13/09/2026
মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যাবল পাচার, চালিয়াতলীতে লুটের অভিযোগ
জব্দ করা মালামালও সরিয়ে নেওয়ার দাবি, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন; স্ক্র্যাপ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে পাচারের সময় আটক হওয়া বিপুল পরিমাণ দামী বৈদ্যুতিক ক্যাবল (তার) চালিয়াতলী এলাকায় প্রকাশ্যে লুটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি জব্দ অবস্থায় থাকা মালামালের একটি অংশ পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে একটি গাড়িতে করে বিপুল পরিমাণ ক্যাবল পাচারের সময় চালিয়াতলী এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়দের নজরে আসে। পরে মালামালসহ গাড়িটি আটক করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।
জব্দ করা গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ ১২-১৯০১।
পুলিশের উপস্থিতিতেই ক্যাবাল সরানোর অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থাতেই একপর্যায়ে কয়েকজন লোক গাড়ি থেকে ক্যাবল নামিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে। কেউ কাঁধে করে, কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এবং কেউ আশপাশের দোকানে এসব ক্যাবল সরিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ সময় ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জব্দ করা সরকারি প্রকল্পের মালামাল নিরাপদ হেফাজতে নেওয়ার পরিবর্তে কীভাবে সেগুলো প্রকাশ্যে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীর দোকানের সামনে জব্দ, পরে মালামাল সরানোর অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চালিয়াতলী এলাকার স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী লিয়াকতের দোকানের সামনে পাচারকৃত ক্যাবলগুলো জব্দ অবস্থায় ছিল। পরে এসব মালামালের একটি অংশ সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, লিয়াকত দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প এলাকার স্ক্র্যাপ ও পরিত্যক্ত মালামালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাকে ঘিরে প্রকল্পের মালামাল চুরি, পাচার ও অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ‘গডফাদার’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে লিয়াকতের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জব্দ করা ক্যাবলগুলো নিরাপদ হেফাজতে নেওয়ার পরিবর্তে ঘটনাস্থলেই রাখা হয়েছিল। পরে লিয়াকত ও তার সহযোগীদের মাধ্যমে জব্দকৃত মালামালের একটি অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন—পুলিশের উপস্থিতিতে জব্দ হওয়া সরকারি প্রকল্পের মালামাল কীভাবে পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো এবং কার সহযোগিতা বা অবহেলায় তা সম্ভব হলো?
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও মালামাল উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে বিপুল পরিমাণ ক্যাবল সরিয়ে নেওয়া হলেও পুলিশ মূলত পাচারে ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু গাড়ি জব্দ করলেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে না। পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, মালামাল গ্রহণকারী, লুটে অংশ নেওয়া ব্যক্তি এবং জব্দের পর মালামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা শনাক্ত করতে হবে।
প্রকল্পের বিভিন্ন সাইট থেকে মালামাল সরানোর অভিযোগ
এদিকে মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন সাব-কনট্রাক্টর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজ শেষে কিংবা বিভিন্ন সুযোগে প্রকল্পের মালামাল বাইরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন সাইটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা Scrap ও অন্যান্য মালামাল যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করায় চুরি বা অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে পসকো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন সাইটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের মালামাল চুরি কিংবা বিভিন্ন কৌশলে বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এভাবে প্রকল্পের মালামাল বেহাত হলে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
টেন্ডারের মালামাল সময়মতো বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের এক ঠিকাদার জানান, তিনি প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা জমা দেওয়ার পরও চার মাস অতিবাহিত হলেও টেন্ডারে থাকা Scrap Cable-এর অর্ধেক মালামাল এখনো বুঝে পাননি।
ওই ঠিকাদারের দাবি, টেন্ডারে থাকা মালামালের একটি বড় অংশ এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। টেন্ডার হওয়ার পর বিভিন্ন নিয়মনীতি ও আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে মালামাল বুঝে দেওয়া সম্ভব হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় মালামাল পড়ে থাকায় চোরেরা সুযোগ পেয়েছে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত মালামাল বুঝিয়ে দিলে এ ধরনের চুরি অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
ওসি আব্দুস সুলতান: প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা
চালিয়াতলীতে ক্যাবল পাচার, জব্দ করা মালামাল সরিয়ে নেওয়া এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মো. আব্দুস সুলতান বলেন, ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ক্যাবল পাচার, লুট কিংবা জব্দ করা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্রুত তদন্ত ও মালামাল উদ্ধারের দাবি
স্থানীয়দের মতে, চালিয়াতলীতে ক্যাবল লুটের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, নাকি প্রকল্পের বিভিন্ন সাইট থেকে দীর্ঘদিন ধরে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সংঘবদ্ধ কোনো চক্র জড়িত—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
তারা প্রকল্পের মালামাল পাচার, জব্দের পর তা সরিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীর কাছে এসব মালামাল যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে চালিয়াতলী থেকে সরিয়ে নেওয়া ক্যাবল দ্রুত উদ্ধার, পাচার ও লুটের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং প্রকল্পের বিভিন্ন সাইটে থাকা মালামালের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মালামালও পর্যায়ক্রমে চুরি বা পাচার হয়ে যেতে পারে। এতে প্রকল্প ও সরকার উভয়ই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তবে ক্যাবল পাচার, লুট, জব্দ মালামাল সরিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী লিয়াকতের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।