07/08/2026
আসসালামু আলাইকুম,
আমি সৈকত। আমি একজন মধ্যবিত্ত স্বল্প আয়ের মানুষ। আমার বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরীজীবি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি একসময় চাকুরিচ্যুত হন। আমাদের পরিবারে নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া।
আমাদের বংশের বাকিরা যখন টিনের ঘর তুলে ফেলেছে আমরা তখনও খড়ের ঘরে থাকি। আমার বাবা অভাবে ওষুধটাও কিনে খেতে পারতো না।
টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে বাবার চাকরি হয় একটা এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে। যেখানে তার বেতন ছিলো মাত্র ১২০০ টাকা। এরমাঝেই তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন। ডায়াবেটিস, সেখান থেকে চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া, টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারা থেকে কিডনি ফেইলিওর এভাবে দীর্ঘদিন রোগে ভুগে আমার বাবা মারা যান।
আমি আর আমার বোন বহু কষ্টে পরিবারের সবার দয়ায় পড়ালেখা করেছি৷ আমি প্রথম যেদিন ঢাকায় আসি পড়তে আমার পকেটে সেদিন ছিলো মামা-খালাদের মিলিয়ে দেয়া ২০০০ টাকা। যার ১০০০ টাকা হোস্টেলের খরচেই চলে গিয়েছিলো। বাকি ১০০০ টাকায় মাস কীভাবে চালাবো সেই চিন্তায় সদ্য এইচএসসি পাশ করা সৈকত সেদিন বিশাল বড় তোষক আর কাপড়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে দেড় ঘন্টা হেঁটেছিলো টাকা বাঁচানোর তাগিদে।
দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতাম কারণ আমার কাছে তো খাওয়ার টাকা নেই, কে দিবে টাকা! দুপুরে কিছু ভাতের ভ্যানে ৩০ টাকায় ডিমের তরকারী আর ভাত পাওয়া যেতো, ওটাই ছিলো আমার সারাদিনের একমাত্র খাবার। গভীর রাতে ক্ষুধার জ্বালায় মেসে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অন্ধকার রান্নাঘরে হাড়িপাতিল হাতড়ে দেখতাম তলানিতে কিছু পরে আছে কী না। যেদিন কিছু খাবার থেকে যেতো সবাই খাওয়ার পরও, সেদিন রাতে আমার আধপেটা খাবার জুটে যেতো।
খাবারের টাকা জোটাতে আমি কাঠফাটা গরমে গ্যাস ফিলিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে হকারিও করেছি একসময়। যেখান থেকে দিনে আয় হতো মাত্র ১৫০ টাকা।
এত কষ্ট করে বড় হয়েছি দেখেই হয়তো, মানুষের বিপদআপদে আমি কখনো না করতে পারিনি। কারণ আমি অভাবের চরম মূল্য চুকানো মানুষ। আমার সাধ্য আছে কাউকে সাহায্য করার আর আমি তাকে খালি হাতে ফিরিয়েছি সেটা কখনো হয় নাই, হবেও না। মাঝরাতে ঢাকা শহরের এই মাথা থেকে ওই মাথায় কারো রক্ত লাগলে যেমন দৌঁড়ে গেছি, তেমনি গরীব বাচ্চারা যেনো অন্তত অক্ষর পরিচয় শিখতে পারে সেজন্য মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে মজার ইশকুলও গড়েছি।
এভাবে টানাটানি করে আস্তেধীরে একটু সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিলাম। আমাদের জীবনে একটা পুতুল আসলো, আমার বোনের মেয়ে মিনহা। দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা, চিকিৎসা আর হতাশার পর হওয়া আমাদের ফ্যামিলির প্রথম বাবু। ওর মতো বুদ্ধিমান, মায়াময়, চমৎকার এবং সাহসী বাবু আমি জীবনে দেখি নাই। আমার নিজের ভাগনী বলে বলছিনা। অপরিচিত মানুষও ওকে নিয়ে কোথায় গেলে মায়ায় পরে যায়, আদর করে দিয়ে যায়৷ ১৫ দিন পর আমার মা'টার প্রথম জন্মদিন পালন করার কথা। ওর জন্মদিন ঘিরে কত প্ল্যান হচ্ছিলো! কত আনন্দ হতো মনে হলেই!
এত আনন্দ কপালে সইলো না। হুট করে একদিন জানা গেলো ওর লিউকেমিয়া৷ দিব্যি সুস্থসবল বাচ্চা, খেলছে,হাসছে, সারাক্ষণ বাসা মাতিয়ে রাখছে। সেই বাচ্চার নাকি এত কঠিন অসুখ করেছে।
আমার এবং আমার পরিবারের সাধ্যে যতখানি কুলায় ওর জন্য আমরা সব করছি। ওর চিকিৎসায় কোন কমতি রাখছি না। আশার ব্যাপার এটাই যে দীর্ঘ সময় এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা হলেও ওর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
আমি যদি আপনার কোন উপকার কখনো সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞানে করে থাকি, আপনার কাছে হাতজোড় করি ভিক্ষা চাইছি, একটু আমার পাশে দাঁড়ান। এই কঠিন দূর্যোগের দিনে আপনার একটা ছোট্ট ডোনেশন থেকেও ওর একদিনের ওষুধটা হয়তো ম্যানেজ হয়ে যেতে পারে। এরকম ছোট ছোট সাহায্য এক সাথে করে হয়তো ওর পুরো একটা কেমোথেরাপি সেশনের খরচ উঠে যেতে পারে।
আমার নাম সৈকত হলেও সমুদ্রের বিশাল প্রাচুর্য কোনোদিনই আমার ভাগ্যে জোটেনি। ঠিক বাস্তবের সৈকতের মতো। ঢেউ আসে, ছুঁয়ে যায়, তারপর আবার ফিরে যায়। আমার জীবনেও সুখগুলো বারবার ঠিক সেভাবেই এসেছে। মনে হয়েছে, এবার বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর একসময় আবার সবকিছু শূন্য হয়ে গেছে।
আজ প্রথমবারের মতো আমি একটা সমুদ্র চাই। নিজের জন্য না। আমার ছোট্ট ভাগনীর জন্য।
আপনার সামর্থ্যের যতটুকুই সম্ভব, হয়তো একটা ছোট্ট ডোনেশন, হয়তো শুধু এই ক্যাম্পেইনটা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সেই ছোট ছোট ঢেউগুলো একসাথে হয়তো একটা সমুদ্র হয়ে উঠতে পারে।
আমি শুধু এমন একটা সমুদ্র চাই - যে তার সবটুকু জল দিয়ে আমার মা'টাকে বাঁচিয়ে রাখবে। এমন একটা সমুদ্র - যার কোনো ঢেউ আমার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে আর আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে না।
ডোনেশনের লিংক কমেন্টে-