01/11/2025
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সম্প্রতি এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা শুধু বিতর্কিত নয়—বরং ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর এক গভীর ছায়া ফেলেছে। তিনি বলেছেন, “গণতন্ত্র অনেক সময় একটি দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”
এই কথাটি শুধু একটি বাক্য নয়—এটি এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিধ্বনি, যার শিকড় অনেক গভীরে।
অজিত দোভাল এমন ব্যক্তি নন, যিনি হঠাৎ করে কিছু বলেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বলে দেয়—তিনি যা উচ্চারণ করেন, তার পিছনে থাকে কোনো বাস্তব প্রস্তুতি, কোনো চলমান প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালে তামিলনাড়ুতে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ভারতের কৌশলগত স্বার্থে তালেবানদের ব্যবহার করা যেতে পারে।
দশ বছর পর, ২০২৫ সালে, আমরা দেখছি সেই কথার বাস্তবায়ন—আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের বিপরীতে ভারতের অদৃশ্য হাত, কূটনৈতিকভাবে বা গোয়েন্দা পর্যায়ে তালেবানদের প্রভাবকে কাজে লাগানোর প্রবণতা।
এই ধারাবাহিকতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, দোভালের চিন্তার গতিপথ কেমন।
তাঁর কৌশল—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে গণতন্ত্রকে ক্রমে দুর্বল করে, প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটানো।
এবং এতে তিনিই একা নন—এই নকশার পেছনে রয়েছেন মোদি ও অমিত শাহের মতো রাজনৈতিক স্থপতিরা।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষকেরা বহুবার বলেছেন—ভারত আজ কার্যত এক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের দিকে হাঁটছে।
গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্রের যে মানদণ্ড—স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, বিরোধীদলের সক্রিয়তা—সব ক্ষেত্রেই সেখানে নেমেছে ভয়ংকর অন্ধকার।
এই তিনজনের শাসন মডেলে রয়েছে সেই সব উপাদান, যা ইতিহাসে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা গেছে—
একক নেতার পূজা, জাতীয়তাবাদী হুজুগ, এবং ভয়ের রাজনীতি।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই—মোদি রেজিম ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যা কিছু করবে, তা একসময় জনআন্দোলনের জ্বালানি হয়ে উঠবে।
গণতন্ত্রকে যদি পুরোপুরি দমন করা হয়, জনগণের ক্ষোভও তত দ্রুত জমে ওঠে।
একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে।
তিনি নিজের দল ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বিরল।
দোভাল সেই সময় সরাসরি খেলে বুঝেছেন কীভাবে একটি দেশকে ক্রমে ফ্যাসিস্ট মডেলে নিয়ে যাওয়া যায়, এবং কীভাবে সেই মডেল অবশেষে নিজের পতন ডেকে আনে।
সম্ভবত বাংলাদেশের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এখন জানেন—কোন ভুলগুলো করলে একটি স্বৈরাচার ভেঙে পড়ে, আর কোন পদক্ষেপগুলো নিলে সেটি টিকে যায় দীর্ঘদিন।
তাই আজ মোদি-দোভালদের ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।
তারা এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়া মানে নিজেদের রাজনৈতিক মৃত্যু স্বীকার করা।
এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য—রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, বিরোধীদের নিস্তব্ধ করা, এবং জাতীয়তাবাদের জোয়ারে সব প্রশ্ন ডুবিয়ে দেওয়া।