12/01/2018
শরীয়তের দৃষ্টিতে মীলাদ-ক্বিয়াম …. (২য় পর্ব)
(ধারাবাহিক)
এখানে উল্লেখ্য যে, মীলাদ শরীফের এরূপ পদ্ধতি নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে করে মানুষ অল্প সময়ে নিয়মতান্ত্রিক বা শরীয়ত সম্মতভাবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সানা-ছীফত, জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করতে পারে এবং উনার প্রতি ছালাত-সালাম পাঠ করতে পারে | যেমন বর্তমানে যে পদ্ধতিতে মাদ্রাসায় ইলমে দ্বীন শিক্ষা দেয়া হয়, তা “খাইরুল কুরুনের” অনেক পরে উদ্ভাবন করা হয়েছে এ জন্য যে, যাতে করে মানুষ অল্প সময়ে সহজভাবে ইলমে দ্বীন শিক্ষা করতে পারে | এটা যদি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফসম্মত হতে পারে, তবে যার সানা-ছীফত করা ও যার প্রতি ছালাত-সালাম পাঠ করা মহান আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ ও উনার সন্তুষ্টি পাওয়ার কারণ, উনার সানা-ছীফত করার ও উনার প্রতি ছালাত-সালাম পাঠ করার মীলাদ শরীফের উক্ত পদ্ধতি কেন পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র হাদীছ শরীফসম্মত হবেনা? অবশ্যই এটা পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র হাদীস শরীফসম্মত |
কারণ কারো পক্ষেই প্রমাণ করা সম্ভব হবেনা যে, মীলাদ শরীফে যে সকল আমল রয়েছে, তার একটিও শরীয়ত বিরোধী | বরং তার প্রত্যেকটাই শরীয়ত তথা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস সম্মত | যেমন- “মীলাদ শরীফের প্রথমেই পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা হয় | কেননা, কোন নেক কাজ পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু করা রহমত, বরকত তথা মহান আল্লাহ্ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভের কারণ |”
অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ছালাত পাঠ করা হয় | কারণ ছালাত পাঠ করা মহান আল্লাহ্ পাক ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই নির্দেশ | এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, মীলাদ শরীফে যেরূপ সম্মিলিতভাবে ছালাত পাঠ করা হয়, তার প্রমাণ পবিত্র কুরআন শরীফ অথবা পবিত্র হাদীছ শরীফে রয়েছে কি? জবাব হলো- অবশ্যই হাদীছ শরীফে তার প্রমাণ রয়েছে |
যেমন- পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
قال النبى صلى الله عليه وسلم-اذا جلس قوم
يصلون على حفت بهم الملنكة من لدن اقدامهم الى
عنان السماءبايديهم قر اطيس الفضة واقلام الذهب
يكتبون الصلات على النبى صلى الله عليه وسلم
ويقولون زيدوا زادكم الله.
অর্থঃ- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যখন কোন সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে বসে এবং সম্মিলিতভাবে আমার প্রতি ছালাত পাঠ করে, তখন ফেরেশতাগণ তাঁদের পা থেকে আকাশ পর্যন্ত বেষ্টন করে নেন | তাঁদের হাতে থাকে রূপার কাগজ ও সোনার কলম | যার দ্বারা তাঁরা ছালাতের সাওয়াব লিখতে থাকেন এবং বলেন, তোমরা আরো অধিক মাত্রায় ছালাত পাঠ কর, আল্লাহ্ পাক তোমাদের উন্নত করবেন |” (দুররুল মুনাজ্জাম, কাশফুল গুম্মাহ্)
এ প্রসঙ্গে অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن ابن عمر رضى الله عنهما. قال النبى صلى
الله عليه وسلم زينوا مجالسكم بالصلوة على
فان صلاتكم على نورلكم يوم القيامة.
(ديلمى مسند الفردوس.
অর্থঃ- হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মজলিসকে আমার প্রতি ছালাত পাঠের দ্বারা সুসজ্জিত কর | কারণ তোমাদের ছালাত পাঠ ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের জন্যে নূরে পরিণত হবে |” (পবিত্র দায়লমী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফের উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সম্মিলিতভাবে মজলিসে ছালাত পাঠ করা অত্যন্ত ফযীলতের কাজ | শরীয়ত সম্মত তো অবশ্যই | তাই মীলাদ শরীফের মধ্যে সম্মিলিতভাবে ছালাত পাঠ করা হয় |
সাথে সাথে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানে শরীয়তসম্মত সুন্দর সুন্দর কাছীদা পাঠ করা হয় | কারণ স্বয়ং হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানে কাছীদা পাঠ করতেন | যেমন বিশিষ্ট সাহাবী বিখ্যাত কবি, হযরত হাসসান বিন ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রচিত কাছীদা পাঠ করে শুনানোর জন্য স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ মিম্বর মুবারকের পাশে উনার জন্যে আরেকটি মিম্বর স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত হাসসান বিন ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কাছীদাসমূহ পাঠ করতেন |
কাজেই মীলাদ শরীফে যে কাছীদা পাঠ করা হয়, তা সুন্নতে সাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু | শরীয়তসম্মত তো বটেই | অতঃপর “তাওয়াল্লুদ শরীফ” পাঠ করা হয় | কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার “তাওয়াল্লুদ বা জন্ম বৃত্তান্ত ও জীবনী মুবারক আলোচনা করা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফেরই নির্দেশ, যেমন- পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
اذكروا نعمة الله عليكم.
অর্থঃ- “তোমাদেরকে আল্লাহ্ পাক-এর যে নিয়ামত দেয়া হয়েছে, তার আলোচনা কর | অর্থাৎ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই হচ্ছেন সে উল্লিখিত নিয়ামত। তোমরা উনার আলোচনা কর |” (সূরা ইমরান/১০৩)
মূলতঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাওয়াল্লুদ শরীফ বা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা শরীয়ত সম্মত তো অবশ্যই, সাথে সাথে অফুরন্ত রহমত, বরকত ও সন্তুষ্টি লাভের কারণ | তাই মীলাদ শরীফে “তাওয়াল্লুদ শরীফ” পাঠ করা হয় |
অতঃপর ক্বিয়াম বা দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করা হয় | কারণ অনুসরণীয় সকল ইমাম-মুজতাহিদ, মুহাক্কিক, মুদাক্কিক ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিগনের সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি দাঁড়িয়ে সালাম পাঠ করা আদবের অন্তর্ভূক্ত | তাই সোনার মদীনায় রওজা শরীফ যিয়ারতের সময় দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করতে হয় |
এ প্রসঙ্গে সকল দেওবন্দী ও বাংলাদেশর কওমীদের অন্যতম গর্ব আশরাফ আলী থানবীর খলীফা, শামছুল হক ফরিদপুরী তার " তাছাউফ তত্ত্ব" কিতাবে মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ এর ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে লিখেছে ---
" ক্বিয়াম জিনিসটা আসলে ফিকাহের অন্তর্ভুক্ত নহে - ইহা তাছাউফের অন্তর্ভুক্ত | অর্থাৎ মুহব্বত বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হযরত রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তারিফের কাসীদা পড়া হয় তাহা দ্বারা মুহব্বত বাড়ে এবং লোকজন মুহব্বতের জোশে খাড়া হইয়া যায় | মুহব্বতের জোশে খাড়া হইলে তাহাকে বিদয়াত বলা যায় না | তাহা ছাড়া হযরত নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সালাম করার সময় বসিয়া বসিয়া সালাম করা শরীফ তবিয়তের লোকের কাছে বড়ই বেয়াদবী লাগে |"
তাছাড়া শরীয়তের কোথাও দাঁড়িয়ে সালাম পাঠ করতে নিষেধ করা হয়েছে, এরূপ একটি প্রমাণও কেউ পেশ করতে পারবেনা | তাই মীলাদ শরীফে ক্বিয়াম করা হয় অর্থাৎ দাঁড়িয়ে সালাম পাঠ করা হয় |
অতঃপর সব শেষে মুনাজাত করা হয় | কারণ, পবিত্র হাদীছ শরীফে রয়েছে,
الدعء مخ العبادة.
অর্থাৎ “দু’য়া বা মুনাজাত হচ্ছে, ইবাদতের মূল বা মগজ |” তাই মীলাদ শরীফ শেষে মুনাজাত করা হয় |
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, মীলাদ শরীফ, মীলাদ শরীফের পদ্ধতি এবং মীলাদ শরীফে যা যা কর হয়, সবই পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফসম্মত |
ইন্ শা আল্লাহ্ চলবে ……