23/07/2026
ভাইবোন পরিবার সন্তানদের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, তাদের কাছ থেকেই একদিন অবহেলা, উপেক্ষা ও তিরস্কার সহ্য করতে হয়। নিঃসঙ্গতা তখন তাদের হৃদয়কে ভেঙে দেয়। ভোগ লোভ লালসায় এই অন্ধ ভাইবোন পরিবার সন্তানদের জন্য আপনার নিশ্চুপ নীরবতা দুরত্বই আপনার জন্য প্রশান্তি।
বৌদ্ধধর্মে আছে এর থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির বার্তা।
--------------------------
জীবনে ভাইবোন, প্রিয়জন, সন্তান কিংবা আপন মানুষদের কাছ থেকে অবহেলা, পরিবর্তন বা প্রত্যাখ্যান আসতে পারে। তখন আমরা কি দোষারোপ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুনে নিজের মনকে জ্বালিয়ে দেব? নাকি উপলব্ধি করব— এটাই সংসারের স্বভাব, এবং ধর্মের আলোয় নিজের মনকে রক্ষা করব।
আমরা অন্য মানুষের মন পরিবর্তন করতে পারি না। কিন্তু তাদের আচরণের মুখোমুখি হয়েও অবিচল থাকার শক্তি অর্জন করতে পারি। সেই অতুলনীয় মানসিক মুক্তি, সেই মহৎ অন্তর্দৃষ্টি এবং সেই লোকোত্তর মনোবিজ্ঞান বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই নিহিত।
বৌদ্ধধর্মে বহুপুত্তিকা থেরী দেখিয়েছেন “হতাশাকে” “মুক্তির প্রজ্ঞায়” রূপান্তরিত করার এক অনন্য জীবনপাঠ।
“সারাটা জীবন যেন ঋণ শোধ করার মতো করেই ভাইবোন সন্তানদের মানুষ করেছি। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার হাতে রইল শুধু শূন্যতা...”
আজকের সমাজে অসংখ্য দ্বায়িত্ববান ভাই বা মা-বাবার জীবনের শেষ অধ্যায়টি এভাবেই লেখা হয়। যে বা যাদের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, তাদের কাছ থেকেই একদিন অবহেলা, উপেক্ষা ও তিরস্কার সহ্য করতে হয়।
বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা তখন তাদের হৃদয়কে ভেঙে দেয় ঝড়ে উপড়ে পড়া মহীরুহের মতো।
জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, শ্রম ও ভালোবাসা সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করার পর যখন প্রতিদানে মেলে প্রত্যাখ্যান, তখন একজন সাধারণ মানুষের মন ভেঙে পড়া মোটেও বিস্ময়ের নয়।
কিন্তু আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শ্রাবস্তী নগরে বসবাসকারী এক মহীয়সী নারী এই ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়কে জয় করেছিলেন। তাঁর নাম বহুপুত্তিকা উপাসিকা যিনি পরবর্তীকালে বহুপুত্তিকা আরহন্তী থেরী নামে অমর হয়ে আছেন।
চৌদ্দজন সন্তান তাঁকে কার্যত ঘরছাড়া করেছিল। অথচ সেই অসহনীয় দুঃখকেই তিনি মুক্তির সোপানে পরিণত করেছিলেন।
মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বৌদ্ধধর্মের গভীর অন্তর্দৃষ্টি:-
বহুপুত্তিকা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিঃশব্দে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছিলেন—
“সমানভাবে সম্পদ বণ্টন করলেও মানুষের মন কখনো তৃপ্ত হয় না। কলুষে আচ্ছন্ন এই সংসারের স্বভাবই এমন। এটি আমার সন্তানদের ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি কিলেসে আবদ্ধ জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। আমি যদি ধর্ম না জানতাম, তবে তাদের এই আচরণে রাগ না করে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব হতো।”
বৌদ্ধধর্মে যাকে বলা হয় ‘যোনিসো মনসিকার’— প্রজ্ঞার আলোয় বিষয়কে গভীরভাবে অনুধাবন করা। তিনি ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে দেখেননি। “আমার সন্তানরা আমাকে কষ্ট দিয়েছে”— এই সীমাবদ্ধ চিন্তার পরিবর্তে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন— “কিলেসে আবদ্ধ জগতের মানুষ এমনই আচরণ করে।”
তিনি সন্তানদের দ্বারে দ্বারে ঘোরা বন্ধ করে ভিক্ষুণী সংঘে প্রবেশ করলেন। বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ শরীর হলেও হৃদয়ে তিনি কোনো বিদ্বেষ, ক্ষোভ বা প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখেননি। গভীর রাতে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কখনো স্তম্ভ, কখনো বৃক্ষ আঁকড়ে ধরে তিনি চঙ্ক্রমণ করতেন এবং নিরলসভাবে বিদর্শনা ভাবনা চর্চা করতেন।
তিনি বুঝেছিলেন— বাইরের জগতকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলা সম্ভব নয়, কিন্তু নিজের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করা সম্ভব।
একদিন সমস্ত সংস্কারের অনিত্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে করতে তিনি এমন এক অবস্থায় উপনীত হলেন, যখন ভগবান বুদ্ধ তাঁর প্রতি আলোকরশ্মি বিস্তার করে এই অমৃতবাণী উচ্চারণ করলেন—
যো চে বস্সসতং জীবে – অপস্সং ধম্মমুত্তমং
একাহং জীবিতং সেয়্যো – পস্সতো ধম্মমুত্তমং
(যে ব্যক্তি উত্তম লোকোত্তর ধর্ম উপলব্ধি না করে একশ বছর বেঁচে থাকে, তার চেয়ে শ্রেয় সেই ব্যক্তি, যে একদিন হলেও সেই মহৎ ধর্মকে প্রত্যক্ষ করে জীবনযাপন করে।)
তথ্যসূত্রঃ Isanka Nadeeshan
Post :- Buddha Gyan
সূত্র: খুদ্দক নিকায়, ধম্মপদট্ঠকথা, সাহস্স বর্গ (বহুপুত্তিকা থেরী বত্থু)।