10/09/2026
দেশে কয়লা আছে, তবুও আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ—লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি কোথায়?
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বর্তমানে ৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর বড় অংশই আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশের মাটির নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লার মজুত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—দেশে কয়লা থাকা সত্ত্বেও কেন বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞ ও সরকারি বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর মূল কারণ দেশে কয়লা নেই—এমন নয়। বরং দেশীয় কয়লা উত্তোলন সীমিত, নতুন কয়লাখনি উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত ও পরিবেশগত বিতর্ক রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই আমদানিকৃত কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করেই নির্মাণ করা হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কতটি?
বাংলাদেশে বড় ও উল্লেখযোগ্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, পটুয়াখালীর পায়রা, বাগেরহাটের রামপাল, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্রকল্প।
বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৫২৫ মেগাওয়াট এবং এটি দেশীয় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ওপর নির্ভরশীল।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। এটি আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহার করে।
রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং এটিও আমদানিকৃত কয়লানির্ভর।
মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ারের সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শুধু BPDB-এর নিজস্ব/নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রগুলোর কয়লাভিত্তিক স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ৬ হাজার ৬০৪ মেগাওয়াট। দেশের অন্যান্য বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের কেন্দ্র যুক্ত করলে মোট কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা ৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
দেশে কয়লা আছে, তাহলে আমদানি কেন?
বাংলাদেশে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী, দীঘিপাড়া, খালাশপীর ও জামালগঞ্জসহ একাধিক কয়লাক্ষেত্র রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মাটির নিচে কয়লার মজুত রয়েছে।
কিন্তু এসব কয়লাক্ষেত্রের অধিকাংশে বর্তমানে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উত্তোলন হচ্ছে না। কার্যকরভাবে উৎপাদন করছে মূলত দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি।
বড়পুকুরিয়ার কয়লা দিয়ে পাশের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হয়। খনি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূরত্ব কম হওয়ায় কয়লা পরিবহনের খরচও তুলনামূলক কম।
কিন্তু বড়পুকুরিয়ার উৎপাদন দিয়ে দেশের ৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ফলে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হয়।
দেশীয় কয়লা উত্তোলন বাড়ানো হচ্ছে না কেন?
দেশীয় কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কয়লা অনেক গভীরে
বাংলাদেশের অনেক কয়লাক্ষেত্রে কয়লার স্তর মাটির অনেক নিচে অবস্থিত। সেখানে খনি তৈরি করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কৃষিজমি ও পরিবেশের প্রশ্ন
কিছু কয়লাক্ষেত্রে ওপেন-পিট বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, ভূগর্ভস্থ পানি, পরিবেশ ও মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় বড় আকারে জমি অধিগ্রহণ ও মানুষের পুনর্বাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন কয়লাখনি নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাব
দেশীয় কয়লার বড় মজুত থাকলেও নতুন বড় কয়লাখনি উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য কয়লাক্ষেত্রগুলো থেকে ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়নি।
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আমদানিকৃত কয়লানির্ভর কেন?
এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান ও নকশা গুরুত্বপূর্ণ।
পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ীর মতো বড় কেন্দ্রগুলো উপকূলীয় বা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। ফলে সমুদ্রপথে বড় জাহাজে কয়লা এনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা তুলনামূলক সহজ।
অর্থাৎ এসব প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ শুরু থেকেই আমদানিকৃত কয়লাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত।
অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া হচ্ছে mine-mouth power plant—অর্থাৎ কয়লাখনির কাছেই বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই দেশীয় কয়লা সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
দেশীয় কয়লা কি নিম্নমানের?
দেশীয় কয়লা মানহীন—এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়।
বাংলাদেশের কিছু কয়লার তাপ উৎপাদন ক্ষমতা বা calorific value তুলনামূলকভাবে ভালো। শিল্পখাতের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেশীয় কয়লার উচ্চ তাপমূল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু কয়লার মানের কারণে বাংলাদেশকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
মূল সমস্যা হচ্ছে কয়লা উত্তোলনের সক্ষমতা, খনি উন্নয়ন, বিনিয়োগ, পরিবেশগত ঝুঁকি, অবকাঠামো এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত।
আমদানিনির্ভর কয়লা ও লোডশেডিংয়ের সম্পর্ক
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
একটি সরল সরবরাহ চক্র হলো—
ডলার/এলসি সংকট → কয়লা আমদানিতে সমস্যা → কয়লার মজুত কমে যাওয়া → বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া বা কেন্দ্র বন্ধ → জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি → লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি।
অতীতে কয়লা সরবরাহ ও অর্থায়নসংক্রান্ত সমস্যার কারণে পায়রা ও রামপালসহ বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও BPDB-এর দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের উৎপাদন সমস্যার কারণ হিসেবে “Coal Shortage” উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে সব লোডশেডিংয়ের জন্য কি কয়লা দায়ী?
না।
লোডশেডিংয়ের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- গ্যাসের ঘাটতি
- কয়লার ঘাটতি
- তেল সরবরাহের সমস্যা
- বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি
- রক্ষণাবেক্ষণ
- বিদ্যুৎ আমদানিতে সমস্যা
- সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
- অতিরিক্ত চাহিদা
- বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল
- বৈদেশিক মুদ্রার সংকট
তাই নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ জানতে হলে ওই সময়ের কেন্দ্রভিত্তিক উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
দেশীয় কয়লা ব্যবহার করলে কি বিদ্যুতের দাম কমবে?
এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি হ্যাঁ বা না বলা যায় না।
দেশীয় কয়লা ব্যবহার করলে বিদেশ থেকে কয়লা কেনার জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমতে পারে। জাহাজভাড়া, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও আমদানি-সংক্রান্ত কিছু খরচও কমতে পারে।
তবে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের জন্যও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। খনি নির্মাণ, যন্ত্রপাতি, শ্রম, জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, পরিবেশ সুরক্ষা ও অবকাঠামোর খরচ রয়েছে।
তাই দেশীয় কয়লার প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণ করতে হলে খনি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় হিসাব করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি দেশীয় কয়লায় নির্ভরশীল হতে পারবে?
তাৎক্ষণিকভাবে দেশের সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেশীয় কয়লায় চালানো সম্ভব নয়।
কারণ বর্তমান দেশীয় কয়লা উত্তোলনের সক্ষমতা দেশের মোট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে দেশীয় কয়লার মজুত নিয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
যেসব এলাকায় পরিবেশগত ক্ষতি কমিয়ে অর্থনৈতিকভাবে কয়লা উত্তোলন সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য জ্বালানি উৎস বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
দেশে কয়লা আছে, কিন্তু বড় পরিসরে দেশীয় কয়লা উত্তোলন হচ্ছে না।
অন্যদিকে গত কয়েক বছরে নির্মিত বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার, এলসি, কয়লার দাম, জাহাজ ও বন্দর ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান লোডশেডিংয়ের একমাত্র কারণ কয়লা সংকট। বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক চিত্রে গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ আমদানি, উৎপাদন সক্ষমতা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি নির্ধারণে শুধু “আমদানি করব” বা “দেশীয় কয়লা তুলব”—এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিবর্তে অর্থনৈতিক ব্যয়, পরিবেশগত ক্ষতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা।
বাংলাদেশে কয়লা নেই—এ কারণে আমদানি করতে হয়, বিষয়টি এমন নয়। বরং পর্যাপ্ত দেশীয় কয়লা উত্তোলন না হওয়ায় এবং বিদ্যমান বড় কেন্দ্রগুলো আমদানিকৃত কয়লানির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশকে বড় পরিসরে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে।
তথ্যসূত্র
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB), বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নথি, সরকারি জ্বালানি পরিকল্পনা, The Daily Star, The Business Standard, The Financial Express এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প বিশ্লেষণ।
#কয়লাভিত্তিকবিদ্যুৎ #বিদ্যুৎ #লোডশেডিং #কয়লাসংকট #জ্বালানিনিরাপত্তা #দেশীয়কয়লা #আমদানিকৃতকয়লা #বাংলাদেশ #বিদ্যুৎকেন্দ্র