25/08/2026
আক্ষেপ
—মুন্সী নাহীদ ফরহাদ রাজু
যে কথাডা তোরে কওনের কথা—
হেই কথাডাই কই শহরের বিলবোর্ডের লগে।
তুই এই শহরেই আছস,
তবু তোরে দেখি না—
দেহি খালি
আকাশ ছোঁয়া বিলবোর্ড,
ঝলমলে বাত্তি,
আর মানুষের মুখের মইধ্যে
হাজার রকমের বিজ্ঞাপন।
রাইত নামলে
শহরডা যখন নীল আলোয় ভইরা যায়,
তখন তোর মুখডা খুঁজি।
কখনো কোনো রিকশাওয়ালার পাশে,
কখনো কোনো মাইয়ার চুলের ভাঁজে,
কখনো বাসের জানালায়,
কখনো চায়ের দোকানের ধোঁয়ার মইধ্যে।
কেউ তোর মতো হাইসে ওঠে,
কেউ তোর মতো চোখ নামায়,
কেউ তোর মতো চুপ কইরা থাকে—
আমি থমকাইয়া দাঁড়াই।
তারপর বুঝি—
সে তুই না।
এই “তুই না” কথাডা
কত বড় কষ্ট,
হেইডা যার বুকের ভিতর আছে
সে ছাড়া আর কেউ জানে না।
অথচ তোর লগে
একটা বিকাল কাটাইবার লাইগা
আমি কত সন্ধ্যা ফালাইয়া দিছি।
কত রাইত
জানালার পাশে বইসা
শহরের বাত্তি গুনছি।
আর মনে মনে ভাবছি—
এই শহরের কোনো এক রাস্তায়
তুইও কি আমার কথা ভাবতেছস?
হয়তো তুইও
কোনো জানালার পাশে বইসা আছস।
হয়তো তোর জানালার বাইরেও
বৃষ্টি পড়তেছে।
হয়তো দূরে
কোনো রিকশার ঘণ্টি বাজতেছে।
হয়তো কোনো চায়ের দোকানে
কেউ হাইসা উঠছে।
আর তুই—
চুপ কইরা
আমারে মনে করতেছস।
আবার হয়তো না।
হয়তো তুই
আমারে একেবারেই ভুইলা গেছস।
এই “হয়তো”
কথাডাই সবচাইতে বেশি কষ্ট দেয়।
---
তুই জানস,
ময়মনসিংহের বিকালডা কেমন?
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে
যখন শেষ বিকালের রোদ
আস্তে আস্তে নরম হইয়া আসে,
কাশফুলগুলা বাতাসে দোলে,
নদীর পানি
চুপচাপ কূলে আইসা লাগে—
তখন আমার তোর কথা মনে পড়ে।
মনে হয়,
তুই যদি পাশে থাকতি,
দুইজন চুপ কইরা
ঘাটের সিঁড়িতে বইসা থাকতাম।
কথা কওনেরও দরকার হইত না।
তুই নদীর দিকে চাইয়া থাকতি,
আমি তোর দিকে।
মাঝখানে
বইত নদী।
আর আমাগো না-কওয়া কথাগুলা
ভাসত পানির লগে।
কিন্তু তুই নাই।
আমি একলাই।
ব্রহ্মপুত্র আছে,
ঘাট আছে,
কাশবন আছে,
বিকালের বাতাস আছে—
খালি তুই নাই।
এইটাই আমার আক্ষেপ।
---
যে কথাগুলা তোরে কওনের কথা—
হেইগুলা অহন
রাস্তার বাত্তির কাছে জমা থাকে।
রাইত বাড়ে।
শহর ঘুমায়।
দোকানের ঝাঁপ নামে।
শেষ রিকশাডাও
ধীরে ধীরে গলির মইধ্যে হারায়।
কিন্তু আমার কথা শেষ হয় না।
আমি তখন
মনে মনে তোর লগে কথা কই।
কই—
“তুই কেমন আছস?”
“খাইছস?”
“এতদিন কই আছিলি?”
“আমারে কি একটুও মনে পড়ে?”
কোনো জবাব আসে না।
দূরে খালি
কোনো কুকুর ডাইকা ওঠে।
কোনো ট্রেনের শব্দ
রাইতের বুকের ভিতর দিয়া
দূরে চইলা যায়।
আর আমি বুঝি—
তুই আমার কাছে নাই।
---
যে চিঠিডা তোরে লেখনের কথা—
হেই চিঠিডাই লিখি
নগরপিতার কাছে।
লিখি—
এই শহরের ফুটপাতগুলা
এত ভাঙা ক্যান?
বৃষ্টির পানিতে
রাস্তা আর নদীর মাজে
ফারাক থাকে না ক্যান?
ক্যান রাত নামলে
কেউ দামি গাড়িতে বাড়ি ফেরে,
আর কেউ ফুটপাতের ওপর
পলিথিন টানাইয়া ঘুমায়?
ক্যান নদীর পাড়ে
এত সুন্দর বাতাস,
আর মানুষের জীবনে
এত হাহাকার?
লিখতে লিখতে
চিঠির শেষ পাতায়
কেমনে জানি
তোর নাম আইসা পড়ে।
আমি লিখতে চাই—
“প্রিয় তুই,
কেমন আছস?”
তারপর থাইমা যাই।
কলমডা
কাগজের ওপরে থাইমা থাকে।
চিঠিডা ভাঁজ করি।
খামে ভরি।
কিন্তু ঠিকানা লিখি না।
কারণ—
তোর ঠিকানা আমি জানি না।
খালি জানি,
তুই এই শহরেই আছস।
---
তোর বাড়ির গলিডা
আমি চিনি।
চিনি সেই মোড়,
যেইখানে শীতের সকালে
চায়ের দোকান থেইকা ধোঁয়া ওঠে।
চিনি সেই রাস্তা,
যেইখানে বর্ষায়
পানি জমে ছোট্ট নদী হইয়া যায়।
চিনি সেই ঘাট,
যেইখান থেইকা
ব্রহ্মপুত্রের বাতাস
শরীরের ভিতর ঢুইকা যায়।
চিনি তোর পছন্দের বিকাল।
চিনি তোর হাঁটার শব্দ।
চিনি তোর হাসি।
খালি চিনি না—
তোর কাছে যাওনের সাহস।
---
যে গানডা তোরে শোনানোর কথা,
তোর লগে গাওনের কথা—
হেই গান অহন
নদীর পাড়ে একলাই গাই।
কখনো বাতাস
আমার সুর লইয়া যায়।
কখনো নদী
আমার কথা গিল্যা ফেলে।
কখনো কাশফুল
মাথা নাড়াইয়া মনে হয়
আমারে বুঝতেছে।
আমি তখন ভাবি—
তুই যদি থাকতি!
তুই যদি একবার কইতি—
“আবার গা।”
আমি হয়তো
সারারাত গান গাইতাম।
---
কী অদ্ভুত জীবন রে!
মানুষ ভালোবাসার কথা
মুখ দিয়া কইতে পারে না,
কিন্তু মরণ আইলে
সবাই দৌড়ায়।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন
রাইতের বুক ফাইড়া যায়।
হাসপাতালের সামনে
মানুষ দাঁড়াইয়া থাকে।
কারও চোখে পানি,
কারও হাতে রিপোর্ট,
কারও ঠোঁটে দোয়া।
তখন মনে হয়—
জীবনডা তো
আসলে খুবই ছোট।
একটা ফোন করা যায়।
একবার দেখা করা যায়।
একটা কথা কওয়া যায়—
“তুই কেমন আছস?”
তবু আমরা কই না।
অভিমান করি।
অহংকার করি।
ভয় পাই।
অপেক্ষা করি।
তারপর একদিন
দেখি—
অপেক্ষা করার মানুষডাই নাই।
---
এই শহরের হেরেক মোড়ে
আমি তোরে খুঁজি।
ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে খুঁজি।
চায়ের দোকানে খুঁজি।
পুরান গলিতে খুঁজি।
বৃষ্টির পানিতে খুঁজি।
শীতের কুয়াশায় খুঁজি।
গ্রীষ্মের ধুলায় খুঁজি।
কাশবনের দোলায় খুঁজি।
নৌকার মাঝির গলায় খুঁজি।
হাটের ভিড়ে খুঁজি।
কোথাও তুই নাই।
অথচ তোর না-থাকাডা
সবখানেই আছে।
---
একদিন
একটা মাইয়া লাল শাড়ি পইরা
ব্রহ্মপুত্রের পাড় দিয়া
হাঁইটা যাইতেছিল।
দূর থেইকা
তোর মতো লাগল।
আমি থাইমা গেলাম।
বুকের ভিতর
কেমন জানি ধক কইরা উঠল।
মাইয়াডা পেছন ফিরল।
দেহি—
তুই না।
আমি তখন
নিজের কাছেই হাইসা কইলাম—
“বোকা মানুষ,
তুই এখনো তোরে খুঁজস?”
হ্যাঁ।
খুঁজি।
কারণ মানুষরে
ভুইলা থাকা যায়,
কিন্তু মনের ভিতর
যে মানুষডারে একবার
বসাইয়া ফেলা যায়—
তারে উঠানো যায় না।
---
কখনো মনে হয়,
তুই হয়তো আমার পাশ দিয়া
হাঁইটা গেছস।
আমি অন্যদিকে চাইয়া ছিলাম।
হয়তো কোনোদিন
একই ঘাটে দাঁড়াইয়া
আমরা দুইজন
একই নদীর দিকে চাইছিলাম।
তুই জানস না
আমি আছিলাম।
আমি জানি না
তুই আছিলি।
একই বাতাস
আমাগো দুইজনরে ছুঁইয়া গেছে।
একই নদীর পানি
দুইজনের চোখে
একই রকম আলো ফেলছে।
শুধু—
আমরা একে অপররে
দেখি নাই।
এইটাই কি দূরত্ব?
না।
দূরত্ব কিলোমিটারে নাই।
দূরত্ব আছে—
একটা না-পাঠানো মেসেজে,
একটা মুছা ফেলা নাম্বারে,
একটা “কেমন আছস?”
না-জিগাইবার ভিতরে,
একটা “চল দেখা করি”
না-কওয়া বিকালে,
আর একটা
“আমি তোরে এখনো ভালোবাসি”
না-বলা জীবনে।
---
মুঠোফোনে তোর নাম লিখি।
অনেকক্ষণ তাকাইয়া থাকি।
ভাবি—
“কই আছস?”
লিখি।
আবার মুছা দিই।
ভাবি—
“তোরে মনে পড়ে।”
লিখি।
আবার মুছা দিই।
শেষে
স্ক্রিনডা নিভা যায়।
ঘর অন্ধকার হয়।
আর আমার ভিতরের
একটা আলো
আরও একটু নিভা যায়।
---
কিছু সম্পর্ক
ভাঙে না।
খালি কথা কওয়া বন্ধ হয়।
কিছু মানুষ
হারায় না।
খালি কাছে থাইকাও
দূরের মানুষ হইয়া যায়।
কিছু ভালোবাসা
শেষ হয় না।
খালি তার
কোনো ঠিকানা থাকে না।
তুই আর আমি
তেমনই একটা গল্প।
যার শুরুডা মনে আছে।
মাঝের দিনগুলা মনে আছে।
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের
কিছু বিকাল মনে আছে।
বৃষ্টির দিনের
কিছু কথা মনে আছে।
চায়ের কাপের ধোঁয়া মনে আছে।
শুধু শেষডা—
কেউ লেখে নাই।
---
হয়তো একদিন
হঠাৎ তুই আইসা কইবি—
“এতদিন কই আছিলি?”
আমি হাইসা কইমু—
“এইহানেই তো আছিলাম।”
তুই জিগাইবি—
“তাইলে দেখা হইল না ক্যান?”
আমি কী কইমু?
কইমু—
শহরডা আমগো
একই ঠিকানা দিছিল,
খালি একই সময় দেয় নাই।
নাকি কইমু—
আমরা দুইজনেই
একে অপররে খুঁজছি,
খালি একই সময়ে না।
নাকি কিছুই কইমু না।
চুপ কইরা
তোর দিকে চাইয়া থাকমু।
কারণ কিছু প্রশ্নের
কোনো জবাব নাই।
জবাব দিলে
হয়তো গল্পডাই শেষ হইয়া যাইব।
আমি চাই না
তুই আমার গল্পের শেষ হস।
তুই বরং
আমার অসমাপ্ত প্রশ্ন হইয়া থাক।
---
তুই হইস—
শীতের সকালের
ব্রহ্মপুত্রের কুয়াশা,
যারে দেখা যায়,
ছোঁয়া যায় না।
তুই হইস—
বর্ষার নদী,
যারে থামানো যায় না।
তুই হইস—
কাশবনের বাতাস,
যারে ধরা যায় না।
তুই হইস—
ময়মনসিংহের বিকাল,
যারে ভুলা যায় না।
তুই আমার জীবনের
একটা অসমাপ্ত ঋতু।
---
তোর কথা মনে পড়লে
আজও শহরের দিকে চাইয়া থাকি।
দেহি—
বিলবোর্ড জ্বলতেছে।
ম্যানহোল খোলা।
অ্যাম্বুলেন্স ছুটতেছে।
হাসপাতালের সামনে ভিড়।
ফুটপাতে মানুষ ঘুমাইতেছে।
কেউ প্রেম করতেছে।
কেউ বিচ্ছেদের কষ্টে কান্দতেছে।
কেউ বাড়ি ফিরতেছে।
কেউ কারও অপেক্ষায় আছে।
আর দূরে—
ব্রহ্মপুত্র
নিজের মতো বইয়া যাইতেছে।
কাউরে কিছু না কইয়া।
এই নদীডা জানে—
কত মানুষ
তার পাড়ে বইসা
কান্দছে।
কত মানুষ
ভালোবাসার কথা
কইতে পারে নাই।
কত মানুষ
একজন মানুষরে
ভুইলা যাওনের ভান করছে।
তুইও হয়তো
কোনোদিন
এই নদীর পাড়ে বইসা
আমারে মনে করছস।
হয়তো না।
---
আমি জানি না
তুই অহন কারে ভালোবাসস।
জানি না
কার হাত ধইরা
তুই রাস্তা পার হস।
জানি না
কার লগে বইসা
তুই চা খাস।
জানি না
রাইতে ঘুমাইবার আগে
কার কথা তোর মনে পড়ে।
খালি এইটুকু জানি—
কখনো যদি হঠাৎ
তোর আমার কথা মনে পড়ে,
তাইলে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে
একবার আইসা দাঁড়াইস।
কাশফুলের দিকে চাইস।
নদীর পানির দিকে চাইস।
হয়তো দেখবি—
একজন মানুষ
এখনো কোনো এক ঘাটে
তোর কথা ভাবতেছে।
সে আমি নাও হইতে পারি।
তবু মনে কইরো—
হয়তো আমি।
---
কারণ কিছু মানুষ
শরীরে দূরে চইলা গেলেও
মনের শহর থেইকা
কখনো চইলা যায় না।
তুই এই শহরেই আছস—
এইটুকু জানাই
আমার সবচাইতে বড় সান্ত্বনা।
আর তোরে দেখি না—
এইটুকুই
আমার সবচাইতে বড় আক্ষেপ।
তবু আক্ষেপ একটাই—
এই শহরডা রোজ
আমারে তোর কথা মনে করাইয়া দেয়।
বৃষ্টির শব্দে,
রাইতের বাতাসে,
ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ে,
কাশফুলের দোলায়,
চায়ের কাপে,
অচেনা কারও হাসিতে,
পুরান কোনো গানে,
ঘাটের সিঁড়িতে,
নিভা যাওয়া বাত্তিতে—
সবখানেই
তোর ছায়া আছে।
খালি তুই নাই।
---
তাই রোজ
একই শহরে হাঁটি।
একই আসমানের নিচে।
একই বাতাস বুকের ভিতর নিয়া।
একই নদীর পাড় দিয়া।
একই রাস্তায়
তোরে না-পাওয়ার অভ্যাস করি।
তুই হয়তো জানস না—
তোরে না দেইখাও
কীভাবে একজন মানুষ
রোজ তোরে দেইখা যাইতে পারে।
তোর লগে কথা না কইয়াও
কীভাবে সারাদিন
তোর লগেই কথা কওয়া যায়।
তোরে ছুঁইতে না পারলেও
কীভাবে একজন মানুষ
সারাজীবন
একটা স্পর্শের স্মৃতি
বুকের ভিতর বুইনা বেড়ায়।
এই শহর আমারে
অনেক কিছু শিখাইছে—
ভিড়ের মইধ্যে একলা থাকতে,
কথার মইধ্যে চুপ থাকতে,
হাসির আড়ালে কান্দতে,
ভালোবাসার পরেও
অভিমান না করতে।
খালি একটা জিনিস
আজও শিখতে পারি নাই—
তোরে ভুইলা থাকতে।
---
হয়তো কোনোদিন
শহরডা বদলাইয়া যাইব।
নতুন রাস্তা হইব।
পুরান বিলবোর্ড নামব।
ম্যানহোল বন্ধ হইব।
হাসপাতালের সামনে
ভিড় কমব।
মানুষের জীবন বদলাইব।
ব্রহ্মপুত্রও হয়তো
তার গতিপথ বদলাইব।
কিন্তু আমার ভিতরের
একটা পুরান রাস্তা
তোর কাছেই যাইব।
হেই রাস্তায়
কোনো ট্রাফিক থাকব না।
কোনো সিগন্যাল থাকব না।
কোনো বিলবোর্ড থাকব না।
কোনো শহরের কোলাহল থাকব না।
খালি—
তুই থাকবি।
আর আমি থাকমু।
অনেক বছর পরেও
হেই রাস্তায় দাঁড়াইয়া
একবার খালি কইমু—
“তুই এই শহরেই আছিলি,
তবু এতদিন
দেখা হইল না ক্যান?”
হয়তো তুই হাসবি।
হয়তো কিছুই কইবি না।
হয়তো কইবি—
“তুই তো ডাকস নাই।”
আমি চুপ কইরা থাকমু।
কারণ সত্যিটা হইল—
আমি ডাকিনি।
তুইও ডাকস নাই।
আমগো মাঝখানে
যেই শহরডা আছিল,
হেই শহর রোজ
আমগো দুইজনের হইয়া
অনেক কথা কইছে।
খালি একবারও কই নাই—
“তোরা দুইজন
একবার একে অপরের কাছে
ফিরা যা।”
এই লাইগাই
আমার এত আক্ষেপ।
---
তুই এই শহরেই আছস—
তবু তুই আমার নস।
তোরে দেখি না—
তবু তোর ছায়া দেহি।
তোর লগে কথা কই না—
তবু তোর নীরবতা শুনি।
তোর হাত ধরি না—
তবু তোর হাতের উষ্ণতা
আজও আমার স্মৃতির মইধ্যে রইছে।
আর রোজ
শহরের ভিড় পার হইয়া
আমি যখন একলা বাড়ি ফিরি,
তখন মনে হয়—
আজও যদি তুই
একবার পথ আটকাইয়া দাঁড়াইতি,
একবার খালি কইতি—
“চল,
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে
একটু হাঁটি।”
তাইলে হয়তো
এই লম্বা জীবনটার
সব ক্লান্তি
ভুইলা যাইতাম।
---
কিন্তু তুই এই শহরেই আছস।
আমি জানি।
আর আমি
এই শহরেই আছি।
তুইও হয়তো জানস।
খালি আমগো দুইজনের
ঠিক মাঝখানে দাঁড়াইয়া আছে
একটা লম্বা নীরবতা।
যেই নীরবতা
কোনো বিলবোর্ড ঢাকে না,
কোনো চিঠি ভাঙতে পারে না,
কোনো গান পার হইতে পারে না,
ব্রহ্মপুত্রের স্রোতও
যেই নীরবতা
ভাসাইয়া নিতে পারে না।
তাই—
যে কথাডা তোরে কওনের কথা,
হেই কথাডা আজও কই না।
যে চিঠিডা তোরে লেখনের কথা,
হেই চিঠিডা আজও পাঠাই না।
যে গানডা তোর লগে গাওনের কথা,
হেই গানডা আজও একলা গাই।
আর যে মানুষডারে
একদিন খুব কাছে চাইছিলাম—
হেই মানুষডারেই
আজ সবচাইতে দূর থেইকা ভালোবাসি।
তুই এই শহরেই আছস—
এইটুকু সত্য
আমারে বাইচা রাখে।
আর তোরে দেখি না—
এইটুকু সত্য
রোজ আমারে
আরও একটু কইরা ভাইঙা দেয়।
তবু আক্ষেপ একটাই—
এই শহরডা রোজ
আমারে তোর কথা মনে করাইয়া দেয়,
ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ে
তোর নাম লিখে দেয়,
কাশফুলের দোলায়
তোর ছায়া দেখায়,
বৃষ্টির ফোঁটায়
তোর স্পর্শ মনে করায়—
শুধু তোরেই
আমার সামনে আইনা
দাঁড় করায় না।
আর আমি—
তোর অপেক্ষায় নাই,
তবু অপেক্ষা করি।
তোরে খুঁজি না,
তবু খুঁজতে ফিরি।
তোরে ডাকমু না,
তবু প্রতিটা নীরবতায়
তোর নামই শুনি।
কারণ কিছু আক্ষেপ
কখনো শেষ হয় না—
খালি মানুষ
হেই আক্ষেপের লগে
বাইচা থাকতে শেখে।
আর কিছু মানুষ—
শহর বদলাইয়া গেলেও,
নদীর গতিপথ বদলাইয়া গেলেও,
সময় বদলাইয়া গেলেও,
জীবন বদলাইয়া গেলেও—
মনের ভিতর
একই জায়গায়
দাঁড়াইয়া থাকে।
তুইও তেমনই একজন—
আমার শহরের
সবচাইতে কাছে থাকা,
আমার নদীর
সবচাইতে ওপারের,
আমার জীবনের
সবচাইতে না-পাওয়া,
আর আমার মনের
সবচাইতে দূরের মানুষ।