11/07/2026
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বাংলাদেশের এক অনন্য ইতিহাস: ভুটানি তরুণীর নাক পুনর্গঠন করে নতুন জীবন দিল বার্ন ইনস্টিটিউট
সাল ২০২৩, ১৪ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক সোনালী অক্ষরের মাইলফলক স্পর্শ করার দিন। প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশী নাগরিক অন্য কোনো উন্নত দেশ ছেড়ে, বাংলাদেশ সরকারের ‘মেডিকেল ভিসা’ নিয়ে এ দেশে আসেন চিকিৎসার এক বুক আশা নিয়ে। তিনি ২৩ বছর বয়সী ভুটানি তরুণী কারমা দেমা; পেশায় একজন কলেজছাত্রী।
যেখানে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা কেন্দ্রও হাত তুলে নিয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের হাত ধরে এক নতুন জীবন আর ফিরে পাওয়া হাসিমুখে নিজ দেশে ফিরে গেছেন কারমা।
গল্পের শুরুটা ছিল বেশ বেদনাদায়ক। নাক গহ্বরের (Nasal Cavity) ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কারমা দেমা প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন ভারতের অত্যন্ত সুপরিচিত ও বিশ্বমানের ক্যানসার হাসপাতাল ‘টাটা মেমোরিয়াল’-এ। চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কারমা ক্যানসারমুক্ত তো হলেন, কিন্তু এর পরপরই তার জীবনে নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়।
ক্যানসার চিকিৎসার জন্য দেওয়া রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কারমার নাকের ভেতরে পচন (Necrosis) ধরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তার পুরো নাকটিই সম্পূর্ণ নষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায়। একটি তরুণী মেয়ের কাছে এই বিকৃতি ছিল ক্যানসারের চেয়েও বড় মানসিক ট্রমা।
বিশ্বখ্যাত হাসপাতালের ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের ওপর ভরসা
কারমার হারানো নাক ফিরিয়ে দিতে ভারতে দুই দুইবার জটিল অস্ত্রোপচার বা রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, টাটা মেমোরিয়ালের মতো বড় হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরাও দুই দফাই এই নাক পুনর্গঠনে ব্যর্থ হন। কারমা এবং তার পরিবারের সব আশা যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই তারা জানতে পারেন বাংলাদেশের প্লাস্টিক সার্জনদের দক্ষতার কথা।
সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, ভারতের উন্নত চিকিৎসা ছেড়ে কারমা দেমা ছুটে আসেন বাংলাদেশে। ভর্তি হন ঢাকার ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’-এ।
আট ঘণ্টার সেই অবিশ্বাস্য যুদ্ধ
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সামনে এটি ছিল এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সুনামের প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল এর সাথে। ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল কারমার অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
অতঃপর শুরু হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। টানা আট ঘণ্টার এক অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল ‘মাইক্রোসার্জারি’ (Microsurgery)। চিকিৎসকেরা কারমার শরীরের অন্য অংশ থেকে টিস্যু, চামড়া ও রক্তনালী নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার নাকের অবয়ব ও কার্যক্ষমতা পুনর্গঠন করেন। প্রতিটা মুহূর্ত ছিল টানটান উত্তেজনার। কিন্তু আমাদের সার্জনদের দক্ষ হাতের জাদুতে সফল হয় সেই অসম্ভব মিশন।
অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পর আইসিইউ এবং কেবিনে বেশ কিছুদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় কারমাকে। চিকিৎসকদের পরম যত্ন আর ভালোবাসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। আয়নায় নিজের নতুন নাক দেখে কারমার চোখের কোণে যে আনন্দের জল নেমেছিল, তা ছিল বাংলাদেশের পুরো চিকিৎসা খাতের জন্য এক পরম পাওয়া।
অবশেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে, মুখে আত্মবিশ্বাসের চওড়া হাসি নিয়ে নিজ দেশ ভুটানে ফিরে গেছেন কারমা দেমা। এই সফল অস্ত্রোপচার শুধু কারমা দেমাকে একটি নতুন জীবনই দেয়নি, বরং বিশ্বদরবারে প্রমাণ করেছে—জটিল ও আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারিতে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা এখন বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশের সমকক্ষ। চিকিৎসা পর্যটনে (Medical Tourism) বাংলাদেশের এই এক নতুন দিগন্তের সূচনা।
© Dr-Sadeed Hossain.