01/07/2026
“যে মানুষ ধৈর্য ধরতে জানে, সে লড়াইয়ে সফল হবেই”
জীবনের কঠিন সময়গুলোতে আমরা প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়ি। মনে হয় চারপাশের দেয়ালগুলো যেন আমাদের চেপে ধরছে, বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, এই হতাশার অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততটাই কাছাকাছি থাকে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘আহসানুল কাসাস’ বা শ্রেষ্ঠ কাহিনি হলো হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনকথা। এটি শুধু একজন নবীর গল্প নয়; এটি হলো চরম বিপদে ধৈর্য ধারণ করে শূন্য থেকে শীর্ষে ওঠার এক বাস্তব ও সর্বকালের সেরা অনুপ্রেরণাদায়ক ইতিহাস।
অন্ধকার কূপ এবং আপনজনদের বিশ্বাসঘাতকতা
কল্পনা করুন ছোট্ট এক বালকের কথা। বাবার চোখের মণি সে। কিন্তু আপন সৎ ভাইয়েরা ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে তাকে নিয়ে গেল জঙ্গলে। নির্মমভাবে তাকে ফেলে দিল এক গভীর, অন্ধকার এবং পানিশূন্য কূপে। যে বয়সে একটি শিশুর বাবার হাত ধরে নিরাপদে হাঁটার কথা, সেই বয়সে ইউসুফ (আ.) দেখলেন আপনজনদের বিশ্বাসঘাতকতার চরম রূপ।
কূপের সেই নিকষ অন্ধকারে একটি শিশু চাইলেই ভয়ে, কান্নায়, হতাশায় ভেঙে পড়তে পারতো। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করলেন। তাঁর মনে বিশ্বাস ছিল, তাঁর স্রষ্টা তাঁকে এই অন্ধকারে একা ছেড়ে দেবেন না।
দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে প্রলোভনের পরীক্ষা
কূপ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর তাঁর জীবন সহজ হয়নি। বরং তাঁকে মাত্র কয়েকটি মুদ্রার বিনিময়ে মিশরের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হলো। যিনি ছিলেন একজন নবীর আদরের সন্তান, তিনি হয়ে গেলেন একজন কেনা গোলাম।
মিশরের আজিজ (মন্ত্রী)-এর ঘরে তিনি বড় হলেন। যৌবনে পদার্পণ করার পর তাঁর সামনে এলো এক ভয়াবহ পরীক্ষা। মন্ত্রীর স্ত্রী জুলাইখা তাঁকে পাপকাজে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলো। একদিকে চরম প্রলোভন ও ক্ষমতাশালী নারীর চাপ, অন্যদিকে নিজের চরিত্র ও রবের প্রতি আনুগত্য। ইউসুফ (আ.) পাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “হে আমার রব! তারা আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে অধিক প্রিয়।”
কারাগারের অন্ধকার এবং দীর্ঘ অপেক্ষা
নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ (আ.)-কে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। শুরু হলো জীবনের আরেক অন্ধকার অধ্যায়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তিনি সেই চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকলেন। কোনো অপরাধ না করেও শাস্তির এই বোঝা টানা একজন সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কষ্টের, তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে।
কিন্তু ইউসুফ (আ.) হতাশ হলেন না। তিনি ‘সবরে জামিল’ বা সুন্দরতম ধৈর্য ধারণ করলেন। কারাগারেও তিনি সহবন্দিদের মাঝে আল্লাহর বাণী প্রচার করতে লাগলেন এবং নিজের ওপর আল্লাহর ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন।
ধৈর্যের চূড়ান্ত ফল: সিংহাসন ও ক্ষমা
আল্লাহর ঘড়িতে সময় সবসময় নিখুঁত। মিশরের রাজার এক অদ্ভুত স্বপ্নের নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়ে ইউসুফ (আ.) শুধু কারাগার থেকেই মুক্ত হলেন না, রাজা তাঁর প্রজ্ঞা ও সততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পুরো মিশরের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
যে ইউসুফকে একদিন দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে উঠলেন মিশরের ত্রাতা। দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর সেই ভাইয়েরা, যারা তাঁকে কূপে ফেলেছিল, তাঁরই সামনে এসে খাবারের জন্য হাত পাতলো। ইউসুফ (আ.) চাইলেই সেদিন চরম প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু ধৈর্যের আগুনে পুড়ে যিনি খাঁটি সোনা হয়েছেন, তাঁর অন্তরে রাগ থাকে না। তিনি ভাইদের ক্ষমা করে দিয়ে বললেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।”
আমাদের জন্য শিক্ষা
এই গল্পটি আমাদের জীবনের সাথে কতটা গভীরভাবে মিলে যায়, একটু ভেবে দেখুন:
আপনার জীবনেও হয়তো আপনজনেরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আপনাকে হয়তো ‘কূপে’ ফেলে দেওয়া হয়েছে।
হয়তো আপনি মিথ্যা অপবাদের শিকার হয়ে সমাজ বা নিজের মনের ‘কারাগারে’ বন্দি হয়ে আছেন।
হয়তো আপনি দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সফলতার মুখ দেখছেন না।
কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার ধৈর্য দেখছেন। আপনি যদি হাল না ছেড়ে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের কাজটা সততার সাথে করে যান—তবে আপনার জন্যও কোনো না কোনো ‘মিশরের সিংহাসন’ অপেক্ষা করছে।
পতন মানেই শেষ নয়। যে মানুষ চরম বিপদেও ধৈর্য ধরতে জানে, আল্লাহর রহমতে সে লড়াইয়ে সফল হবেই। > গল্পটি পড়ে যদি আপনার মনে একটুও সাহস ও প্রশান্তি আসে, তবে আপনার প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। কে জানে, হয়তো আপনার একটি শেয়ার আজ এমন কাউকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাবে, যে জীবনের লড়াইয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল!
Hussain