15/01/2026
*"নিপা ভাইরাস সংক্রমণ"* 🦇
*প্রতিরোধ করবেন কিভাবে ?*
'Nipah virus infection'
How to prevent ?
সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে 'নিপা ভাইরাস' (NiV) সংক্রমনের ঘটনায় অনেকেই চিন্তিত ও বিভ্রান্ত। পূর্ব বর্ধমান ও নদীয়ার বাসিন্দা বারাসাতের বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরতা ২জন স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমানে আক্রান্ত, সংকটজনক এবং চিকিৎসাধীন। গত ১১ ই জানুয়ারি কল্যাণীর এইমস (AIIMS)-এ আই.সি.এম.আর (ICMR)-এর ভাইরাস রিসার্চ এন্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি (VDRL)-এ সংক্রমিত ব্যক্তিদের নমুনা থেকে 'নিপা ভাইরাস' চিহ্নিত করা হয়। ইতিমধ্যে যারা রোগীর সংস্পর্শে এসেছে, খুঁজে বার করে তাদেরও 'কন্টাক্ট টেস্টিং' চলছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য উভয় সরকারিস্তরে যৌথভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলায় অত্যন্ত সক্রিয়। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি, এইমস এবং বন্যপ্রাণী বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি 'জাতীয় যৌথ প্রাদুর্ভাব প্রতিক্রিয়া দল' সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দ্রুত পৌঁছে গেছে। সংকট মোকাবিলায় 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিভ প্রটোকল (SOP) তৈরি করা হয়েছে। রাজ্যে স্বাস্থ্য দপ্তর সব রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। চালু হয়েছে হেল্পলাইন --
(033) 2333 0180, 9836046212, 9874708858
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO)-র মতে ভাইরাস (Henipavirus)টি প্রাণী বাহিত (জুনোটিক) ও প্রাণঘাতী। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট (IHR NFP) বাংলাদেশের বরিশাল, ঢাকা এবং রাজশাহী জেলা থেকে নিপা ভাইরাস (NiV) সংক্রমণ নিশ্চিত করে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে এই ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনায় গভীরভাবে উৎস (Source) অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে। বাদুড় যেহেতু সহজেই ভৌগোলিক অঞ্চল অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
*রোগ ছড়ায় কিভাবে ?*
How disease spread ?
ফলাহারি বাদুড় (Fruit bats) প্রধানত নিপা ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক (Natural reservoir)। তাদের লালা, মল-মূত্র ইত্যাদির দ্বারা খাদ্য (ফল ইত্যাদি) এবং জলের উৎসকে দূষিত করতে পারে। সেই দূষিত খাদ্য (কাঁচা খেজুরের রস, ফল ইত্যাদি) খেলে সংক্রমণ সম্ভাবনা থাকে। শূকর (Pig) হলো পরিবর্ধক হোস্ট (amplifying host), যার থেকেও মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংক্রমিত মানুষের দেহ নির্যাস, হাঁচি-কাশি ইত্যাদি থেকেও অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।
এখনো পর্যন্ত আক্রান্ত দেশগুলির মধ্যে আছে --
বাংলাদেশ, ভারত (বিশেষত কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ), চিন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, কম্বোডিয়া,থাইল্যান্ডে, ফিলিপাইন ইত্যাদি।
*লক্ষণগুলি কি কি ?*
What are the symptoms?
সাধারণত সংস্পর্শে আসার ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গবিহীন অবস্থা থেকে মারাত্মক লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে পারে। যেমন -- জ্বর, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, পেশীতে ব্যথা, ফ্লু-র মত লক্ষণ, ক্রমে তীব্র শ্বাসকষ্ট, বমি, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), বিভ্রান্তি, খিচুনি, কোমা এবং মৃত্যুহার ৪০% থেকে ৮২% প্রায় ।
*রোগ নির্ণয় কিভাবে ?*
How diagnose the disease?
সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য নাক বা গলার সোয়াব, রক্ত, প্রস্রাব, সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড থেকে ভাইরাসের আর.এন.এ (RNA) সনাক্তকরণের জন্য রিয়েল-টাইম পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (RT-PCR), অ্যান্টিবডি (IgM/IgG) সনাক্তকরণের এনজাইম-লিঙ্কড ইমিউনোসর্বেন্ট অ্যাসে (ELISA), ভাইরাস পৃথকীকরণ (Virus isolation) ইত্যাদি নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরিতে বায়োসেফটি পদ্ধতি মেনে করা হয়ে থাকে।
*চিকিৎসা কি ?*
What is the treatment?
নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। রোগাক্রান্তদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে সহযোগী চিকিৎসার সহায়তা দিতে হবে।
অ্যান্টিভাইডাল ওষুধগুলির মধ্যে 'রিবাভিরিন' (Ribavirin) অনেকটাই কার্যকারিতা হারিয়েছে। রেমডেসিভির (Remdesivir), গ্রিফিথ্সিন (Griffithsin) , ফ্যাভিপিরাভির (Favipiravir) ইত্যাদি ক্লিনিকল ট্রায়ালের পর বাজারে আসতে চলেছে।
*প্রতিরোধের উপায় কি ?*
How to prevent ?
প্রতিষেধক (Vaccine)-এর জন্য বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। এখনো পর্যন্ত সেই রকম কার্যকরি টিকা বাজারে আসেনি।
এই রোগে যেহেতু এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকরী ওষুধ বা টিকা নেই। রোগ প্রতিরোধের জন্য সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতাই সবার আগে। কোনরকম আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বসহকারে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে।
*কি কি করবেন ?*
What to do ?
• আতঙ্কে নয়, সচেতন থাকুন। গুজব ছড়াবেন না। কোন অবহেলা না করে উল্লেখিত উপসর্গগুলি দেখামাত্রই নিকটবর্তী চিকিৎসক / স্বাস্থ্য কেন্দ্র / হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
• সন্দেহজনক রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা (আইসোলেসন) রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
• পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত সাবান-জল দিয়ে হাত ধোয়া বজায় রাখুন।
• রোগীদের অবশ্যই আলাদা (আইসোলেশন) ওয়ার্ডে রাখতে হবে এবং সম্ভাব্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
• স্বাস্থ্যকর্মীরা পি.পি.ই কিট (PPE Kit) ব্যবহার করুন।
• নমুনা সংগ্রহকালীন বায়োসেফটি নিয়ম মেনে চলা বাঞ্ছনীয়।
• সরাসরি রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করুন।
• হাঁচি-কাশির সময় নাক - মুখ ঢেকে রাখুন।
• সন্দেহজন প্রাণী বিশেষত বাদুড় বাদুড়, শুকর ইত্যাদি প্রাণীর সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
• খেজুরের রস সংগ্রহে ঢাকনাযুক্ত পাত্র ব্যবহার করুন। অক্ষত ও পরিচ্ছন্ন ফল ভালোভাবে নুন জলে ধুয়ে তবেই গ্রহণ করুন।
• স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা সঠিকভাবে মেনে চলুন এবং অন্যকেও মেনে চলতে উৎসাহিত করুন।
• প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জৈব সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখা। প্রাণী অসুস্থতা বা মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলেই নিকটবর্তী সরকারী প্রাণী চিকিৎসক / প্রাণী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক।
• এক স্বাস্থ্য' (ওয়ান হেল্থ) নীতি মেনে প্রতি জেলায় মানুষ, শুকর , ফলাহারী বাদুড়ে নিপার উপস্থিতি ধরতে চালাতে হবে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম (সার্ভেইলেন্স প্রোগ্রাম)-এ সহায়তা করুন।
*কি কি করবেন না ?*
What not to do ?
• কাঁচা খেজুরের রস সরাসরি পান করবেন না।
• ফল, খাদ্য, পানীয় ইত্যাদি খোলা জায়গায় রাখবেন না।
• অসুস্থ ব্যক্তি বা সন্দেহজনক প্রাণীর সংস্পর্শে সরাসরি যাবেন না।
• বাদুড়, কাঠবিড়ালি বা অন্য প্রাণীর খাওয়া বা আধ-খাওয়া কিংবা গাছ থেকে মাটিতে পড়ে থাকা ফল কখনোই খাবেন না। অন্য প্রাণীদেরও দেবেন না।
• কখনো কেউ আক্রান্ত মনে হলে বা সন্দেহ হলে রোগ কখনোই লুকিয়ে রাখবেন না।
• রোগাক্রান্ত হলে কখনোই বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করার চেষ্টায় বিপদ ডাকবেন না।
• সন্দেহজনক রোগ সংক্রমণ দেখায় যাওয়া মাত্রই নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বিলম্ব করবেন না।
• স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা অমান্য করবেন না।
• অহেতুক ভয় পাবেন না বা ভয় দেখাবেন না। কোনভাবেই আতঙ্ক বা গুজব ছড়াবেন না। নিজের সচেতন থাকুন এবং অন্যদের সচেতন করুন।
©️ স্বাস্থ্য বিশ্ব ওয়ান হেল্থ 🌍
(Swasthya Biswa One Health)
*জনস্বার্থে প্রচারিত (১৩/০১/২০২৬)