19/01/2026
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ), ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, নিজেকে অর্ধ পৃথিবীর আমীর বা রাজা মনে করতেন না; বরং তিনি নিজেকে প্রজার 'দায়িত্বপ্রাপ্ত রাখাল' হিসেবে ভাবতেন। তাঁর এই দায়িত্ববোধই তাঁকে রাতের অন্ধকারে মদিনার পথে পথে ঘুরতে বাধ্য করত।
এক গভীর রাতে, চাঁদের আলোয় মদিনার পথ ধরে উমর (রাঃ) তাঁর সঙ্গীসহ (আসলাম বা আবদুর রহমান ইবন আউফ রা.) শহরের বাইরে একটি উপত্যকার দিকে যাচ্ছিলেন। দূর থেকে তিনি বাচ্চাদের কান্না শুনতে পেলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন, একটি ছোট্ট তাঁবু। ভিতরে এক মহিলা আর তাঁর কয়েকটি বাচ্চা।
বাচ্চারা পেটে হাত দিয়ে কাঁদছে: “মা, খাবার! খাবার!”
মা বারবার বলছেন: “ঘুমাও বাবা, এখনই রান্না হয়ে যাবে।”
কিন্তু হাঁড়িতে কিছুই নেই—শুধু পানি আর কয়েকটি পাথর। মা পাথর গরম করে বাচ্চাদের মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছেন যে, খিচুড়ি হচ্ছে, যেন তারা অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ে।
উমর (রাঃ) দূর থেকে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখলেন। তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি এগিয়ে গিয়ে মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমার বাচ্চারা কেন কাঁদছে?”
মহিলা চিনতে পারেননি যে খলিফা এসেছেন। রাগে-দুঃখে তিনি বললেন: “আমার স্বামী মারা গেছে। ঘরে খাবার নেই। উমর কোথায়? সে কি জানে না তার প্রজারা না খেয়ে মরছে? আল্লাহ তার হিসাব নেবেন!”
এই কথা শুনে উমর (রাঃ) আর এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি দ্রুত সঙ্গীকে নিয়ে মদিনায় ফিরলেন। বায়তুল মালের গুদামে গিয়ে উমর (রাঃ) নিজের হাতে এক বস্তা আটা, এক বোয়াম ঘি, খেজুর, মাংস—যা পাওয়া গেল সব তুলে নিলেন। তারপর সেই বিশাল বস্তাটি তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।
সঙ্গী বললেন: “আমিরুল মুমিনিন! আমাকে দিন, আমি বয়ে নিয়ে যাব। আপনি খলিফা।”
উমর (রাঃ) গম্ভীর কণ্ঠে বললেন:
“তুমি আমার এই বোঝা বইতে পারো, কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, ‘আমার বান্দারা না খেয়ে কাঁদছিল, তুমি কী করেছিলে?’—তখন আমার গুনাহর বোঝা কে বইবে?”
তাঁরা জিনিসপত্র নিয়ে আবার সেই তাঁবুতে পৌঁছালেন। উমর (রাঃ) নিজে হাঁড়ি চড়ালেন, আগুন জ্বালালেন, নিজের হাতে রুটি বানালেন এবং মাংস রান্না করলেন। বাচ্চাদের হাতে খাবার তুলে দিলেন।
কিছুক্ষণ আগেও যে বাচ্চারা ক্ষুধায় কাঁদছিল, এখন তাদের মুখে হাসি। পেট ভরে খেয়ে তারা খেলা শুরু করল। মায়ের চোখেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার পানি।
কিন্তু উমর (রাঃ) হাসছিলেন না। তিনি চুপ করে বসে ছিলেন, চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সঙ্গী জিজ্ঞেস করলেন: “আমিরুল মুমিনিন, বাচ্চারা তো হাসছে, আপনি কাঁদছেন কেন?”
উমর (রাঃ) ধরা গলায় বললেন: “আজ যদি আমি এদের কান্না না শুনতাম, যদি এই রাতে ঘুমিয়ে থাকতাম, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করতেন, ‘আমার এই ক্ষুধার্ত বান্দী আর তার সন্তানদের জন্য তুমি কী করেছিলে?’—আমি কী জবাব দিতাম?”
সেই রাতে খলিফা উমর (রাঃ) বাড়ি ফিরলেন অনেক রাতে, কিন্তু তাঁর মন শান্তি পেয়েছিল। কারণ তিনি জানতেন—নেতা মানে ক্ষমতার মালিক নয়, নেতা মানে দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নেওয়া মানুষ।
এই গল্প শুধু উমর (রাঃ)-এর নয়, এ গল্প প্রতিটি দায়িত্বশীল মানুষের জন্য। যারা ক্ষমতায় থেকেও নিজেকে 'খাদেম' (সেবক) মনে করে, তারাই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।