়, তবে সেটি শুরু হওয়া উচিত রাজাকারদের ‘রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসনের নায়িকা’ বেগম খালেদা জিয়ার বিচার দিয়ে।
সাঈদি নিজামি যুদ্ধাপরাধী অপরাধী। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিরপরাধ। এমন? বিএনপি কী বলে?
প্রশ্নটা যদি আরো স্পেসিফিকালি করি, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত দেশবরেণ্য নেতার ব্যাপারে বিএনপির এতটা শুনশান, নিরব কেন?
তাইলে কি আশলেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাজাকার ছিলেন? হুম্মাম কাদের চৌধুরী কি রাজাকারের সন্তান?
যদি সাকা চৌধুরী একাত্তরবিরোধীই হন, তাইলে বিএনপি মোট দুইটা অপরাধে অপরাধী। এক, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত একজন চিহ্নিত রাজাকারকে দলের শীর্ষনেতা বানিয়ে। দুই, চিহ্নিত রাজাকারের সন্তান হুম্মাম চৌধুরীকে আরেক নেতা বানানোর পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে।
আর যদি বিএনপি মনে করে, শাহবাগ ট্রায়াল প্রশ্নবিদ্ধ ও আওয়ামী সন্ত্রাসের অংশ (যেটা খালেদা জিয়া মনে করেন) তবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে হওয়া ইনজাস্টিস আর বর্বরতার জন্য তারা মামলা করুক শাহবাগের নামে।
আরো প্রশ্ন। যদি শাহবাগ ঘৃণিত হয়, তবে কি সেইটা জাস্ট বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসির দায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয়ার জন্য? নাকি ওভারঅল সব রায়ের জন্যই শাহবাগ ঘৃণিত ও বর্জিত?
কারণ, বিএনপি ও ছাত্রদলের যেই অংশ এখন নতুন করে শাহবাগের সমর্থন দিতেসে, সেই শাহবাগ কি শুধু জামায়েতের বিরুদ্ধে রায় দেয়া শাহবাগ, নাকি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় দেয়া শাহবাগও সমর্থিত?
যারা রাজাকার রাজাকার স্লোগান দিতেসে, তারা কি পূর্ণ শাহবাগের সমর্থন করে নাকি সাকা চৌধুরীরে আলাদা করে নির্যাতিত ভাবে?
একাত্তর প্রশ্নের মীমাংসার পাশাপাশি এইসব প্রশ্নেরও মীমাংসা করতে হবে আমাদের। কারণ এইগুলো সব গিয়ে একাত্তরের সাথেই যুক্ত হয়। আরো বেশি প্রাসঙ্গিকভাবে।
আওয়ামী লীগ ও সিপিবির যেই ন্যারেটিভ, তাতে এক আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউই একাত্তরের পক্ষপাতি না। এবং এইটা একচুয়ালি ট্রু আলাপ। জামাত একাত্তরবিরোধী আর বিএনপি একাত্তরের সপক্ষের, এইটা তো একাত্তরের বয়ান না। একাত্তরের পপুলিস্ট বয়ানমতে বিএনপিও রাজাকারের আখড়া। এইটা যতটা না সাকা চৌধুরীদের প্যাট্রোনাইজ করার মাধ্যমে তারচেও বেশি পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে মেজর জিয়ার শাসনামলে। সেই প্রশ্নের উত্তর আওয়ামী লীগকে ভালোভাবে দিতে পারে নাই বইলাই তো, পরবর্তীতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ভিক্টিম হইতে হইলো।
শাহবাগকে পুনঃসমর্থন দেয়ার মাধ্যমে বিএনপির নতুন ড্রাইভাররা আওয়ামী লীগের কাছে তাদের একাত্তর পরবর্তী সময়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেসেন কিনা, জানি না।
তবে শাহবাগের সমর্থন করার আগে বিএনপিকে জনতার কাছে সালাউদ্দিন কাদের ইস্যু সলভ করতে হবে। আওয়ামী বয়ানে রাজাকার বলার আগে সাকা চৌধুরীকে রাজাকার ও হুম্মাম চৌধুরীকে রাজাকারের সন্তান বলতে হবে। না হলে পথে প্রান্তরে দেয়ালে দেয়ালে হৃদয়ের ভাষা দিয়ে লিখে যাবো
ইনকিলাব।
সিন্থু
লন্ডন