17/08/2025
৫ আগস্ট-পরবর্তী দখলদার শক্তি নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে আক্রমণ করে চলেছে। তারা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার বা বাতিল করতে পারছে না, তাই ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়ে কুতর্কে লিপ্ত হয়েছে। আজ সেই সব কুতর্কের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট:
মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল ভারত ভাগের অল্প কিছুদিন পরেই। পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রকাঠামো ব্রিটিশরা যেভাবে দাঁড় করিয়েছিল, ইতিহাস ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সেটি ছিল এক উদ্ভট ও বিকৃত ধারণা। চল্লিশের দশকে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন এই সময়েই রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ “রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে” ঘোষণা করলে শিক্ষিত বাঙালি নিজের ভাষার অধিকার ও জাতিসত্তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। পরবর্তী চার বছরের ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক অধিকারবোধকে দৃঢ় করে তোলে, যা স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ভিত্তি তৈরি করে।
এই সময়েই বাঙালি সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান। ষাটের দশকে বাঙালি সমাজ যখন নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, তখন শেখ মুজিব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন এই জাতিসত্তার উত্থান। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। মওলানা ভাসানীসহ সমসাময়িক নেতারা বড় মাপের হলেও, তাঁরা কেউ শেখ মুজিবের মতো সমগ্র জাতির প্রতিনিধিতে পরিণত হতে পারেননি।
চল্লিশের দশকের সাংস্কৃতিক উন্মেষ থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত সবার একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দিকনির্দেশনায় ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন মূর্ত হয়ে ওঠে।
ছয় দফা, অসহযোগ ও বঙ্গবন্ধু:
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। এ দাবিগুলো পাকিস্তান থেকে বাঙালির মুক্তির প্রথম রাজনৈতিক দলিল।
১৯৬৯ সালে ছয় দফাকে কেন্দ্র করে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং আইয়ুব খানের পতন ঘটে। বাঙালি জাতি তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। সেই স্বপ্ন আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। ছয় দফার ভিত্তিতে ইশতেহার দিয়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশের পথে নিয়ে আসেন।
ছয় দফার মূল বিষয়গুলো ছিল:
1. সংবিধান কাঠামো: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি ফেডারেল কাঠামো ও সংসদীয় ব্যবস্থা।
2. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি কেন্দ্রের হাতে, অন্য সব ক্ষমতা রাজ্যগুলোর হাতে।
3. মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ: দুটি বিনিময়যোগ্য মুদ্রা বা একক মুদ্রা, তবে কড়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ রোধ।
4. রাজস্ব ও কর: কর আরোপের ক্ষমতা রাজ্যগুলোর হাতে, কেন্দ্র কেবল একটি অংশ পাবে।
5. বিদেশি বাণিজ্য: প্রতিটি রাজ্যের জন্য পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্য হিসাব, এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ।
6. আঞ্চলিক সেনা: রাজ্যগুলোকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্যারামিলিটারি বাহিনী গঠনের ক্ষমতা প্রদান।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের ভেতরকার শোষিত প্রদেশগুলিও বিদ্রোহে ফেটে পড়ত। তাই পাকিস্তানি ডিপ স্টেট, আইএসআই ও পিপিপি এই আশঙ্কায় ষড়যন্ত্র শুরু করে। ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা:
বঙ্গবন্ধুর তুমুল জনপ্রিয়তায় বিচলিত হয়ে পাকিস্তান সেনারা বাঙালির কণ্ঠরোধে গণহত্যায় নামে। পাকিস্তানিদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামি সেই দমননীতির অংশ হয়ে যায়। জনগণের ওপর এই রাষ্ট্রীয় যুদ্ধই বাঙালিকে অস্ত্র ধরতে বাধ্য করে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
উপসংহার:
সব বিশ্লেষণ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলেরই ফল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে আওয়ামী লীগ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা আসলে মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরোধিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
📌 মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা
✍️ Milon Syed
Editor, The AkaalBodhon