18/08/2026
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
এনসিটির পর আইসিডি-বে টার্মিনাল: ডিপি ওয়ার্ল্ডের লক্ষ্য পুরো সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ও চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা নেওয়ার আলোচনার আড়ালে বাংলাদেশের পুরো ‘সাপ্লাই চেইন’ বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের এক সুদূরপ্রসারী নীল নকশা উন্মোচিত হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুবাই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল একটি টার্মিনাল নয়, বরং গাজিপুরের ধীরাশ্রম আইসিডি (Inland Container Depot) এবং বন্দরের ভবিষ্যৎ মেগা প্রকল্প ‘বে-টার্মিনাল’—সবকিছুই একটি ‘প্যাকেজ ডিল’-এর আওতায় কবজা করতে চায়। লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পুরো অর্থনৈতিক করিডোর একটি একক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
‘পোর্ট টু ডোর’ স্ট্র্যাটেজি: লক্ষ্য যখন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেল হলো ‘পোর্ট টু ডোর’ লজিস্টিকস। তারা কেবল বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে বের হয়ে শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত চুক্তিতে এনসিটি পরিচালনার পাশাপাশি গাজিপুরের ধীরাশ্রমে একটি বিশাল আইসিডি নির্মাণের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সিংহভাগ কারখানা গাজীপুর ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। ধীরাশ্রম আইসিডি নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের লজিস্টিকস নাড়িটি নিজের হাতের মুঠোয় রাখা। এর ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ওই একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের মর্জির ওপর জিম্মি হয়ে পড়বেন।
বে-টার্মিনাল: ভবিষ্যতের চাবিকাঠি কি অন্যের হাতে?
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে নির্মিত হচ্ছে ‘বে-টার্মিনাল’। এটি বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। অভিযোগ উঠেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির দোহাই দিয়ে বে-টার্মিনালের একটি বড় অংশের অংশীদারিত্বও নিশ্চিত করতে চায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এনসিটি, ধীরাশ্রম আইসিডি এবং বে-টার্মিনাল—এই তিনের নিয়ন্ত্রণ যদি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তবে বাংলাদেশের লজিস্টিকস সেক্টরে কোনো ‘প্রতিযোগিতা’ (Competition) অবশিষ্ট থাকবে না। এটি একটি ধ্রুপদী ‘মনোপলি’ বা একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং সেবার মান হ্রাসের কারণ হতে পারে।
ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত ঝুঁকি
এই ‘প্যাকেজ ডিল’-এর পেছনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ সিইও যুবরাজ নারায়ণ এবং সাব-কন্টিনেন্টাল সিইও রিজওয়ান সুমার—যাঁরা একই সাথে ভারতের মুন্দ্রা ও চেন্নাই বন্দরের কৌশলগত স্বার্থ দেখেন, তাঁদের হাতেই কি তবে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইনের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত যখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা নিচ্ছে, তখন বন্দর থেকে শুরু করে গাজিপুরের আইসিডি পর্যন্ত পুরো চেইনটি যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডের (ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের অধীনে) নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বকীয়তা বলে কিছু থাকবে না। এটি প্রকারান্তরে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রতিবেশী দেশের লজিস্টিকস ব্লুপ্রিন্টের একটি ‘উপ-শাখা’য় পরিণত করবে।
আওয়ামী আমলের সেই ‘লুটেরা মডেল’
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্যাকেজ ডিলের পরিকল্পনাটি মূলত পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সালমান এফ রহমান ও শেখ রেহানার প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় শুরু হয়েছিল। সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের লজিস্টিকস ব্যবসার প্রসারে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এই বিশাল সুবিধা দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল। বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী কেন স্বৈরাচার আমলের সেই বিতর্কিত ‘প্যাকেজ ডিল’ বাস্তবায়নে এত মরিয়া, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
শিপিং এজেন্ট ও আমদানিকারকরা বলছেন, রটারড্যাম বা কলম্বো বন্দরে একাধিক অপারেটর থাকে বলেই সেখানে প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা বজায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে যদি এনসিটি ও বে-টার্মিনালের মতো প্রধান স্থাপনাগুলো ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে পুরো অর্থনীতিকে জিম্মি করা তাদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মোড়কে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইন বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার এই ‘আগ্রাসী’ পরিকল্পনা এখনই রুখে দেওয়া উচিত। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো একটি একক প্রতিষ্ঠানকে বন্দরের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত একচেটিয়া আধিপত্য দিতে যাওয়া হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। রক্ষকের আসনে বসে যারা এই জিম্মিদশার পথ প্রশস্ত করছেন, তাঁদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।