12/11/2025
অশান্তির ময়না পাখি:
৫ই আগস্ট তারিখে, শেখ হাসিনার নির্বাসনের পর, আমরা সবাই দেখেছি, সেনাবাহিনীর সুচিন্তিত নির্লিপ্ততার সুযোগ নিয়ে, জেঞ্জি সোনারা গণভবন লুট করেছিল। কেউ রান্না করা তরকারি খেয়ে নিল। মায়ের বয়সী প্রধানমন্ত্রীর বক্ষবন্ধনী দিয়ে নিজের মস্তক ঢাকলো কেউ; কেউবা তাঁর অন্তর্বাস মেলে ধরলো নিজের মুখের সামনে; শাড়ি দিয়ে নিজের শ্রীনিতম্বখান পেঁচিয়ে নিল কোনো কিশোরী; এসব লুটের সুবর্ণ সুযোগ যারা মিস করলো, তাদের কেউবা পুকুরের মাছ, হাঁস চুরি করলো। কেউ হয়তো বা কিছুই না পেয়ে এক গাছা কচুর লতি লুট করে মহানন্দে ফেসবুকে সেলফি লোডালো। এর পর প্রত্যেকে যার যার বাসায় ফিরে এমন সব সূর্যসন্তানের জন্মদানজনিত মহাগৗরবে পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের মুখ উজ্জ্বল করলো।
যখনকার কথা বলছি, লুট তখনও চলমান। হঠাৎ মাথার উপরে শোনা গেলো: ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’! লুটেরা জেঞ্জিরা সবাই অবাক! এই শ্লোগানতো এখন শোনা যাবার কথা নয়! কে দিচ্ছে এমন বদখত শ্লোগান? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। অবশেষে সবাই লক্ষ্য করলো, মাথার উপরে সিলিঙ থেকে একটি পাখির খাঁচা ঝুলছে এবং তাতে দাঁড়ের উপর তিড়িং তিড়িং লাফিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে এক ময়না, হয়তো এত হৈচৈ হট্টগোল দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে, নিজের জীবনাশঙ্কায়। সবের কিংবা মবের মাথা তখন খুব গরম, শরীরেও খুব জোশ। ময়নাটিকে নামিয়ে খাঁচাসহ পিষে মেরেই ফেলতো তারা। ভাগ্যক্রমে এক ‘সহৃদয়’ (এমন ‘মাল’ বিরল যদিও) সমন্বয়ক ছিল কাছাকাছি। স-খাঁচা ময়নাটিকে উদ্ধার করে সে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলো।
প্রথম কয়েক দিন সমন্বয়কের পিতা-মাতা পুত্রের কাজ-কর্মে উৎসাহও দেননি, বাধাও দেননি। বাসায় পরিবেশ-পরিস্থিতি মোটামুটি, শান্ত, নীরব। পাখিও নীরবই রইল। ইতিমধ্যে শান্তিবুড়ো প্যারিস থেকে উড়ে এসে প্রধান উপদেষ্টা হয়ে বাংলাদেশে জুড়ে বসলেন। পাখি তখনও নীরব। সমন্বয়কের পরহেজগার পিতা-মাতার একদিন হুঁস হলো, ছেলেকে ডেকে তাঁরা বললেন যে লুটের ময়না ঘরে স্থান দিতে তাঁরা নারাজ। ইতিমধ্যে এ নিয়ে সমন্বয়ক পুত্রের সঙ্গে তার পিতামাতার মৃদু বাদানুবাদও হয়েছে। তাছাড়া সমন্বয়কেরও পাখি পোষার ফুসরৎ কই? তার চোখে তখন টু-পাইস কামানোর রঙিন সুর্মা।
যাই হোক, নিজের ঘরে ঝামেলা আর না বাড়িয়ে সমন্বয়ক যেদিন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলো শান্তি বুইড়ার অফিসে, সেদিন ময়নাটা শান্তিবুড়োকে উপহার দিয়ে এলো। হয়ে গেলো ‘কইয়ের তেলে কৈ ভাজা’, কিংবা ‘গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজা’। ঘাড় থেকে ময়নার বোঝা ও মাথা থেকে লুট-জনিত শেষ অস্বস্তিটুকুও নেমে গেলো।
ময়নার খাঁচা এখন ঝুলছে শান্তি বুইড়ার অধিবেশন কক্ষে, ঘরের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের অংশ হিসেবে। পিকাসোর ‘শান্তির পায়রা’ নেইতো কী হয়েছে, (আফ্রিকার সম্রাট) বোকাসোর ‘অশান্তির ময়নাতো’ আছে!
ময়না বেচারা নতুন জায়গায় সারা দিন চুপচাপই থাকে। কিন্তু যখনই কোনো অধিবেশন শুরু হয়, কিংবা কোনো সমন্বয়ক বা পরামর্শক, বিশেষ করে আইন পরামর্শকের গলা সে শুনে, কিংবা তাদের (না-)পাকি গন্ধটা তার নাকে যায়, অমনি ময়না বলে উঠে: ‘জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!’
খুবই বিব্রতকর একটা অবস্থা। এক বার, দুই বার, তিন বার। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন। সবাই বিরক্ত হতে শুরু করলো। অবোধ পাখি, বুঝলাম, কিন্তু বাণী তার খুবই আপত্তিকর, সহ্যের অতীত। শান্তিবুড়ো, সমন্বয়ক, উপদেষ্টা সবার গায়ে আগুন ধরে যায় পাখির এই বুলি শুনে। মানুষ হলে কবেই মব জাস্টিস করে মেরে ফেলতো, কিংবা আবোল তাবোল কোনো মামলার হাজার ৩৩৩৬তম আসামী করে জেলের ‘দানা’ খাওয়াতো, কারণ পাখি ভেতো বাঙালি নয় যে ভাত খাবে। পাখি বলে কি মানুষ না?
পাখিকে নতুন কথা শেখানোর জন্যে শিক্ষক নিয়ে আসা হলো ঢাকা বিশ্বমাদ্রাসার যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ থেকে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘তুই ক্যাডা, মুই ক্যাডা? রাজাকার রাজাকার’ ইত্যাদি বুলি শেখানোর বহু বৈজ্ঞানিক চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে অবোধ ময়নার মৃত্যুদণ্ড স্থির হলো।
পাখির দানাপানি বন্ধ করে দেওয়া হলো প্রথমে। কয়েক দিন অভুক্ত-পিপাসার্ত থেকে খুবই দুর্বল হয়ে গেলো বটে, কিন্তু পাখির গোয়ার্তুমি গেল না। কোন মতে জড়ানো কণ্ঠে ধীর গতিতে: ‘জঅয় বাআআংলাআ, জয়য় বঙগঅবঅনধুউ’ বলেই চললো ময়না। মানুষ হলে না হয় চরথাপ্পর বা ধমক দিয়ে থামানো যেতো, কিন্তু সামান্য পাখির আওয়ামি লিগের মতো অতবড় গাল কই যে ইউনুস গং-এর ক্রমাগত থাপ্পর সহ্য করে যাবে।
শান্তিবুড়োর আর যত দোষই থাক, কোনো প্রকার ভিন্নমত সহ্য করেন তিনি, এমন অপবাদ তাঁর শত্রুও দেবে না। ময়নার গোঁয়ার্তুমি দেখে শান্তিবুড়োর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। ‘এই সোদানির ফোয়ারে ফিরিজর মইধ্যে ঢুকাই রাখঅ, এক ঘণ্টা! মনার বাইচ্যা মনা কতক্ষণ ‘জয় বাংলা’ গাইত পারে, চাই!’ (অনুবাদ কি লাগবে? মহাপুরুষের ঐশী বাণী অনুবাদ করা উচিতও নয়!) পরিচারকেরা শান্তিবুড়োর মুখে এমন নিষ্ঠুর আদেশ শুনে বিমর্ষ হলো বটে, কিন্তু আদেশ তাদের পালন করতেই হলো, কারণ প্রাক্তন সরকারের পুলিশের মতো তারাও হুকুমের গোলাম।
ঘণ্টাখানেক পর ফ্রিজ থেকে বের করা হলো পাখিকে। কয়েক দিনের অভুক্ত, ঠাণ্ডায় জমতে থাকা ময়না থর থর করে কাঁপছিল। সবাই আশ্চর্য হলো এই দেখে যে মুমূর্ষু ময়না বিদ্রুপের দৃষ্টিতে স্থির তাকিয়ে আছে, অন্য কেউ নয়, শুধু শান্তিবুড়োর দিকে। কিন্তু মৃতুযন্ত্রণা সহ্য করেও যে ময়নার কম্পিত ঠোঁট থেকে বিরবির করে ‘জঅঅঅয় বাআআআংলাআআ, জঅঅয় বঙগঅঅবঅঅনধুউউ’ ধ্বনিই বের হচ্ছে, সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না কারোরই, যমুনায় হাজির স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ, উভয় দলের। তাদের অনেকেরই মনে পড়লো, ১৯৭১ সালে কীভাবে শত নির্যাতন সহ্য করেও মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয়বাংলা’ বলে চিৎকার করে উঠতো।
শান্তিবুড়োর চাটগাঁইয়া গায়ের গরম রক্ত যেন মাথায় উঠে গেলো। নিজে ‘সুদির পুত’ হয়েও সামান্য ময়নাকে ‘সুদির ভাই’ বলে নিজের হাতে খামচে ধরলেন এবং অনতিবিলম্বে ঢুকিয়ে দিলেন তিনি ডিপফ্রিজে। ‘চব্বিশ ঘন্টার আগে সোদানির পোয়ারে বাইর ন গরিবা! জয়বাংলা এই বার বন্ধ ন অইলে ইতারে ক্যাঁচা খাই ফালাইয়ম!’
পাখিকে কাঁচা খেয়ে ফেলার প্রয়োজন হলো না। চব্বিশ ঘণ্টা পর দেখা গেলো, ময়না ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে আছে। আবারও বলছি, ময়না বলে কি মানুষ না?
[নীরবতা ভঙ্গ করিয়া শাস্তা কহিলেন: ‘গল্পটা এখানেই শেষ হলে ক্লাইমেক্সটা তেমন কড়াপাকের হতো না। শান্তিবুড়ো লক্ষ্য করলেন, ময়নার মৃতদেহে ডান পা উঠে আছে মাথার উপরে, তর্জনী উঁচিয়ে রাখা, যা প্রথমত, নিশ্চিতভাবে রেসকোর্সের মাঠে বঙ্গবন্ধুর উচ্ছ্রিত তর্জনীকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এবং দ্বিতীয়ত, কোনো সন্দেহ থাকে না, সেই ‘জয় বাংলা’ বলেই পাখি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, যে ‘জয়বাংলা’ ১৯৭১ সালে শান্তিবুড়োর নিজেরও নাকি শ্লোগান ছিল।
শান্তিবুড়ো ভেবেছিলেন, রাতের ডিনারে ময়নার রোস্ট খাবেন। মৃত পাখির তর্জনীর ইঙ্গিতটা বুঝে সেই দুঃসাহস আর করলেন না। শান্তি বুইড়ার অশান্তি বেড়ে গেল। প্রতি রাতে ময়নাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভেঙ্গে যায়।