10/05/2022
সরকার কর্মমুখী শিক্ষার জন্য সারা দেশে টেকনিক্যাল স্কুল কলেজ তৈরির কাজ শুরু করছেন। এর একটা বড় উদ্দেশ্য হল আন্তর্জাতিক শ্রমের বাজার ধরা। বিভিন্ন মানবিক বিপর্যয়ের দরুন বাংলাদেশ এখন বিদেশে গৃহকর্মী, সুইপার জাতীয় কাজে অনাগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। সম্মানজনক জীবিকার জন্য উন্নত দেশে প্রবেশের প্রথম শর্ত হল ইংরেজি। এটা এখন আর নিছক এক বিদেশী ভাষা নয় বরং একটা টেকনোলোজি যা অন্য যে কোন টেকনোলোজি এক্সপ্লোরের পাসওয়ার্ড।
ইংরেজি শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হলে এখনই স্কুল কলেজের ইংরেজি সিলেবাস ঢেলে সাজাতে হবে। আমার অভিমত হল, সিলেবাসগুলো IELTS ( International English Language Testing System), TOEIC বা TOEFL(Test of English as a Foreign Language) এর আদলে মডিফাই করা দরকার। এখনই ক্লাস সিক্স থেকে Listening, Reading, Spoken এবং Writing মডিউলগুলো যুক্ত করা যেতে পারে। স্কুল লেভেলের শুরুতে এখনই Academic Module দরকার নেই বরং General Training দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। নতুন বই না ছাপিয়ে আপাততঃ বাজারে প্রচলিত Cambridge IELTS এর তেরটা বই ব্যবহার করা যেতে পারে। বইগুলো ভলিউমের উৎকর্ষতার সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে কঠিনতর হয়েছে। ক্লাস সিক্সে ভলিউম ১, ক্লাস সেভেনে ভলিউম ২, এভাবে নাইন টেনে আর একাদশ দ্বাদশ শ্রেণিতে দুইটা/তিনটা করে ভলিউম পড়ানো যেতে পারে। পরের দিকে উঁচু ক্লাসে Academic মডিউল চালু করা যায়। এক্ষেত্রে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন Listening এর জন্য হেডফোন বা অডিও প্লেয়ার দরকার। এগুলো সব জায়গায় আপাততঃ ম্যানেজ করা অনেক টাকার ব্যাপার। তাই এখন গরীবের জন্য জেনারেল লিস্নিং সম্বল হতে পারে। অর্থাৎ একটা ক্লাসরুমে একটা স্পীকার রেখে তাতে সবার জন্য অডিও বাজানো। অডিওটা শিক্ষক মহাশয় মোবাইল হ্যান্ডসেট থেকে প্লে করতে পারেন। পরিক্ষাও এভাবেই নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটা পরীক্ষা হবে মৌলিক, ঠিক IELTS এর মতই। এখনই সব ক্লাসে এটা চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে। হতে পারে, আমরা আগামী বছর ক্লাস সিক্সে এটা চালু করলাম। তার পরের বছর ক্লাস সিক্স আর সেভেনে। তার পরের বছর সিক্স, সেভেন আর এইট। এভাবে ৫/৬ বছরে সব ক্লাসে এটা চালু করা যেতে পারে। এটা করার একটা কারণ হল অভিজ্ঞতার সম্মুখায়ন, অর্থাৎ ক্লাস সিক্সে ভলিউম ১ পড়া স্টূডেন্ট ক্লাস সেভেনে গিয়ে ভলিউম ২ পড়বে। এখনই হঠাৎ কলেজের ছেলে মেয়েদের ভলিউম ১২/১৩ দিলে হজম নাও হতে পারে। তাই নিচু ক্লাস থেকেই শুরু করা দরকার। এভাবে এই স্কিল অর্জনে ধারাবাহিক উন্নয়নের একটা অত্যন্ত সলিড পথরেখা সৃষ্টি হবে।
এই বয়স থেকেই এভাবে IELTS সম্পর্কে এভাবে ধারণা পেলে এবং ওতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমার বিশ্বাস বাঙালিদের অন্ততঃ ১০% পরীক্ষার্থী কলেজ পাসের পর আসল IELTS পরিক্ষায় মিনিমাম 7 স্কোর করে ফেলবে। আর ২০% ৬.৫ এবং আরও ৩০% ৬ পেয়ে যাবে। এরা সামান্য ট্রেনিং নিলেই উন্নত বিশ্বে নার্সিং, টেকনিশয়ান, মেকানিক, ইলেক্ট্রিশিয়ান, ইত্যাদি জবে প্রবেশে আপারহ্যান্ডও পেয়ে যাবে খুব দ্রুত। আমাদের আর গৃহকর্মী, সুইপারের পদে চাকরির জন্য লাইন ধরতে হবে না, অপমান হতে হবে না ওই সব তথাকথিত ভদ্র দেশের অত্যাচারী পিশাচদের হাতে।
আমি দেখেছি, বিদেশী ভাষাটা রপ্ত করতে হলে ছোটবেলাই বেসিক তৈরির বেস্ট সময়। পরবর্তী সময়ে এটা কারও মাঝে ভালভাবে ডিফিউজ করা খুবই শক্ত। আমি নিশ্চিত আমরা ইংরেজিতে উন্নতি না করতে পারলে ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন সব দেশের সাথে উন্নতবিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রতিযোগিতায় পেরে উঠব না।
সরকার যদি এখনই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নিতে পারে, তাহলে অভিভাবকরা এটা চালু করতে পারেন নিজ নিজ বাসায়। বিভিন্ন স্কুল কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে এটা শুরু করতে পারেন স্কুলে স্কুলে, কলেজে কলেজে। আমি গ্যারান্টি দিতে পারি, ওই সব প্রতিষ্ঠানের স্টুডেন্টরা পরে সকল কর্মক্ষেত্রে উন্নততর পারফর্মম্যান্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মুখ উজ্জ্বল করবেই। মাননীয় সংসদ সদস্যগণ নিজ নিজ এলাকায় প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই কর্মসূচি শুরু করতে পারেন এখনই। আমি মনে করি, এটা আমাদের শিক্ষার্থীদের দেবে এক অনন্য আত্মবিশ্বাস, নিজেদের অনেক স্মার্ট মনে হবে, যার ফলে আধুনিক বিশ্বে আর নিজেদের অপাংক্তেয় মনে হবে না। মোটিভেশনের এক জাতীয় বাত্যায় ঝংকৃত হবে সারা জাতি। আমি গ্যারান্টি দিতে পারি, এর একটা দুরন্ত পজিটিভ এক্সটার্নালিটি হবে, দেশের জিডিপি গ্রোথ রেইট অচিরেই খুব দ্রুত বেড়ে যাবে আশাতীত হারে। কার্যকর ইংরেজি শিক্ষার একটা মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট আছে। এর সুমিষ্ট ফল মিলবেই, নানা দিক দিয়ে।
একটা আইডিয়া জেনারেশন হল ৫%। আর বাস্তবায়ন ৯৫%। দেশবাসী না জেগে উঠলে এসব আইডিয়ার কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন মুশকিল। সামনের দিন আসছে খুবই চ্যালেঞ্জিং, বিভিন্ন যোগ্যতা অর্জন ব্যতীত মানসম্মান নিয়ে মানবিকভাবে নিষ্ঠুর স্বার্থপর দুনিয়ায় টিকে থাকাই মুশকিল। এই বিষয়টা বুঝতে হবে সকলকে। মনপ্রানে কামনা করি, আমাদের প্রতিটা তরুণ প্রাণ তারুণ্যের অপরিমেয় শক্তিতে আন্দোলিত হোক, জেগে উঠুক আমার প্রাণের বাংলাদেশ। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জাগছে, জাতি হিসেবে আমাদের ঘুম ভাঙছে, আর ঝিমিয়ে পড়ব না, সজাগ হয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাব সবাই মিলে, হাতে হাত ধরে।
লেখকঃ
মোহাম্মদ তালুত
সিনিয়র সহকারী সচিব
যুক্তরাজ্যে পিএইচডিরত
(কপি করা হয়েছে)