24/09/2026
আমি জীবনে প্রায় দশ হাজার ছাত্রকে পিটিয়েছি। বাংলা পরীক্ষার আগে। অঙ্ক পরীক্ষার পরে। বেতের পিটানি। ডাস্টারের বাড়ি। কখনো বাঁশের কঞ্চি, কখনো কান ধরে ওঠবস। কান লাল করে নম্বর দেওয়ার আগে সোজা লাইনে দাঁড় করানো আমার পেশা ছিল। কখনো ভাবিনি, একদিন একটা পুরনো বেতের বাড়ি আমার নিজের জীবনটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগের।
তখন আমি নেত্রকোনার এক স্কুলের শিক্ষক। পিঠে বেত মারার টাইমিং আমার তৎকালীন জাতীয় দলের ফাস্ট বোলারদের চেয়েও নিখুঁত ছিল। সেবার নবম শ্রেণির ছাত্ররা ক্লাসে তুমুল হৈচৈ করছিল। আমি রাগে গজগজ করতে করতে ক্লাসে ঢুকলাম।
সবাই সোজা হয়ে বসে পড়ল, কিন্তু শেষ বেঞ্চের একটা ছেলে তখনও পেছনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঘুমাচ্ছিল।
বেশিরভাগ ছাত্র পিটুনি খেলে কান্নাকাটি করত। কেউ বলত, "স্যার, আর হবে না।" কেউ বলত, "স্যার, পেট ব্যথা।" সবই পরিচিত অজুহাত।
আমি ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পিঠে সজোরে একটা কঞ্চির বাড়ি বসালাম।
ছেলেটা উফ্ পর্যন্ত করল না। সোজা হয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমি বললাম, "পড়া পারিস না, ঘুমাচ্ছিস কেন?"
ছেলেটা বলল, "স্যার, ঘুমের ঘোরে ড্রেন পরিষ্কার করার কথা ভাবছিলাম।"
আমি একটু থেমে গেলাম। ভাবলাম, ক্লাসে ঘুমিয়ে ড্রেন পরিষ্কারের বাহানা!
রাগে গজগজ করতে করতে সেদিন তাকে আরও তিনটা বাড়তি কঞ্চির বাড়ি মারলাম।
আমার সহকর্মীরা বললেন, "স্যার, এত মারলেন? ছেলেটার তো পড়ালেখার বারোটা বেজে যাবে।"
আমি বললাম, "নয়তো ও সারা জীবন ক্লাসেই ঘুমাবে। কঞ্চির বাড়ি খেলে সোজা হয়ে যাবে।"
সেদিন প্রায় দুইশোটা পিটুনি দিয়েছিলাম। বিকেলে বাড়ি ফিরে হাত ব্যথার যন্ত্রণায় ছেলেটার কথা ভুলে গেলাম।
কয়েকদিন পর হেডস্যার আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, "আপনি নাকি সাইফুলের পিঠে বেত ভেঙেছেন? অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।"
আমি বললাম, "স্যার, শাসন না করলে ও মানুষ হবে কীভাবে?"
হেডস্যার আমার উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হলেন। বললেন, "আপনার রাগ বেশি।" এই কারণেই কি-না, মাসখানেক পর আমাকে দূরে বদলি করা হলো।
তারপর অনেক বছর কেটে গেল।
আমি অবসর নিলাম। হাত এখন আর আগের মতো বেত ধরতে পারে না। বাত ব্যাথায় কাবু। আমার ছাত্ররা দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেল। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ হয়তো এখনও পিঠের দাগ গুনে আমাকে গালি দেয়। এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষকের জীবনের পিটুনি ছাত্ররা ভুলে যায়, অথবা মনে রেখে অভিশাপ দেয়।
একদিন দুপুরে আমার বাসায় একজন যুবক এল। সুঠাম দেহ, পরনে দামি স্যুট।
সে বলল, "স্যার, আমাকে চিনেছেন?"
আমি হাত-পা কাঁপিয়ে বললাম, "তুই কি সেই বদলির বদলা নিতে এসেছিস? পুলিশ ডাকব?"
সে হাসল। "না স্যার। চিনবেন না।"
তারপর পকেট থেকে একটা এক্স-রে প্লেট বের করল।
আমার দেওয়া সেই বাইশ বছর আগের কঞ্চির বাড়ির দাগের কোনো এক্স-রে ছবি হয়তো নয়, কিন্তু কাগজটায় লেখা—"স্পাইনাল ফিটনেস ও সোজা হয়ে দাঁড়ানোর প্রমাণপত্র।"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "সাইফুল?"
সে মাথা নেড়ে বলল, "জি স্যার।"
"এত বছর পর? হাতাহাতি করতে এসেছিস?"
"আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে আসছি।"
সে ফাইল থেকে একটা ছবি বের করল। ছবিতে বিশাল এক অলিম্পিক সাইজের জিওমেট্রি ও স্পোর্টস একাডেমি। দেয়ালে বড় বড় করে লেখা—"এখানে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখানো হয়।"
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললাম, "এটা কী?"
সে বলল, "আমার ফিটনেস সেন্টার ও পিঠের বেল্ট তৈরির কারখানা।"
"তুই সোজা হওয়ার বেল্ট তৈরি করিস?"
"জি।"
আমি হেসে ফেললাম।
সে বলল, "স্যার, আপনি যদি সেদিন ঐ বেতের বাড়ি তিনটা না দিতেন!"
"তাহলে?"
"আমি সারা জীবন ক্লাসের শেষ বেঞ্চে কুঁজো হয়ে ঘুমিয়েই কাটাতাম। মেরুদণ্ড যে সোজা রাখা যায়, সেদিন আপনার বেতের বাড়ির চোটে প্রথম টের পেয়েছিলাম!"
আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।
সে বলল, "জানেন স্যার, ওই ঘটনার পর আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, পিঠ সোজা রাখতে হবে। পরে ফিজিক্যাল এডুকেশন নিয়ে পড়েছি। এখন মানুষ যেন কুঁজো হয়ে না হাঁটে, তার জন্য সঠিক পোস্টার (Posture) ধরে রাখার বেল্ট বানাই।"
বাড়ি ফেরার আগে সে আমাকে একটা ছোট ভারী প্যাকেট দিল।
বলল, "পড়ে খুলে দেখবেন।"
বাড়ি ফেরার পথে খুলে দেখি, ব্যাক-পেইন দূর করার একটা চমৎকার আধুনিক ‘পোস্টার কারেক্টর বেল্ট’। ভেতরে ছোট একটা কাগজে লেখা—
"স্যার, আপনি সেদিন আমার পিঠে বেত মেরেছিলেন বলেই আজ হাজার হাজার মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে। আমার কারখানায় কারও মেরুদণ্ড বাঁকা হতে দেওয়া হয় না। আপনার বেল্টটা পরে নিয়েন, আপনার পিঠের ব্যথা কমে যাবে।"
আমি অনেকক্ষণ কাগজটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। বাইরে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমি বেল্টটা পিঠে বেঁধে নিলাম। অদ্ভুতভাবে পিঠের ব্যথাটা যেন এক নিমেষে গায়েব হয়ে গেল!
আমি হয়তো সারা জীবন ছাত্রদের বেত মেরেছি। ভেবেছিলাম শাস্তি দিচ্ছি। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারলাম—কখনো কখনো একজন শিক্ষকের দেওয়া একটা সঠিক ‘পিটানি’, কোনো ছাত্রের বাঁকা হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎকে একদম সোজা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!