07/06/2026
গত শুক্রবারের সকালটা আজও আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। কিছু কিছু দিন থাকে— শুরুতে একদম সাধারণ মনে হয়, কিন্তু দিন শেষে অদ্ভুতভাবে মনে একটা স্থায়ী জায়গা করে নেয়। সেদিনও ঠিক তেমনই একটা দিন ছিল।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল পুরোপুরি হয়নি। বাইরে তখন হালকা আলো ফুটছিল। শহর তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। এক ধরনের শান্ত পরিবেশ চারদিকে। দূরে কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছিল, আর জানালার বাইরে তাকালে মনে হচ্ছিল শহরটা যেন ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠছে।
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে রামপুরা থেকে পাঠাও অ্যাপে একটা বাইক কল করলাম। কিছুক্ষণ পর বাইক চলে এলো। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে পড়লাম।
ভোরের ঢাকা শহরের একটা আলাদা রূপ আছে। দিনের সেই ব্যস্ত শহরটা তখন একদম অন্যরকম লাগে। ফাঁকা রাস্তা, ঠাণ্ডা বাতাস, রাস্তার পাশে দু-একটা চায়ের দোকান, কোথাও কয়েকজন মানুষ চা হাতে বসে আছে। মনে হচ্ছিল পুরো শহরটা ধীরে ধীরে নতুন একটা দিনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
বাইকটা এগিয়ে যাচ্ছিল কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে, আর আমি চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
অনেকদিন পর নিজের মাতৃভূমি সৈয়দপুর ফিরছিলাম। ভেতরে এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করছিল। নিজের জায়গায় ফেরার অনুভূতিটা সবসময়ই আলাদা।
স্টেশনে পৌঁছে প্রথমেই একটা কেক কিনলাম। সাথে একটা কোমল পানীয়ও নিলাম। কারণ ভোরে বের হয়েছিলাম, কিছু একটা খেয়ে নেওয়া দরকার ছিল।
তখন প্রায় সকাল ছয়টা।
আমার ট্রেন ছিল সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে।
স্টেশনের ভেতরে ঢুকে প্রথমে সেই বড় স্ক্রিনগুলোর দিকে তাকালাম, যেগুলোতে ট্রেনের অবস্থান আর প্ল্যাটফর্ম নম্বর দেখানো হয়। কিন্তু গিয়ে দেখি সেগুলো তখনও অন হয়নি।
তাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
অপেক্ষার সময়টা কেমন জানি অন্যরকম ছিল। মানুষজন আসছে, যাচ্ছে, কেউ বিদায় দিচ্ছে, কেউ ব্যস্ত হয়ে প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে। কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও নিজেকে একা লাগছিল।
ভোরের রেলস্টেশনগুলো খুব অদ্ভুত।
এখানে একই সাথে কারও ফিরে আসা হয়, আবার কারও বিদায়ও হয়।
কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এলো।
ট্রেন এসে গেছে।
আমিও ধীরে ধীরে ট্রেনে উঠে নিজের সিটে গিয়ে বসলাম।
জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ দেখি আমার এলাকার এক বড় ভাই ট্রেনের ভেতর দিয়ে আসছে।
আমি হাত দেখালাম।
সেও হাত নেড়ে উত্তর দিল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার— সে আমাকে চিনতে পারেনি।
পরে আমি নিজেই পরিচয় দিলাম।
তারপর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল—
"আরে! তুই?"
ছোটবেলায় দেখা হয়েছিল। অনেক বছর কেটে গেছে। কিছুক্ষণ এলাকার গল্প হলো।
সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
তারপর হঠাৎ...
কীভাবে যেন চোখ গিয়ে থামল ট্রেনের অন্য পাশের একটা সিটে।
একটা মেয়ে বসে ছিল।
প্রথমে খুব একটা খেয়াল করিনি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চোখ চলে গেল।
সে জানালার পাশে বসেছিল।
কোনো বাড়তি সাজ চোখে পড়েনি। খুব সাধারণভাবেই বসেছিল। কিন্তু তার চোখ দুটো...
অদ্ভুত মায়াবী।
ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে।
জানালার বাইরে গাছ, মাঠ, রাস্তা, ছোট ছোট স্টেশন দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছিল।
আর সে খুব মন দিয়ে সেগুলো দেখছিল।
আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই দৃশ্যটা হঠাৎ করেই আমার খুব ভালো লেগে গেল।
মনে হচ্ছিল সে শুধু বাইরের দৃশ্য দেখছে না, যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
তারপর অজান্তেই কয়েকবার তাকালাম।
তারপর আবার।
প্রথমে নিজেকে আটকেছিলাম।
কিন্তু পরে বুঝলাম, চোখ কথা শুনছে না।
বারবার তার দিকেই চলে যাচ্ছে।
এরপর কয়েকবার চোখাচোখি হয়ে গেল।
আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম।
কিন্তু মনে হচ্ছিল, সেও বুঝে ফেলেছে।
আর আশ্চর্যের বিষয়, কয়েকবার মনে হয়েছিল সে হালকা করে হাসছিল।
পুরো যাত্রা এভাবেই চলছিল।
তারপর ট্রেন পার্বতীপুরের দিকে পৌঁছাল।
সেখানে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলাম— তার পাশের সিটে একজন স্বামী-স্ত্রী বসেছিল। তাদের সাথে একটা ছোট্ট বাচ্চাও ছিল।
আমি আগে সেভাবে খেয়াল করিনি।
ট্রেন থামল।
তারা নামার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর দুজন নেমেও গেল।
আমি স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে ছিলাম।
কিন্তু তারপর হঠাৎ চোখ আটকে গেল।
বাচ্চাটা তখনও মেয়েটার কাছেই।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।
তারপর হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
মনে মনে বললাম—
"এক মিনিট... এটা কি তার বাচ্চা?"
হঠাৎ সবকিছু কেমন যেন থেমে গেল।
মাথার মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
"না... এটা কীভাবে সম্ভব?"
"আমি এতক্ষণ কী ভাবলাম!"
সত্যি বলতে, কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেমন জানি খালি খালি লাগছে।
নিজের মনেই বলছিলাম—
"আমি কি তাহলে ভুল ভাবছিলাম?"
কিন্তু ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরই এমন একটা ঘটনা ঘটল, যেটা দেখে নিজের ওপরই হাসি পেল।
মেয়েটা জানালার দিকে একটু ঝুঁকল।
তারপর বাচ্চাটাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্বামী-স্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিল।
তখন বুঝলাম— তারা নামার সময় হয়তো কিছু জিনিস সামলাচ্ছিল, তাই সাময়িকভাবে বাচ্চাটাকে তার কাছে রেখেছিল।
বিষয়টা বুঝতেই মনে মনে নিজের ওপর হাসলাম।
ভাবলাম—
"আমি এসব কী কী ভেবে ফেললাম!"
তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে গেল।
সে আবার জানালার বাইরে তাকাল।
আর আমি...
আমি আবারও অজান্তে তার দিকে তাকালাম।
তারপর একসময় সৈয়দপুর চলে এলো।
মানুষজন নামতে শুরু করল।
সেও উঠে দাঁড়াল।
আমি শেষবারের মতো তাকালাম।
তারপর মানুষের ভিড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল।
কোনো নাম জানা হলো না।
কোনো পরিচয় হলো না।
কোনো কথা হলো না।
শুধু কয়েক ঘণ্টার একটা যাত্রা শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু আজও মনে হয়—
সব যাত্রা গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয় না।
কিছু যাত্রা শেষ হওয়ার পরও মানুষের ভেতরে চলতে থাকে।
হয়তো সেই ট্রেনটা সৈয়দপুরে থেমে গিয়েছিল।
কিন্তু আমার ভেতরে সেই যাত্রাটা আজও কোথাও চলেই যাচ্ছে।
-আবু সায়েম