30/03/2026
সম্প্রতি গাবুরার জনকল্যাণে, বিশেষ করে রাস্তাঘাট নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তা যেমন হচ্ছে গাবুরায়, তেমনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং সংসদেও। কিন্তু এই তিন জায়গাতেই কিছু যৌক্তিকতার নিরিখে বলতে গেলে অসঙ্গতি হচ্ছে, যেগুলি নিয়ে কেউই কিছু বলছেন না। এই অসঙ্গতি হবার কারণ হল- আমাদের কথাটা বলার আগে কোন গঠনমূলক ভাবনা-চিন্তা নেই, অধ্যয়ন নেই, অনেকটা মুখে এল আর বলে দিলাম, এমন ভাবে করা হচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস। কাউকে শ্রেফ ঘায়েল করা, অপদস্ত করার অভিপ্রায় আছে কি না, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। তাই বলে তার অর্থ কিন্তু মোটেও এই নয় যে, প্রতিবাদ বা সমালোচনা করা যাবে না, ভুল হলেও তা জন সমক্ষে উত্থাপন করা যাবে না- এমন ভাববার কোনই অবকাশ নেই। আমি আজ এখানে যে বিষয়গুলির অবতারনা করছি, সেই বিষয়গুলির সাথে আমাদের দুইজন জন প্রতিনিধি বিশেষ করে মাননীয় সংসদ সদস্য এবং মাননীয় ইউপি চেয়ারম্যান উভয়ই সম্পৃক্ত। তারা উভয়ই গাবুরার কৃতি সন্তান বলেই বার বার আপনাদের রায় পেয়েছে। যে কাজ করে না, তার কোন ভুল হয় না। তারা কাজ করছেন, তাই তাঁদেরও ভুল হতে পারে। আমার এই প্রয়াস শ্রেফ সংশোধনের নিমিত্তে। আমি উভয়কেই এই আলোচনায় ট্যাগ করছি, যাতে এই আলোচনা তাঁদের নজরে আসে-
১। লেবুবুনিয়ায় টেকসই বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে পাইপের মাধ্যমে লোনা পানি তোলার চেষ্টা গাবুরার জন্য সুস্পষ্টভাবে আত্মঘাতী। এই বিষয়ে প্রথমে চেয়ারম্যান মহোদয় এবং অবশ্যই এমপি মহোদয়কে কোনপ্রকার কালক্ষেপণ না করে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানাই। যে টেকসই বেড়িবাঁধ আমাদের জীবন রক্ষা করবে, সেটা সম্পাদনের আগেই এই প্রয়াস উদ্বেগজনক;
২। হেরিংবন্ড রাস্তায় বালু ব্যবহার না করা সম্ভবত একটি "ওয়ার্ক অর্ডার" এর সুনির্দিষ্ট ধারা লঙ্ঘনের কাজ। এটা করা হয়ে থাকলে তা মারাত্মক অপরাধ এবং গাবুরার স্বার্থ বিরোধী। চেয়ারম্যান মহোদয় এই অন্যায় কাজ সংশোধনের উদ্যোগ নিবেন, এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা। আপনি যদি কোন কারণে অপারগ হন, তাহলে সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন। তাতেও না হলে আপনাদের সবাইকে নিয়ে আমরা সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে পারব ইনশাল্লাহ;
৩। মাননীয় সংসদ সদস্য, আপনি নির্বাচন প্রচারণার সময় একটি ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন- ডুমুরিয়া খেয়াঘাট থেকে একটা বড় রাস্তা চকবারা হয়ে গাবুরা-বেদকাশি খেয়াঘাট নিতে চান এবং এর মাধ্যমে আপনি "ইকোট্যুরিজম" পরিকল্পনা করতে চান। এবার সংসদেও আপনি আরেকটি প্রকল্পের কথা বলেছেন- নোয়াবেকি-পাখিমারা-চউদ্দরশি-চকবারা-বুড়িগোয়ালিনি (ফেরি)-মুন্সিগঞ্জ হাইওয়ে করতে চান। আপনি গাবুরাকে সংসদে তুলে ধরছেন, গাবুরার সন্তান হিসেবে কৃতিত্বের দাবিদার। যদিও এই দুই পরিকল্পনা নিয়েই একটি যৌক্তিক আলোচনার অবকাশ আছে বলে মনে করি। এই বিষয়ে আমার কিছু সুনির্দিষ্ট আলোচনা আছে, যা নিচে উপস্থাপন করছি। আমি বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি, অধ্যয়নও করেছি, তারপর আপনাকে বলছি, তবুও কোন পয়েন্ট অযৌক্তিক মনে হলে আশা করি আমাকে সংশোধন করবেন-
"ইকোট্যুরিজম" এর উদ্দেশ্যে ডুমুরিয়া-গাবুরা খেয়াঘাট রাস্তাঃ-
এই আলোচনার আগে "ইকোট্যুরিজম" কি সেটা একটু দেখা যেতে পারে- Ecotourism হলো প্রাকৃতিক ও সাধারণত সংরক্ষিত এলাকায় দায়িত্বশীল ভ্রমণ ব্যবস্থা, যার মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের মধ্যে পরিবেশ ও সংস্কৃতি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এটি Low-Impact এবং Small-scale পর্যটনকে উৎসাহিত করে, যাতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং স্থানীয় সম্প্রদায় পর্যটন থেকে সরাসরি লাভবান হয়। এখানে Ecotourism অবশ্যই টেকসই, শিক্ষামূলক এবং পরিবেশবান্ধব হতে হয়। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে Ecotourism-এর ফলে পরিবেশগত ক্ষতি, বন্যপ্রাণীর ওপর চাপ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতি এবং Greenwashing বা মিথ্যা পরিবেশ বান্ধব দাবি’র মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
* (গুগল বা অনেক মাধ্যম আছে, যে কোন পাঠক আমার বক্তব্য যাচাই করার জন্য পড়তে পারেন)
অতএব, ডুমুরিয়া-গাবুরা খেয়াঘাট রাস্তায় ইকোট্যুরিজমের দূরতম কোন সম্ভাবনা আছে কি না, তা উপরের ইকোট্যুরিজম এর আলোচনার ভিত্তিতে আমরা ভেবে দেখতে পারি। তবে ইকোট্যুরিজম নয়, গতিপথ একটু পরিবর্তন করে এই রাস্তাটির ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে রাস্তাটিকে যৌক্তিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়। সেই আলোচনায় একটু পরে আসছি যখন আমি আমার প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করবো সেখানে।
এবার নোয়াবেকি-পাখিমারা-চৌদ্দরশি-চকবারা-বুড়িগোয়ালিনি (ফেরি)-মুন্সিগঞ্জ হাইওয়ে নিয়ে বলি। এই পরিকল্পটিরও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। যে রাস্তাই হোক, পরিকল্পনার আগে গাবুরার পরিবেশ, সম্ভাবনা, গুরুত্ব বিবেচনা প্রথমেই করতে হবে। গাবুরার প্রধান সড়ক বাল্যকাল থেকে দেখে আসছি চৌদ্দরশি-চাঁদনীমুখা। এটি হলে সুন্দরবন ভিত্তিক "ইকোট্যুরিজম" এর সম্ভাবনা তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, গাবুরা নদী-ভাঙ্গন প্রবণ এলাকা। ভবিষ্যৎ ভাবতে হবে আমাদের। এই রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু করতে পারলে ইউনিয়ন দুই ভাগে বা ক্লাস্টারে বিভক্ত করা যাবে। একপাশে ভেঙ্গে গেলেও অন্যপাশ সুরক্ষিত থাকবে। আমার প্রস্তাবনায় আরও ২টি রাস্তা আছে, সেগুলিও যদি একই উচ্চতায় করা যায়, তবে পুরা ইউনিয়ন ৬টি ক্ষুদ্র ক্লাস্টারে বিভক্ত হবে। তখন কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেলে ছোট্ট একটা অংশ প্লাবিত হলেও বাকি এলাকা সুরক্ষিত থাকবে। দয়াকরে সংযুক্ত ছবিটি দেখুন।
(লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে অনুরোধ করছি সম্পূর্ণটা পড়বেন দয়াকরে। এটা গাবুরার জন্য অনেকটা সময় ব্যয় করে আমি তৈরি করেছি। বিশেষ করে আমাদের এমপি মহোদয়, জনাব মনিরুজ্জামান মহোদয়, চেয়ারম্যান মহোদয় এবং অন্যান্য বিশেষ ব্যক্তি বর্গের জন্য, যারা গাবুরা ও উপকূল নিয়ে ভাবেন কিংবা গবেষণা করেন যাতে সবাই মিলে রাজনীতির উরধে উঠে সুন্দর উপকূল গড়তে পারি)
আমার প্রস্তাবঃ
আমার ৮ বছরের বৈশ্বিক প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ অধ্যয়ন থেকে অর্জিত জ্ঞান একত্রিত করে আমার কথাগুলি প্রথমে ছবিতে এঁকেছি। এবার সেই স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরছি (এই ৬ ক্লাস্টারের পরিকল্পনায় স্নেহাস্পদ Gazi Nur Md. Bulbul আমাকে সহায়তা করেছিল, কৃতজ্ঞতা তার প্রতি)-
১। প্রথমে সবুজ রঙে আঁকা রাস্তাটি হাইওয়ের সাথে যুক্ত করা দরকার। পাখিমারা-চৌদ্দরশি-গাইনবাড়ি হয়ে চকবারা নয়, চাঁদনীমুখা যাওয়া দরকার। কেন দরকার সেটা ২ নং প্রস্তাবে পরিস্কার হবে বলে আশা করি। কারণ এর গুরুত্ব, গাবুরার পরিবেশ, এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভিত্তিতে এই প্রস্তাব করছি। দীর্ঘ মেয়াদি ভাবনা ও পরিকল্পনা দরকার আমাদের। আমাদের প্রতিটি পরিকল্পনায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে না করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমারাই, গাবুরাবাসি।
২। হলুদ ও নীল রঙের রাস্তা দুটিও একই উচ্চতায় ডুমুরিয়া খেয়াঘাট থেকে চকবারা-গাইনবাড়ি হয়ে লেবুবুনিয়া পর্যন্ত এবং ডুমুরিয়া খেয়াঘাট থেকে অপর রাস্তাটি হরিসখালি হয়ে পার্শ্বেমারি স্কুল পর্যন্ত। ব্যস, তবেই ইউনিয়ন ৬ ক্লাস্টারে বিভক্ত হলে ভবিষ্যতে নদী ভাঙ্গন থেকে সৃষ্ট প্লাবনকে আমরা একটা ক্ষুদ্র এলাকায় আটকে রাখতে পারব ইনশাল্লাহ।
৩। যদি গাবুরাভিত্তিক ইকোট্যুরিজমের পরিকল্পনা করা হয়, তবে গোলাপি রঙের রাস্তাগুলি করার দরকার হবে। আমার জানা মতে যেখানে চর আছে, ভাঙনপ্রবণ নয়, সেগুলি এই পরিল্পনার আওতায় আসতে পারে। যেমন ১নম্বরে আসবে দৃষ্টিনন্দন, এভাবে জেলিয়াখালি, খোলপেটুয়া, চাঁদনীমুখা, পার্শ্বেমারী ইত্যাদি (অন্য এলাকায় চর থাকলে সেটিও যুক্ত হতে পারে)। এখানে প্রটেকশন নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণ, ঝুঁকিপূর্ণ নয় এমন বন্য প্রাণী প্রজনন করে গড়ে তোলা যেতে পারে। মৌসুমে অতিথি পাখির আগমন ঘটবে।
৪। আমার মতে সমগ্র বেড়িবাঁধ এর উপর দিয়ে কারপেটিং রাস্তা করা সম্ভব হলে সেটা বেড়িবাঁধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলবে। যা ইকোট্যুরিজম করা হলে সেখানেও কাজে লাগবে।
৫। শ্যামনগর থেকে মুন্সিগঞ্জ হয়ে নীল্ডুমুর পর্যন্ত রাস্তাটিও অত্যন্ত জরুরী।
৬। স্থায়িভাবে গাবুরাকে লবণ পানি মুক্ত করে পর্যাপ্ত খাল খনন করে একই জমিতে ২-৪ ফসল করা যেতে পারে। সে জন্য পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা করার প্লান করতে হবে, যা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা যাবে না।
৭। গাবুরার বাজারগুলিকে বিজনেস নেটওয়ার্কের আওতায় এনে এলাকার অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
@