23/01/2026
মানুষের জীবন মানেই স্বপ্নের বহুবর্ণ রূপ। একেক মানুষের স্বপ্ন একেক দিকে ছুটে চলে—কেউ আলো খোঁজে শহরের কংক্রিটে, কেউ শান্তি খোঁজে প্রকৃতির নিঃশব্দে। তাই কারও স্বপ্নকে অন্যের স্বপ্নের মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। সভ্যতার প্রতি কারও আকর্ষণ যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সভ্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর সত্য।
সভ্য মানুষ সাধারণত মনে করে—উন্নত জীবন মানে সুবিধা, আরাম এবং নিরাপত্তা। ঠান্ডার সময় গরম পানি, নরম বিছানা, পাকা রাস্তা, আধুনিক হাসপাতাল, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, সমৃদ্ধ খাবার—এসবই যেন সুখের চূড়ান্ত সংজ্ঞা। মানুষের হাতে যখন সবকিছু সহজলভ্য হয়, তখন সে নিজেকে উন্নত মনে করে, সভ্য মনে করে, সফল মনে করে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আরামই কি সত্যিকার শান্তি?
আমার কাছে শান্তির অর্থ ভিন্ন। আমার শান্তি লুকিয়ে আছে ভোরের পাখিদের কলরবে, শীতের কুয়াশায় ভেজা মেঠো পথে হাঁটার অনুভূতিতে। বৃষ্টির একটানা শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ—এইসব দৃশ্য ও গন্ধে আমি এক ধরনের আদিম আনন্দ খুঁজে পাই। উনুনে পোড়ানো সাধারণ খাবার, শহরের যন্ত্রের কোলাহলের বদলে জঙ্গলের পশু-পাখির ডাক—এসব আমার কাছে শুধু জীবন নয়, বরং জীবনের প্রকৃত স্বর।
সভ্যতার শহর মানুষকে দিয়েছে গতি, দিয়েছে সুবিধা, কিন্তু অনেক সময় কেড়ে নিয়েছে গভীর অনুভবের ক্ষমতা। শহরের মানুষ হয়তো দ্রুত বাঁচে, কিন্তু গভীরভাবে বাঁচে না। আর জঙ্গল—সে মানুষকে ধীর করে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে শেখায়, জীবনের মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। হয়তো জঙ্গলে নেই উন্নত চিকিৎসা, নেই আধুনিক নিরাপত্তা। কিন্তু মৃত্যু তো অনিবার্য—শহরেও, জঙ্গলেও।
তাই প্রশ্নটা জীবন কতটা দীর্ঘ—তা নয়, বরং জীবন কতটা সত্য—তা নিয়েই। সভ্যতার আলো আর জঙ্গলের অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি বুঝি— উন্নত জীবন মানে শুধু আরাম নয়, উন্নত জীবন মানে নিজের আত্মার সঙ্গে সৎ থাকা,
নিজের প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বেঁচে থাকা।
এ কারণেই, সভ্যতার কোলাহলের চেয়ে জঙ্গলের নীরবতাই আমার কাছে বেশি মানবিক, বেশি সত্য, বেশি শান্ত।