17/02/2021
দূর্নীতি কিভাবে মুক্ত করব আমরা ভাই? কোন উপায় জানা আছে??
দেশের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে দুর্নীতি নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন খাটি দুর্নীতিবাজ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। বলে দুর্নীতি বন্ধ না হলে দেশ এগোবেনা। ওই যে নীল জামা পরা ভদ্রমহিলা ট্রাফিক পুলিশের সাথে বাজে ব্যাবহার করেছিল অবৈধভাবে পার্কিং করতে নিষেধ করায়? মনে পড়ে? ওনার ফেসবুক ওয়ালেও ছিল নিরাপদ সড়ক চাই।
কোন খাতের দুর্নীতি বন্ধ করবেন? কাকে বসাবেন? কাকে দিবেন এই দায়িত্ব?? সে নিজেও দুর্নীতি করবেনা এর কোন গ্যারান্টি নেই। সমস্যা তাহলে কোথায়??
শুধু সরকারী ভাবে কঠোর আইন আর শাস্তি বিধান করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে??? যদি হয় তবে আপনি খুব আশাবাদী মানুষ। কিন্তু এদেশে অবৈধ ভাবে চলেনা কে??
আপনার আমার মত অনেক মানুষ নিজের কাজটি সহজে করার জন্য ঘুষ দিতে চাই। বিশ্বাস করেন, জমির রেজিস্ট্রি করতে যাবেন, নিজের কাগজে ভুল থাকলে আমরাই টাকা দিয়ে সেটা মেটানোর অফার করি।
ব্যাবসায়ীরা যারা মনে করছেন আপনারা ভাল, আসলেই কি ভাল?? কোভিড-১৯ এর সময়ে বিড়ির দাম রাতারাতি বানিয়ে দিলেন প্যাকেট ৩৫০ টাকা যেটার দাম ২৫০ টাকা। ভারত থেকে পেয়াজ আমদানি বন্ধ হতে পারে খবর কানে আশার সাথে সাথে দাম হাকালেন ২০০ টাকা কেজি। আচ্ছা যারা এমন করছেন জিজ্ঞেস করুন, তারাও বলবে দুর্নীতি বন্ধ হউয়া উচিত। তাহলে সমস্যা আসলে কোথায়??
সত্যি বলতে আল্লাহ আমাদের উপর একটা বড় গজব দিয়েছেন। আর সেটা হল সমাজ থেকে নৈতিকতা তুলে নিয়েছেন। এখনকার পিচ্চি পোলাপান যারা দুর্নীতি নিয়ে সরব জিজ্ঞেস করুন তার পিতার কাছে জিজ্ঞেস করেছে কিনা যে বাবা তোমার বেতন তো এত বেশিনা তাহলে এত খরচ কিভাবে মেটাও??? সেই সাহস নেই। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীর ঢাকাতে একাধিক ফ্লাট।
এই নৈতিকতা আমাদের এত খারাপ পর্যায়ে পৌছানোর কারন হল সামাজিক ভাবেই আমরা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা বন্ধ করেছি। ফ্যাশন হিসাবে নিয়েছি ইয়াবা খাওয়া। আবার আধুনিক স্টাইল করে নাম দিয়েছি বাবা। নিজের বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ টুকুও আমাদের লোপ পেয়েছে।
বিশ্বাস করুন, আপনার মুখে যদি মাদার নিয়ে, সিস্টার নিয়ে গালি দিতে না বাধে, যদি মনে করেন এগুলা শুধু মজা করার জন্যই দেয়া আপনি নিশ্চিত নৈতিকতা বোধটুকু থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। নিজেকে প্রশ্ন করুন।
কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এই বোধ আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারন হল আমরা খারাপ কাজকে এডভেঞ্চার হিসাবে নেই আর ভাল কাজকে মনে করি আনকালচারড। ভালর মূল্য আমরা দেইনা। আর এজন্যই খারাপ জয়জুক্ত হচ্ছে।
কি হবে আমাদের?? এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এত কথা বলছি, ভেবে দেখুন এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলা লোকের সংখ্যায় এদেশে সব থেকে বেশি। সবাই ঘৃণা করে। কিন্তু সবাই দুর্নীতি করে। ভাবখানা এমন যে আমার ছেলের একটা আইফোন লাগবে। বাবা এই টাকা যেভাবে পারে ম্যানেজ করবে, আর ছেলে কিভাবে আইফোন হাতে আসল এগুলা নিয়ে চিন্তা না করেই আইফোন নিয়ে শো অফ করবে।
আমাদের নিজেদের চাহিদা কে আমরা সীমিত রাখতে পারিনি। আমাদের চাহিদা মেটাতে যত যা করা হোক সেগুলা বৈধ বা অবৈধ হোক সেটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা কম। কিন্তু আমরাই অন্যের একি কাজে চিকনে সমালোচনা করতে পিছুপা হবনা।
রাসুল স: এর একটা হাদিস পড়েছিলাম, রেফারেন্স মনে নেই, মূল কথাটা ছিল এমন যে, মানুষের পেট বর্গহাতের এক বিঘাত, অথচ এই পেটের যে চাহিদা সেটাই মানুষকে জাহান্নামে নিতে যথেষ্ট।
আমাদের নৈতিকতা এবং মূর্খতা যুক্ত হয়ে এক অসাধারন সমাজ ব্যাবস্থা গড়ে উঠেছে। সেদিন কেউ একজন স্ক্রিনশট দিয়ে আক্ষেপ করছে দেখলাম। আমি দেখে লজ্জিত হয়েছি। আইডির নাম "এসো আল্লাহর পথে" আর কমেন্ট করেছে "ভাই লিংক ইনবক্স প্লিজ"।
ফেসবুকে প্রচুর আইডি দেখেছি কাভার ফটোতে মক্কা শরিফের ছবি আর লাইক দিয়ে রাখছে যাদের সেটা বলতেই লজ্জা হয়। এই পরস্পর বিরোধী মানসিক অবস্থান এর কারন কি জানেন? এই নৈতিক বোধ এদের নেই। নিজেদের বিবেক কে আমরা মেরে ফেলছি।
নৈতিকতার শিক্ষা পরিবার থেকে আসে। স্কুল, বা কলেজ থেকে না। আর এই পরিবারের সমস্যা হল, পিতা হিসাবে আপনি খারাপ, মাতা হিসাবে আপনি খারাপ, সন্তান হিসাবেও।
পিতা যদি এক পয়সা অবৈধ আয়ের খাবার সন্তানকে দেয় আর সন্তান যদি বুঝ হবার পরে বুঝেও না বুঝার ভান করে তবে কি ধরে নিতে পারেন না যে ইনারা ভবিষ্যতে দূর্নীতিবাজ হবে নাকি সৎ হবে? মা এবং স্ত্রীর ভুমিকায় কেউ যদি সন্তানের অবৈধ কাজকে শাসন না করে প্রশ্রয় দেয়, স্ত্রী যদি তাদের নিজের চাহিদা মেটাবার জন্য প্রেশার দিতেই থাকে তাহলে কি আশা করতে পারেন?
এটা সামাজিক রোগ। একে সামাজিক ভাবে প্রতিহত করতে হবে আগে নিজেদের বিবেক কে জাগ্রত করতে হবে। বড়দের সম্মান করতে হয় এই শিক্ষা নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে বলে মনে হয়। বৃদ্ধদের পাশে দাড়াতে হয় সেটা আমরা ভুলে গেছি। নিজের বৃদ্ধ বাবা মা কে রাস্তায়, বনে ফেলে দিয়ে আসছি। চিন্তা করুন আমরা কি পরিমান বিবেকশুণ্য হয়ে পরেছি?
হ্যা, দূর্নীতির বিরুদ্ধে বলা সহজ, কিন্তু শুধু বলার পরিবর্তে নিজেকে দূর্নীতির বাইরে রাখা হল প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। নিজের চাহিদা কে কমিয়ে ফেলতে হবে। আর সৎকাজের আদেশ করতে হবে, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে হবে।
মানুষের প্রকৃত রুপ বের হয়ে আসে যখন তার কাছে দুটি জিনিস থাকে। টাকা, এবং ক্ষমতা। খুব ভদ্র মানুষ কতটুকু ভদ্র সেটাও বোঝা যায় তাকে এই দুটি জিনিস দিয়ে। কিন্তু বিবেক বিসর্জন যারা দিতে চান না তারাই টিকে রাখতে পারে নিজের সত্ত্বাকে।
এদেশের ক্ষতি হয়েছে শিক্ষিত সমাজের দ্বারা। সমাজের গরীব, কৃষক শ্রমিক হালাল পথেই আছে। সহজ সরল এই মানুষ গুলির জন্য হয়ত স্রষ্টা এখনো টিকিয়ে রেখেছে আমাদের। আর আমরা যারা নামি দামি বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ে, দুই লাইন ইংরেজি শিখে অহঙ্কার করি আমরাই প্রকৃত শত্রু দেশের। আমাদের কলমের এক খোচায় অসংখ্য মানুষের হক নষ্ট হয়। ভাল ভার্সিটিতে পড়ে ভাল জব করে অহঙ্কার থেকে বিরত থাকুন। আসুন আমরা নিজেদের পরিবর্তন করি। নিজের পরিবারকে পরিবর্তন করি। নিজের সন্তানকে উত্তম শিক্ষা দেই। আর ভাল কাজের প্রশংসা করতে শিখি। বাজে কাজের ঘৃণা করতে শিখি। লজ্জিত হবার শিক্ষা দেই। লজ্জা জিনিসটা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। আসুন সমাজ রিপেয়ার করি।
ভুল কিছু বলে থাকলে ক্ষমা করবেন।