মনের ডায়েরি

মনের ডায়েরি কিছু কথা আছে, যা বলা যায় না— শুধু লেখা যায়।
প্রেম, স্মৃতি, বাস্তবতা আর অনুভূতির গল্পে স্বাগতম।
✍️ Abu Sayam

গত শুক্রবারের সকালটা আজও আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। কিছু কিছু দিন থাকে— শুরুতে একদম সাধারণ মনে হয়, কিন্তু দিন শেষে অদ্ভুতভ...
07/06/2026

গত শুক্রবারের সকালটা আজও আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। কিছু কিছু দিন থাকে— শুরুতে একদম সাধারণ মনে হয়, কিন্তু দিন শেষে অদ্ভুতভাবে মনে একটা স্থায়ী জায়গা করে নেয়। সেদিনও ঠিক তেমনই একটা দিন ছিল।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল পুরোপুরি হয়নি। বাইরে তখন হালকা আলো ফুটছিল। শহর তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। এক ধরনের শান্ত পরিবেশ চারদিকে। দূরে কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছিল, আর জানালার বাইরে তাকালে মনে হচ্ছিল শহরটা যেন ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠছে।

তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে রামপুরা থেকে পাঠাও অ্যাপে একটা বাইক কল করলাম। কিছুক্ষণ পর বাইক চলে এলো। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে পড়লাম।

ভোরের ঢাকা শহরের একটা আলাদা রূপ আছে। দিনের সেই ব্যস্ত শহরটা তখন একদম অন্যরকম লাগে। ফাঁকা রাস্তা, ঠাণ্ডা বাতাস, রাস্তার পাশে দু-একটা চায়ের দোকান, কোথাও কয়েকজন মানুষ চা হাতে বসে আছে। মনে হচ্ছিল পুরো শহরটা ধীরে ধীরে নতুন একটা দিনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

বাইকটা এগিয়ে যাচ্ছিল কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে, আর আমি চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

অনেকদিন পর নিজের মাতৃভূমি সৈয়দপুর ফিরছিলাম। ভেতরে এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করছিল। নিজের জায়গায় ফেরার অনুভূতিটা সবসময়ই আলাদা।

স্টেশনে পৌঁছে প্রথমেই একটা কেক কিনলাম। সাথে একটা কোমল পানীয়ও নিলাম। কারণ ভোরে বের হয়েছিলাম, কিছু একটা খেয়ে নেওয়া দরকার ছিল।

তখন প্রায় সকাল ছয়টা।

আমার ট্রেন ছিল সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে।

স্টেশনের ভেতরে ঢুকে প্রথমে সেই বড় স্ক্রিনগুলোর দিকে তাকালাম, যেগুলোতে ট্রেনের অবস্থান আর প্ল্যাটফর্ম নম্বর দেখানো হয়। কিন্তু গিয়ে দেখি সেগুলো তখনও অন হয়নি।

তাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

অপেক্ষার সময়টা কেমন জানি অন্যরকম ছিল। মানুষজন আসছে, যাচ্ছে, কেউ বিদায় দিচ্ছে, কেউ ব্যস্ত হয়ে প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে। কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও নিজেকে একা লাগছিল।

ভোরের রেলস্টেশনগুলো খুব অদ্ভুত।

এখানে একই সাথে কারও ফিরে আসা হয়, আবার কারও বিদায়ও হয়।

কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এলো।

ট্রেন এসে গেছে।

আমিও ধীরে ধীরে ট্রেনে উঠে নিজের সিটে গিয়ে বসলাম।

জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ দেখি আমার এলাকার এক বড় ভাই ট্রেনের ভেতর দিয়ে আসছে।

আমি হাত দেখালাম।

সেও হাত নেড়ে উত্তর দিল।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার— সে আমাকে চিনতে পারেনি।

পরে আমি নিজেই পরিচয় দিলাম।

তারপর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল—

"আরে! তুই?"

ছোটবেলায় দেখা হয়েছিল। অনেক বছর কেটে গেছে। কিছুক্ষণ এলাকার গল্প হলো।

সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।

তারপর হঠাৎ...

কীভাবে যেন চোখ গিয়ে থামল ট্রেনের অন্য পাশের একটা সিটে।

একটা মেয়ে বসে ছিল।

প্রথমে খুব একটা খেয়াল করিনি।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চোখ চলে গেল।

সে জানালার পাশে বসেছিল।

কোনো বাড়তি সাজ চোখে পড়েনি। খুব সাধারণভাবেই বসেছিল। কিন্তু তার চোখ দুটো...

অদ্ভুত মায়াবী।

ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে।

জানালার বাইরে গাছ, মাঠ, রাস্তা, ছোট ছোট স্টেশন দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছিল।

আর সে খুব মন দিয়ে সেগুলো দেখছিল।

আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই দৃশ্যটা হঠাৎ করেই আমার খুব ভালো লেগে গেল।

মনে হচ্ছিল সে শুধু বাইরের দৃশ্য দেখছে না, যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

তারপর অজান্তেই কয়েকবার তাকালাম।

তারপর আবার।

প্রথমে নিজেকে আটকেছিলাম।

কিন্তু পরে বুঝলাম, চোখ কথা শুনছে না।

বারবার তার দিকেই চলে যাচ্ছে।

এরপর কয়েকবার চোখাচোখি হয়ে গেল।

আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম।

কিন্তু মনে হচ্ছিল, সেও বুঝে ফেলেছে।

আর আশ্চর্যের বিষয়, কয়েকবার মনে হয়েছিল সে হালকা করে হাসছিল।

পুরো যাত্রা এভাবেই চলছিল।

তারপর ট্রেন পার্বতীপুরের দিকে পৌঁছাল।

সেখানে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলাম— তার পাশের সিটে একজন স্বামী-স্ত্রী বসেছিল। তাদের সাথে একটা ছোট্ট বাচ্চাও ছিল।

আমি আগে সেভাবে খেয়াল করিনি।

ট্রেন থামল।

তারা নামার প্রস্তুতি নিতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর দুজন নেমেও গেল।

আমি স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে ছিলাম।

কিন্তু তারপর হঠাৎ চোখ আটকে গেল।

বাচ্চাটা তখনও মেয়েটার কাছেই।

আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।

তারপর হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।

মনে মনে বললাম—

"এক মিনিট... এটা কি তার বাচ্চা?"

হঠাৎ সবকিছু কেমন যেন থেমে গেল।

মাথার মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি।

"না... এটা কীভাবে সম্ভব?"

"আমি এতক্ষণ কী ভাবলাম!"

সত্যি বলতে, কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেমন জানি খালি খালি লাগছে।

নিজের মনেই বলছিলাম—

"আমি কি তাহলে ভুল ভাবছিলাম?"

কিন্তু ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরই এমন একটা ঘটনা ঘটল, যেটা দেখে নিজের ওপরই হাসি পেল।

মেয়েটা জানালার দিকে একটু ঝুঁকল।

তারপর বাচ্চাটাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্বামী-স্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিল।

তখন বুঝলাম— তারা নামার সময় হয়তো কিছু জিনিস সামলাচ্ছিল, তাই সাময়িকভাবে বাচ্চাটাকে তার কাছে রেখেছিল।

বিষয়টা বুঝতেই মনে মনে নিজের ওপর হাসলাম।

ভাবলাম—

"আমি এসব কী কী ভেবে ফেললাম!"

তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে গেল।

সে আবার জানালার বাইরে তাকাল।

আর আমি...

আমি আবারও অজান্তে তার দিকে তাকালাম।

তারপর একসময় সৈয়দপুর চলে এলো।

মানুষজন নামতে শুরু করল।

সেও উঠে দাঁড়াল।

আমি শেষবারের মতো তাকালাম।

তারপর মানুষের ভিড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল।

কোনো নাম জানা হলো না।

কোনো পরিচয় হলো না।

কোনো কথা হলো না।

শুধু কয়েক ঘণ্টার একটা যাত্রা শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু আজও মনে হয়—

সব যাত্রা গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয় না।

কিছু যাত্রা শেষ হওয়ার পরও মানুষের ভেতরে চলতে থাকে।

হয়তো সেই ট্রেনটা সৈয়দপুরে থেমে গিয়েছিল।

কিন্তু আমার ভেতরে সেই যাত্রাটা আজও কোথাও চলেই যাচ্ছে।

-আবু সায়েম

29/05/2026

জীবনে কত রকম মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
কত শত মুখ, কত ভিন্ন স্বভাব, কত বিচিত্র অনুভূতির মানুষের সঙ্গে পথ মিশেছে। কেউ এসেছিল প্রবল শব্দে, কেউ নিঃশব্দে। কেউ খুব অল্প সময়েই আপন হয়ে গিয়েছিল, আবার কেউ বহুদিন পাশে থেকেও কখনো পুরোপুরি আপন হয়ে উঠতে পারেনি। সময়ের স্রোতে কত মানুষ ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে— আজ তাদের অনেকের চেহারাও আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস; কিছু মানুষকে সে হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী করে রাখে, আর কিছু মানুষকে সময়ের ধুলোর নিচে আস্তে আস্তে চাপা দিয়ে দেয়।

একসময় মানুষের বদলে যাওয়া আমাকে বিস্মিত করত। ভাবতাম, যে মানুষটা প্রতিদিন খোঁজ নিত, হঠাৎ সে কীভাবে এত অপরিচিত হয়ে যায়! যে মানুষটার সঙ্গে রাতভর গল্প হতো, সে কীভাবে একদিন সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যেতে পারে! তখন বিচ্ছেদকে মেনে নিতে খুব কষ্ট হতো। মনে হতো, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো অপূর্ণতা ছিল, কোনো ভুল ছিল, কোনো অদৃশ্য ত্রুটি ছিল সম্পর্কের ভেতরে। কিন্তু সময় ধীরে ধীরে আমাকে বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে সত্য পাঠটি শিখিয়েছে— পৃথিবীতে অধিকাংশ সম্পর্কই ক্ষণস্থায়ী। মানুষ আসে, কিছু সময় পাশে থাকে, কিছু অনুভূতি রেখে যায়, তারপর একসময় নিজস্ব গন্তব্যের দিকে চলে যায়।

এখন আর কাউকে হারিয়ে ফেললে হৃদয়ের ভেতর সেই পুরোনো তীব্র আলোড়ন তৈরি হয় না। কারণ আমি বুঝে গেছি, মানুষের সঙ্গে মানুষের পথচলা আসলে পূর্বনির্ধারিত দূরত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যার সঙ্গে আমার যতটুকু পথযাত্রা নির্ধারিত, সে ঠিক ততটুকুই আমার পাশে হাঁটবে। এর বেশি না, এর কমও না। মাঝপথে কেউ যদি অন্য কোনো মোড়ে হারিয়ে যায়, আমি আর তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ প্রয়াস করি না। কারণ মানুষ চিরকাল তার আকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়ের দিকেই ধাবিত হয়। হৃদয় যেখানে শান্তি খুঁজে পায়, মানুষ শেষ পর্যন্ত সেখানেই ফিরে যায়।

কে চলে গেল, কেন চলে গেল— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার অভ্যাসটাও এখন আর নেই। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না, আর কিছু উত্তর জেনে ফেললেও জীবনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। বরং মানুষ নিজের ভেতরেই আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই এখন আমি সহজভাবে মেনে নিতে শিখেছি— আমার সঙ্গে তার এতটুকুই পথচলা ছিল। হয়তো আমাদের গল্পের পরিসমাপ্তি এখানেই লেখা ছিল। হয়তো কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধুমাত্র অনুভূতির গভীরতা বাড়ানোর জন্য, স্থায়ী হওয়ার জন্য নয়।

মানুষের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো— সে কখনো স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অনুভূতি বদলায়, প্রয়োজন বদলায়, অগ্রাধিকার বদলায়। যে মানুষটা একসময় তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারত না, একদিন সে-ই তোমাকে ছাড়াই নিজের পৃথিবী সাজিয়ে নেয়। আর এই পরিবর্তনটাই পৃথিবীর চিরন্তন বাস্তবতা। তাই এখন আর কাউকে ধরে রাখার জন্য হৃদয়ের সমস্ত শক্তি ব্যয় করতে ইচ্ছে হয় না। কারণ জোর করে ধরে রাখা সম্পর্ক কখনো প্রশান্তি দেয় না; বরং ধীরে ধীরে আত্মাকে ক্লান্ত করে তোলে।

এখন আমি শুধু এটুকুই বিশ্বাস করি— প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো যাত্রাপথের সহযাত্রী। কেউ কয়েকটা ঋতু পাশে থাকে, কেউ কয়েকটা বছর, আবার কেউ হয়তো খুব অল্প কিছু মুহূর্তের জন্য আসে। কিন্তু সেই অল্প সময়টুকুতেও তারা মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব রেখে যায়। কেউ ভালোবাসা শিখিয়ে যায়, কেউ অপেক্ষা শিখিয়ে যায়, কেউ নিঃসঙ্গতার অর্থ বুঝিয়ে দেয়, আবার কেউ নীরবে শিখিয়ে দেয়— সব মানুষ শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়ার জন্য আসে না।

সবাই একসময় নিজের নির্ধারিত গন্তব্য খুঁজে নেয়। কেউ কারও জীবনের চূড়ান্ত ঠিকানা হয়ে ওঠে না। কেউ স্মৃতি হয়ে থাকে, কেউ অভ্যাস হয়ে থাকে, কেউ অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে যায়। আমিও হয়তো কারও জীবনে ক্ষণিকের একটি অধ্যায় মাত্র। কারও অবসর বিকেলের স্মৃতিচারণে হয়তো একদিন আমার কথা মনে পড়বে, তারপর আবার সময়ের ভিড়ে সেটাও হারিয়ে যাবে।

আমিই যে কারও শেষ গন্তব্য হবো— এমন অহংকার এখন আর হৃদয়ে জন্মায় না। কারণ জীবন কাউকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় না। জীবন শুধু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য একত্র করে, তারপর আবার ভিন্ন ভিন্ন পথে ছড়িয়ে দেয়। আর মানুষ, সমস্ত স্মৃতি, মায়া, অভিমান ও অপূর্ণতাকে সঙ্গে নিয়েই নীরবে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।

-আবু সায়েম

"শেষ বিকেলের দেখা"শহরের বিকেলগুলো অদ্ভুত হয়।বিশেষ করে সেই বিকেলগুলো, যেগুলোর ভেতরে পুরোনো কোনো মানুষের স্মৃতি মিশে থাকে।...
28/05/2026

"শেষ বিকেলের দেখা"
শহরের বিকেলগুলো অদ্ভুত হয়।
বিশেষ করে সেই বিকেলগুলো, যেগুলোর ভেতরে পুরোনো কোনো মানুষের স্মৃতি মিশে থাকে।

সেদিনও বিকেলটা ঠিক তেমনই ছিল।
আকাশে সূর্যের আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি, আবার সন্ধ্যাও নামেনি। চারপাশে হালকা ধূসর এক আবহ। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, মানুষের ভিড়, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চায়ের কাপ থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়া— সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। শুধু আমার ভেতরটাই অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল।

কারণ অনেক বছর পর আমি তোমাকে আবার দেখেছিলাম।

সবকিছু খুব হঠাৎ হয়েছিল।
আমি তখন রাস্তার পাশের সেই পুরোনো বইয়ের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জায়গাটা এখনো আগের মতোই আছে। পুরোনো বইয়ের গন্ধ, ভাঙা ফুটপাত, পাশে ছোট্ট চায়ের দোকান, আর সন্ধ্যা নামার আগের সেই চেনা ব্যস্ততা।

আমি হয়তো সাধারণ আরেকটা দিনের মতোই হাঁটছিলাম। মাথায় ছিল হাজারটা চিন্তা। জীবন, কাজ, দায়িত্ব, ক্লান্তি— সবকিছু মিলিয়ে মানুষ যখন ভেতর থেকে ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যায়, তখন সে আসলে বেঁচে থাকলেও পুরোপুরি জীবিত থাকে না।

ঠিক তখনই দূরে তোমাকে দেখলাম।

প্রথমে চিনতে পারিনি।
মানুষ বদলে যায়। সময় মানুষের মুখের চেয়ে বেশি বদলে দেয় তার চোখের ভাষা। তবুও কিছু মানুষকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়। তাদের হাঁটার ভঙ্গি, চুপ করে থাকার ধরন, কিংবা আশেপাশের বাতাসে ভেসে থাকা পরিচিত অনুভূতি বলে দেয়— “এই মানুষটার সাথেই একসময় তোমার পুরো একটা পৃথিবী জড়িয়ে ছিল।”

তুমি রাস্তার ওপাশ দিয়ে ধীরে হাঁটছিলে।
চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই। মুখে শান্ত একটা ক্লান্তি। মনে হচ্ছিল জীবন তোমাকেও অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।

আমি জানি না কেন, কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
যেন বহু বছর আগের চাপা পড়ে থাকা একটা দরজা হঠাৎ খুলে গেছে।

কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।
সময় তাদের থেকে দূরে নিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয় থেকে সরাতে পারে না।

তুমি আমাকে দেখেছিলে কি না প্রথমে বুঝতে পারিনি।
তারপর হঠাৎ তোমার চোখ আমার দিকে থেমে গেল।

সেই কয়েক সেকেন্ড— আজও আমি ভাষায় বোঝাতে পারি না।

দুইজন মানুষ।
একসময় যারা প্রতিদিন কথা না বলে থাকতে পারতো না, তারা বহু বছর পর দাঁড়িয়ে আছে একে অপরের সামনে— অথচ কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।

তুমি ছোট্ট করে হেসেছিলে।
ভদ্রতার হাসি।
অথচ আমি খুব ভালো করেই জানতাম, এই হাসির আড়ালে মানুষ কত কিছু লুকিয়ে রাখে।

আমি বলতে চেয়েছিলাম,
“তুমি কেমন আছো?”
কিন্তু গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।

কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো সময় পেরিয়ে গেলে আর সহজে প্রকাশ করা যায় না। মানুষ তখন নিজের আবেগগুলো বুকের ভেতরেই আটকে রাখতে শিখে যায়।

তুমি নিজেই নরম গলায় বলেছিলে,
“অনেকদিন পর…”

আমি মাথা নেড়েছিলাম শুধু।
কারণ আমি ভয় পাচ্ছিলাম— একটা শব্দ বললেই হয়তো ভেতরের সবকিছু ভেঙে পড়বে।

জানো, মানুষ যখন কাউকে সত্যি ভালোবাসে, তখন বিচ্ছেদের পরও তার অভ্যাসগুলো সহজে বদলায় না।

তুমি চলে যাওয়ার পরও আমি অনেকদিন তোমার মতো কাউকে খুঁজেছি।
বাসে, ট্রেনে, ভিড়ের মধ্যে, হঠাৎ দেখা হওয়া অচেনা মুখের ভেতরে।

রাতে ঘুম আসতো না।
পুরোনো মেসেজগুলো পড়তাম।
তোমার পাঠানো ছোট ছোট কথাগুলোও তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস মনে হতো।

অনেকবার ইচ্ছে হয়েছিল লিখি—
“একবার কথা বলবে?”

কিন্তু আত্মসম্মান আর অভিমান মিলে মানুষকে অদ্ভুতভাবে চুপ করিয়ে দেয়।

তুমি হয়তো বুঝতেও পারোনি, তোমার অনুপস্থিতি আমাকে কতটা বদলে দিয়েছিল।

আগে আমি খুব সহজে হাসতাম।
ছোট ছোট বিষয়েও আনন্দ পেতাম।
কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ধীরে ধীরে নীরব মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম।

মানুষের ভেতরে কিছু ভাঙন থাকে, যেগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না।
শুধু রাতের নির্জনতায় বোঝা যায়— কেউ একজন এখনো কারও স্মৃতির ভেতরে আটকে আছে।

তুমি সেদিন বলেছিলে,
“সময় অনেক বদলে দিয়েছে, তাই না?”

আমি বাইরে থেকে হেসেছিলাম।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কথাই ঘুরছিল—

“সময় শুধু তোমাকে দূরে নিয়েছে।
ভালোবাসা আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।”

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি তোমাকে কখনো ঘৃণা করতে পারিনি।

চেষ্টা করেছি।
অনেকবার ভেবেছি তোমাকে ভুলে যাবো।
নিজেকে বুঝিয়েছি— “সব শেষ।”

কিন্তু কিছু সম্পর্ক শেষ হলেও অনুভূতিগুলো শেষ হয় না।
তারা নীরবে মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে।

আমি এখনো মাঝে মাঝে সেই দিনগুলোর কথা ভাবি।

বৃষ্টির দিনে তোমার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া।
রাগ করে কথা না বললেও রাতে ঠিকই “খেয়েছো?” বলে মেসেজ দেওয়া।
রাস্তা পার হওয়ার সময় অজান্তেই আমার হাতটা শক্ত করে ধরা।

তখন এসব খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
এখন বুঝি— মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো আসলে খুব সাধারণ সময়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।

তুমি হয়তো এখন অন্য এক জীবনে অভ্যস্ত।
নতুন মানুষ, নতুন ব্যস্ততা, নতুন গল্প।

হয়তো সেখানে আমার কোনো জায়গা নেই।

তবুও সত্যিটা হলো—
কিছু মানুষকে আমরা কখনো হারাই না, শুধু তাদের ছাড়া বাঁচতে শিখে যাই।

সেদিন আমাদের কথোপকথন খুব ছোট ছিল।
কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন।
“কেমন আছো?”
“কি করছো এখন?”
“বাসার সবাই ভালো?”

অথচ এই সাধারণ কথাগুলোর মাঝেও হাজারটা না-বলা অনুভূতি আটকে ছিল।

আমি খুব করে চাইছিলাম তোমাকে একটা কথা বলতে—

“তুমি চলে যাওয়ার পরও আমি অনেকদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।”

কিন্তু বলা হয়নি।

কারণ কিছু কথা দেরি হয়ে গেলে আর বলার অধিকার থাকে না।

একসময় সন্ধ্যা নেমে এলো।
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠলো।
শহর আরও ব্যস্ত হয়ে উঠলো।

তুমি ধীরে বলেছিলে,
“আচ্ছা… আমি যাই।”

আমি শুধু মাথা নেড়েছিলাম।

তারপর তুমি চলে গেলে।
আবার আগের মতোই দূরে।

আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তোমার চলে যাওয়া।
হাজার মানুষের ভিড়ে ধীরে ধীরে তোমার মুখটা হারিয়ে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই আমি বুঝেছিলাম—

জীবনের সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো কারও চলে যাওয়া না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—
একসময় যে মানুষটার সাথে পুরো পৃথিবী ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করতো, একসময় তার সাথেই দেখা হলে “ভালো থেকো” ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না।

সেদিন বাসায় ফিরে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসেনি।

জানালার পাশে বসে শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—

“কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না,
তবুও তাদের জন্য হৃদয়ের দরজাটা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।”

- আবু সায়েম

#শেষ_বিকেলের_দেখা
#আবু_সায়েম
#অসমাপ্ত_ভালোবাসা
#নীরব_গল্প
#ভালোবাসার_গল্প
#বিকেলের_অনুভূতি
#হারিয়ে_যাওয়া
#স্মৃতির_শহর
#বাংলা_লেখা
#বাংলা_গল্প
#মনখারাপের_গল্প
#অপূর্ণ_ভালোবাসা







27/05/2026
 #অবহেলার_ছায়ায় তুমি থেকে গেলে ভালোবাসার আলোয়, আর আমি রয়ে গেলাম তোমার অবহেলার ছায়ায়।শুরুর দিকে কখনো ভাবিনি গল্পটা এমন হব...
27/05/2026

#অবহেলার_ছায়ায় তুমি থেকে গেলে ভালোবাসার আলোয়, আর আমি রয়ে গেলাম তোমার অবহেলার ছায়ায়।

শুরুর দিকে কখনো ভাবিনি গল্পটা এমন হবে। মানুষ যখন প্রথম কারও প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সে ভবিষ্যৎ দেখে না— সে শুধু মানুষটাকে দেখে। আমিও ঠিক তেমনই ছিলাম। তোমাকে দেখে কখনো মনে হয়নি তোমাকে পেতেই হবে, শুধু মনে হয়েছিল— এই মানুষটা থাকুক। দূরে থাকলেও থাকুক, কথা কম হলেও থাকুক, কিন্তু থাকুক।

শুরুর দিনগুলো খুব সাধারণ ছিল। মাঝে মাঝে কথা হতো। খুব বেশি না, খুব কমও না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তোমার ছোট ছোট কথাগুলো আমার পুরো দিন বদলে দিত। তুমি হয়তো এক মিনিট কথা বলতে, আর আমি সেই এক মিনিট নিয়ে সারাদিন ভাবতাম। তুমি হয়তো সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করতে— “খেয়েছো?” আর আমি সেই প্রশ্নের মধ্যেও যত্ন খুঁজে নিতাম।

ভুলটা সেখানেই হয়েছিল।

মানুষ যখন কাউকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন সে ছোট ছোট বিষয়েও বড় অনুভূতি খুঁজতে শুরু করে। আমি ভেবেছিলাম— হয়তো আমার মতো তুমিও একটু অনুভব করো। হয়তো তুমিও আমার মেসেজ দেখলে হাসো। হয়তো আমায় না দেখলে একটু হলেও খোঁজ করো।

কিন্তু “হয়তো” শব্দটা খুব নিষ্ঠুর।

কারণ একসময় বুঝলাম, আমি যে অনুভূতিগুলোকে ভালোবাসা ভাবছিলাম, সেগুলো হয়তো শুধু আমার দিকেই ছিল। তোমার কাছে আমি ছিলাম পরিচিত একজন মানুষ। আর আমার কাছে তুমি ছিলে পুরো একটা পৃথিবী।

তারপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করলে তুমি।

আগে যেখানে কথা না হলে তুমি লিখতে— “কোথায় হারিয়ে গেলে?” পরে সেখানে দিনের পর দিন কোনো খবর থাকত না। আগে অপেক্ষা ছিল, পরে ব্যস্ততা হয়ে গেল। আগে আমি তোমার সময়ের অংশ ছিলাম, পরে বিরক্তির কারণ হয়ে গেলাম।

একসময় মানুষ সব বুঝে যায়, শুধু মেনে নিতে পারে না।

আমিও বুঝতাম। মেসেজ দিলে দেরিতে উত্তর আসত— তবুও অপেক্ষা করতাম। কথা ছোট হয়ে গিয়েছিল— তবুও ধরে রাখতে চাইতাম। কারণ মানুষ যার প্রতি সত্যি দুর্বল হয়ে যায়, তাকে হারানোর ভয়েই সবচেয়ে বেশি নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

তারপর একদিন বুঝলাম— আমি শুধু একা চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আর ভালোবাসা কখনো একা একজনের চেষ্টায় টিকে থাকে না।

তুমি হলে ভালোবাসা— পূর্ণ, সুন্দর, কারও জীবনের সুখ।
আর আমি হয়ে গেলাম বিষাদ বৃক্ষ— বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, ভেতরে প্রতিদিন শুকিয়ে যাওয়া।

তুমি কখনো জানতেই পারোনি, তোমাকে না পাওয়ার আক্ষেপে আমি কতবার মরেছি। মানুষ ভাবে মৃত্যু একদিন আসে। কিন্তু সত্যি বলতে, কিছু কষ্ট মানুষকে একবারে মারে না। প্রতিদিন একটু একটু করে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।

আজও তোমার নাম দেখলে বুকের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা কাজ করে। আজও মনে হয়— খুব কি ক্ষতি হয়ে যেত, যদি একদিন তুমি একটু থেকে যেতে?

কিন্তু এখন একটা জিনিস শিখেছি— সব মানুষ জীবনে থাকার জন্য আসে না। কেউ কেউ আসে শুধু শেখাতে— অতিরিক্ত ভালোবাসলে মানুষ একসময় নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলে।

#অবহেলার_ছায়ায়
#অসমাপ্ত_ভালোবাসা
#বিষাদ_বৃক্ষ
#একতরফা_ভালোবাসা
#হারিয়ে_ফেলা_মানুষ
#নীরবতার_গল্প
#ভাঙা_অনুভূতি
#তুমি_থেকে_গেলে





Address

Saidpur
Nilphamari

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when মনের ডায়েরি posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share