16/11/2025
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান: সমাবেশের পর আবর্জনার স্তূপ, ক্ষোভ ও নাগরিক দায়িত্বের প্রশ্ন
ঢাকা, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫: ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আবারও খবরের শিরোনামে, তবে এবার কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির উত্তাপের জন্য নয়, বরং সমাবেশ পরবর্তী আবর্জনার স্তূপে ঢাকা পড়া এক ভিন্ন চিত্রের জন্য। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সভা-সমাবেশের পর উদ্যানের সবুজ ঘাস ঢেকে যায় পরিত্যক্ত পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, পলিথিন আর নানা রকম আবর্জনায়। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এটিকে ঢাকার ফুসফুসও বলা হয়। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে আসেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে দুদণ্ড শান্তি পেতে। তবে বড় কোনো জনসমাগমের পর উদ্যানের চেহারা যেন বদলে যায়। উদ্যানে আসা দর্শনার্থী এবং পরিবেশবাদীরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো বড় বড় সমাবেশ করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করলেও, সমাবেশস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিয়মিত দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা এখানে আসি একটু নির্মল বাতাসের জন্য। কিন্তু প্রায়ই দেখি, বড় কোনো সভা বা সমাবেশের পর পুরো উদ্যান ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। যারা দেশ শাসনের স্বপ্ন দেখেন, তাদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কাম্য নয়।"
পরিবেশবিদরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল বর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) একজন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো সমাবেশের পর উদ্যান পরিষ্কার করার দায়িত্ব তাদেরই পালন করতে হয়। তবে, আয়োজকদেরও নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, "আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি উদ্যানকে পরিচ্ছন্ন রাখতে। কিন্তু আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারী জনগণ সচেতন না হলে আমাদের একার পক্ষে এই বিশাল এলাকা সব সময় পরিষ্কার রাখা কঠিন।"
তবে সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক উদাহরণও তৈরি হয়েছে। কয়েকটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন তাদের কর্মসূচি শেষে নিজেদের স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে উদ্যান পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত এখনো সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। মাদকসেবীদের আনাগোনা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এর পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসন উদ্যানের নিরাপত্তা জোরদার করতে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ এবং രാത്രി ৮টার পর উদ্যানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। এসব পদক্ষেপের ফলে উদ্যানে মাদকাসক্তদের আনাগোনা কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে, রাজনৈতিক দলসহ সকল আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রতি পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা মনে করেন, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতাই পারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করতে। সভা-সমাবেশ যেমন রাজনৈতিক অধিকার, তেমনি স্থান পরিচ্ছন্ন রাখাও নাগরিক দায়িত্ব—এই বোধ জাগ্রত না হলে ঢাকার এই সবুজ হৃদয়কে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ছবি: রমনা পার্ক