11/08/2026
পৃথিবী, তোমার বিরুদ্ধে যে মামলা
~ মহী-রুহ
আজ ভোরে পৃথিবীকে আদালতে তুলেছি।
বিচারক নেই।
আইনজীবী নেই।
শুধু সাক্ষী হিসেবে বসে আছে
একটা পোড়া জানালা,
এক জোড়া শিশুর জুতো,
আর মায়ের হাতে জমে থাকা
একটি নাম—
যে নামটি এখন আর কেউ ডাকে না।
অভিযোগ?
রাষ্ট্রের নামে মানুষ হত্যা।
শান্তির নামে আগুন।
নিরাপত্তার নামে ঘুম কেড়ে নেওয়া।
স্বাধীনতার নামে
অন্যের আকাশে তালা ঝোলানো।
আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ—
মৃত মানুষদের
সংখ্যায় নামিয়ে আনা।
কেউ বলল—
“তিনশো হতাহত।”
আমি দেখলাম
তিনশোটি পৃথিবী।
কারও পৃথিবীতে
একজন বাবা ছিল।
কারও পৃথিবীতে
একটি মেয়ে সন্ধ্যায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত।
কারও পৃথিবীতে
বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন
একই চেয়ারে বসে
সূর্যের দিকে তাকাতেন।
সংবাদে তারা সংখ্যা।
মায়ের কাছে
একটি অসমাপ্ত বাক্য।
তোমরা কী অদ্ভুত!
তোমরা বোমারও নাম রেখেছ—
স্মার্ট।
যেন বোমারও
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে।
তোমরা হত্যাকেও
প্রযুক্তি বলো।
ধ্বংসকে বলো
অপারেশন।
ভস্মকে বলো
সাফল্য।
আর যে শিশুটি
ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে
তার মাকে খুঁজছে—
তার চোখকে বলো
“পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া”।
আমি এই ভাষার বিরুদ্ধে।
এই অভিধান পুড়িয়ে ফেলতে চাই।
কারণ যে ভাষায়
মৃত্যু সুন্দর শোনায়,
সেই ভাষা
মানুষের জন্য বিপজ্জনক।
তোমরা পর্দায় যুদ্ধ দেখাও।
একটি মানচিত্র খুলে
লাল দাগ টানো—
এখানে আঘাত,
ওখানে পাল্টা আঘাত,
এখানে অগ্রগতি,
ওখানে নিয়ন্ত্রণ।
ক্যামেরা একটু নিচে নামাও।
আরও নিচে।
আরও—
দেখবে,
লাল দাগগুলো আসলে
মানুষের শিরা।
যে শহরটাকে তুমি
“কৌশলগত অবস্থান” বলছ,
সেখানে একটি মেয়ে
তার পুতুলটাকে এখনো
বুকের কাছে ধরে আছে।
সে জানে না
“কৌশলগত” মানে কী।
সে শুধু জানে—
তার ঘরের ছাদ
আজ আকাশ হয়ে গেছে।
হে ক্ষমতার মালিকেরা,
তোমাদের ঘরে কি
রাত নামে না?
তোমাদের জানালায় কি
সাইরেনের আলো পড়ে না?
তোমাদের সন্তানরা কি
কখনো আঁতকে উঠে
জিজ্ঞেস করে না—
“বাবা, ওটা কী?”
নাকি তোমরা
সন্তানদের জন্য
একটা আলাদা পৃথিবী বানিয়ে রেখেছ?
যেখানে যুদ্ধ
টেলিভিশনের ভিতরে,
মৃত্যু
সংবাদপত্রের পাতায়,
আর মানুষ
শুধু ভোটের দিন
হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে?
আমি দেখেছি—
একজন নেতা
মৃত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে
বক্তৃতা করছেন।
তার মুখে দুঃখের
সুন্দর অনুশীলন।
চোখে ক্যামেরার জন্য
ঠিক যতটুকু জল প্রয়োজন।
পেছনে পতাকা।
সামনে কফিন।
আর কফিনের ভিতরে
এমন একজন মানুষ
যে হয়তো কোনোদিন
রাজনীতি বুঝতেই পারেনি।
সে শুধু
বেঁচে থাকতে চেয়েছিল।
এই অপরাধের শাস্তি
কে দিল তাকে?
আমি আজ
কোনো দেশের পতাকা নামাতে চাই না।
আমি চাই
পতাকার নিচে দাঁড়ানো মানুষটি
একবার মাথা তুলুক।
দেখুক—
আকাশের কোনো সীমান্ত নেই।
বৃষ্টি কোনো পাসপোর্ট চায় না।
বাতাস ভিসা নেয় না।
সূর্য উঠলে
সে শত্রুর বাড়িতেও আলো দেয়।
নদী জানে না
কোন পাড়ে কোন সরকার।
শুধু মানুষই
মানুষের মাঝে
দেয়াল তুলতে এত ব্যস্ত।
ইটের দেয়াল।
কাঁটাতারের দেয়াল।
ধর্মের দেয়াল।
জাতির দেয়াল।
ভয়ের দেয়াল।
তারপর একদিন
সেই দেয়ালের ওপার থেকে
একটা কান্না আসে—
আর আমরা বলি,
“ওরা।”
কী ভয়ংকর শব্দ—
ওরা।
এই একটি শব্দের ভিতর
কত হত্যার বীজ!
মানুষকে প্রথমে
“ওরা” বানাও,
তারপর তাকে মেরে ফেলো।
মৃত্যু তখন
আর নিজের কাছে
অপরাধ মনে হয় না।
আমি সেই “ওরা”-র বিরুদ্ধে।
আমি বলি—
ওরও ক্ষুধা আছে।
ওরও ঘুম আসে।
ওরও মা আছে।
ওরও ভয় লাগে।
ওরও এমন একজন মানুষ আছে
যার ফোন না ধরলে
বুক ধড়ফড় করে।
তাহলে বলো—
শত্রু কোথায়?
মানুষের শরীরে?
নাকি আমাদের মাথার ভিতরে?
আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র
কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নয়।
একজন মানুষকে
আরেকজন মানুষের মৃত্যুতে
অভ্যস্ত করে ফেলা।
আজ সবচেয়ে বড় বোমা
আকাশে উড়ে না।
তা বিস্ফোরিত হয়
আমাদের বিবেকে।
প্রথম দিন
একজন মরলে
আমরা কেঁপেছিলাম।
দশজন মরলে
চুপ করেছিলাম।
হাজারজন মরলে
সংবাদ বদলে দিয়েছি।
লক্ষ মানুষ ঘর হারালে
স্ক্রল করেছি।
তারপর
নিজের রাতের খাবার খেয়েছি।
এই যে অভ্যাস—
এটাই সভ্যতার
সবচেয়ে নোংরা রোগ।
তাই আজ
আমি যুদ্ধের বিরুদ্ধে
শুধু কবিতা লিখছি না।
আমি আমাদের সেই
অভ্যস্ত চোখের বিরুদ্ধে লিখছি
যে চোখ
অন্যের কবর দেখে
নিজের ঘড়ির সময় দেখে।
আমি সেই আঙুলের বিরুদ্ধে
যে আঙুল
মৃত শিশুর ছবি দেখে
স্ক্রিন সরিয়ে দেয়।
আমি সেই মুখের বিরুদ্ধে
যে মুখ বলে—
“এসব তো দূরের ব্যাপার।”
দূর?
মৃত্যুর কি দূরত্ব আছে?
আজ যে আগুন
একটি শহর খাচ্ছে,
কাল তার ধোঁয়া
তোমার জানালায় আসতে পারে।
আর না এলেও—
মানুষ হিসেবে
তোমার ঘর পুড়েছে
আগেই।
আমি চাই
পৃথিবীর সব রাষ্ট্রপ্রধানকে
একদিনের জন্য
কোনো প্রাসাদে নয়,
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরে
ঘুমাতে দেওয়া হোক।
বিছানা ছাড়া।
প্রহরা ছাড়া।
কাচের জানালা ছাড়া।
শুধু একটি কম্বল।
আর বাইরে
রাতভর বিস্ফোরণের শব্দ।
সকালে তাদের হাতে
কোনো রিপোর্ট দেওয়া হবে না।
শুধু জিজ্ঞেস করা হবে—
“আর যুদ্ধ চাই?”
আমি জানি না
তারা কী উত্তর দেবে।
কিন্তু আমি জানি—
একজন মা জানে।
একজন শিশু জানে।
একজন শরণার্থী জানে।
একজন মানুষ
যে নিজের বাড়ির চাবি
পকেটে নিয়ে অন্য দেশে পৌঁছেছে—
সে জানে।
আমার পৃথিবী এমন নয়।
আমার পৃথিবীতে
বন্দুকের চেয়ে বড় খবর
একটি শিশুর হাসি।
সীমান্তের চেয়ে বড়
একটি মানুষের জীবন।
রাষ্ট্রের চেয়ে বড়
মানুষের মর্যাদা।
বিজয়ের চেয়ে বড়
কারও বেঁচে ফেরা।
আমি এমন পৃথিবী চাই
যেখানে সেনাপতির সবচেয়ে বড় গৌরব
কতজনকে হারালেন—
তা নয়;
কতজনকে
বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনলেন।
যেখানে রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভাষণ
শত্রুকে অপমান করা নয়;
একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে
খাবার দেওয়া।
যেখানে পতাকার সবচেয়ে উঁচু দণ্ডে
ক্ষমতার চিহ্ন নয়—
একটি শিশুর আঁকা
নীল আকাশ ঝোলে।
আর যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো—
“তোমার অস্ত্র কী?”
আমি বলব—
একটি অস্বস্তিকর সত্য।
একটি না-মেলা প্রশ্ন।
একটি কণ্ঠ
যাকে কিনে ফেলা যায় না।
একটি কবিতা
যা ক্ষমতার দরজায় গিয়ে
ভদ্রভাবে কড়া নাড়ে না—
দরজা ভেঙে ঢুকে বলে:
মানুষ মেরো না।
আর যদি বলো—
“তোমার পতাকা?”
আমি বলব—
যে হাতে
একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে
টেনে তোলে।
আর যদি বলো—
“তোমার দেশ?”
আমি বলব—
যেখানে কোনো শিশু
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে
বোমার শব্দ গোনে না।
এই পৃথিবী কার?
তোমার নয়।
আমারও নয়।
কোনো সিংহাসনের নয়।
কোনো কামানের নয়।
কোনো মানচিত্রের আঁকা
কালো দাগেরও নয়।
এই পৃথিবী
সেই শিশুটির—
যে এখনো জানে না
যুদ্ধ কী।
তাকে জানতে দিও না।
তার অভিধানে
“বোমা” শব্দটি রেখো না।
“শরণার্থী” রেখো না।
“নিহত” রেখো না।
“প্রতিশোধ” রেখো না।
তার হাতে দাও
একটি পেন্সিল।
তার সামনে রাখো
একটি খাতা।
বল—
আঁকো।
সে হয়তো
একটা ঘর আঁকবে।
ঘরের পাশে
একটা গাছ।
গাছের নিচে
দুজন মানুষ।
উপরে
একটা সূর্য।
আর কোনো পতাকা নয়।
কোনো বন্দুক নয়।
কোনো সীমান্ত নয়।
শুধু সূর্য।
আমি সেই ছবির পক্ষে।
যদি সেটাই
আমাদের শেষ রাজনীতি হয়—
তবু আমি
সেই রাজনীতিরই মানুষ।
কারণ পৃথিবীকে
বাঁচানোর জন্য
শেষ পর্যন্ত
আমাদের খুব বড় কিছু লাগবে না।
শুধু এতটুকু—
একজন মানুষ
অন্য একজন মানুষকে
মানুষ বলে চিনুক।
আর সেই দিন
যুদ্ধের সব পতাকা
নিজেরাই বুঝবে—
তাদের কাপড় ছিল,
মানুষ ছিল না।