11/08/2026
ক্ষমতার আড়ালে কাম ও কোটি টাকার সাম্রাজ্য—উন্মোচিত যুবলীগ নেতা সাজলুর কালো জগত!
বিশেষ অপরাধ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:-
শূন্য থেকে কোটিপতি, এমপির সাধারণ কর্মচারী থেকে একলাফে সিটি কর্পোরেশনের দাপুটে কর্মকর্তা! আর এই অসীম ক্ষমতার ছায়াতলে জড়িয়ে থাকা অনৈতিক যৌন কেলেঙ্কারি, বালু মহালের লুটেরা কারবার, মানব পাচার ও রক্তক্ষয়ী হিংস্রতা—কোনো রোমাঞ্চকর ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্যকেও যেন হার মানায় সাজলু লস্করের জীবনকাহিনি।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) অপসারিত মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের আস্থাজনিত প্রভাবে এসএসসি পাসের সনদধারী সিলেট জেলা যুবলীগের দফতর সম্পাদক সাজলু লস্কর হয়ে উঠেছিলেন এক ধরাছোঁয়ার বাইরের রাজপুত্র। কিন্তু তার এই অন্ধকারের সাম্রাজ্য এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে—আর সেই রাজপ্রাসাদের চাবিকাঠি ও গোপন পাপের ঝুলিসমেত প্রকাশ্যে এসেছেন খোদ তার স্ত্রী, লোকসংগীত শিল্পী রাজিয়া সুলতানা লাভলী!
লেচু মিয়ার সাধারণ ভৃত্য থেকে সিসিকের 'ছায়াধিপতি'
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাজলুর উত্থানের গল্পটা জাদুকরী হলেও এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে চরম সুযোগসন্ধান। সিলেট-৫ আসনের তৎকালীন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন লেচুর ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন সাজলু। বাতাসের গতি মেপে রাজনৈতিক ডিগবাজি দিতে যার সময় লাগেনি মোটেই।
বিএনপির ছায়া ছেড়ে ক্ষমতার নব্য কেন্দ্রবিন্দু আওয়ামী লিগে ভিড়তেই কপাল খুলে যায় তার। বনে যান জেলা যুবলীগের দফতর সম্পাদক। এরপর সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের আশীর্বাদে সরকারি সব নিয়মনীতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিসিকের অত্যন্ত স্পর্শকাতর 'জনসংযোগ কর্মকর্তা' পদে আসীন হন সাজলু। একজন মাত্র এসএসসি পাস ব্যক্তিকে সিসিকের চালকের আসনে বসতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
আলাদীনের চেরাগ ও কোটি টাকার সাম্রাজ্য
সিসিকের পিআর পদে বসার পরেই যেন সাজলু পেয়ে যান রূপকথার সেই আলাদীনের চেরাগ।
রাজকীয় আবাসন: রাতারাতি জিরো থেকে হিরো বনে যাওয়া সাজলু মীরবাজারের আভিজাত্যপূর্ণ রাজবাড়িতে কিনে নেন কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
ভিআইপি জীবনযাপন: চড়তেন কোটি টাকা মূল্যের ভিআইপি জিপ গাড়িতে।
বিভাগীয় বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য: সিলেটের প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, পুলিশের তৎকালীন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে কবজায় রেখে থানা বদলি এবং পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে নগদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ চোরাই পণ্য আনা, সুবর্মা ও সুরমা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা—এমন কোনো অপরাধ নেই যা সাজলু ও তার সিন্ডিকেটের হাত ধরে সংঘটিত হয়নি।
ভয়ংকর যৌন শোষণ ও পাপের সাম্রাজ্য: স্ত্রীর বিস্ফোরক সত্য
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য প্রকাশ করেছেন সাজলুর স্ত্রী, জনপ্রিয় গায়িকা রাজিয়া সুলতানা লাভলী। আমেরিকা গমনের পর স্ত্রীর সাথে দূরত্বের জেরে উন্মোচিত হয় এই অপরাধ সাম্রাজ্যের আসল কঙ্কাল।
এক গণমাধ্যম কর্মীর সাথে আলাপকালে রাজিয়া সুলতানা লাভলী ফাঁস করেন সাজলু ও মেয়রের অঘোষিত পিএস আকুদ্দুসের হাড়হিম করা কর্মকাণ্ড। চাকরিপ্রার্থী অসহায় ও সুন্দরী নারীদের সিসিকে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সিলেটের বিভিন্ন গোপন ফ্ল্যাট ও তারকা হোটেলে নিয়ে যেতেন তারা। সেখানে চলত পাশবিক শারীরিক শোষণ। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের 'যৌন খোরাক' জোগাতে সেসব নারীদের বাধ্য করা হতো তাদের কাছে পাঠাতে। সিসিক কার্যালয়কে কার্যত কাম ও ক্ষমতার আঁতুড়ঘরে পরিণত করেছিলেন এই সাজলু।
সাংবাদিক তুরাব হত্যাকাণ্ড ও রহস্যজনক আমেরিকা পলায়ন
গত বছরের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে প্রকাশ্য অস্ত্রহাতে তাণ্ডব চালান সাজলু। সিলেট নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। সিলেটে পুলিশের গুলিতে ও আওয়ামী লীগের হামলায় শহীদ হন দৈনিক জালালাবাদের উদীয়মান তরুণ সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। সেই তুরাব হত্যা মামলার তালিকাভুক্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এই সাজলু।
ক্ষমতার পতনের পর সবাই যখন ভেবেছিল সাজলু জালে ধরা পড়বেন, তখনই ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা! পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দেশ ছাড়লেন এই দুর্ধর্ষ অপরাধী?
অনুসন্ধান বলছে, উপশহরের স্প্রিং টাওয়ারের এক পরিচিত পরিবারের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এবং বিএনপির কিছু অসাধু নেতার সাথে অলিখিত আঁতাত করে তিনি প্রথমে যান সৌদি আরব। স্ত্রীর 'গানের সুরে মোহগ্রস্ত' বিএনপি নেতাদের কাজে লাগিয়ে বিশেষ সহায়তায় সেখান থেকে বহুল কাঙ্ক্ষিত আমেরিকায়।
আমেরিকার নিরাপদ আশ্রয়ে বসে এখন ভাবছেন তিনি পার পেয়ে গেছেন? নাকি তার এই দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে?
(চোখ রাখুন আগামী পর্বে...)