24/08/2026
প্রাপককে পাওয়া যায়নি
পঁচিশ বছর ধরে আমি কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করি।
চিঠি, পার্সেল, কাগজপত্র, নোটিশ—যা আসে, মানুষের দরজায় পৌঁছে দিই। আগে চিঠি বেশি আসত। এখন আসে ব্যাংকের কাগজ, চাকরির কাগজ, আদালতের নোটিশ আর অনলাইন অর্ডারের বাক্স।
আমার নাম কামাল।
ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, হাজারীবাগ—এই এলাকাগুলোই আমার রুট। প্রতিদিন একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘুরি। বৃষ্টি হলে ভিজি, রোদ হলে পুড়ি, শীতে কাঁপি। কাজটা খুব একটা ভালো লাগে না। তবু ছাড়িনি।
আমাদের অফিসে একটা নিয়ম আছে।
ঠিকানা ভুল হলে তিনবার চেষ্টা করতে হয়। তারপর খামের ওপর লিখতে হয়—
“প্রাপককে পাওয়া যায়নি।”
এই তিনটা শব্দ আমি জীবনে অসংখ্যবার লিখেছি।
কিন্তু একদিন একটা খামের ওপর এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে আমার হাত থেমে গেল।
খামের ওপর লেখা—
প্রেরক: আবদুল হালিম
প্রাপক: রাশেদ হালিম
ঠিকানা: ১৭/বি, লালমাটিয়া, ঢাকা
নিচে ছোট করে লেখা—জরুরি। ব্যক্তিগত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রেরক আর প্রাপকের ঠিকানা একই।
মানে, একজন বাবা নিজের বাড়ির ঠিকানাতেই ছেলের নামে চিঠি পাঠিয়েছেন।
আমি ঠিকানায় গেলাম।
১৭ নম্বর বাড়ি আছে।
১৭/এ আছে।
১৭/সি আছে।
কিন্তু ১৭/বি নেই।
পাশের দোকানের লোককে জিজ্ঞেস করলাম।
লোকটা বলল,
—আগে ছিল।
—এখন?
—ভেঙে ফ্ল্যাট হয়েছে।
—হালিম সাহেব?
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।
—চিনি না।
পাশের চায়ের দোকানে গেলাম।
চা-ওয়ালা বলল,
—আবদুল হালিম নামে একজন ছিলেন।
—কোথায় গেছেন?
—মারা গেছেন।
—কবে?
—অনেক বছর আগে।
আমি অফিসে ফিরে খামের ওপর “প্রাপককে পাওয়া যায়নি” লিখে জমা দিতে পারতাম।
দিইনি।
পরদিন আবার গেলাম।
১৭ নম্বর বাড়ির পুরোনো দারোয়ানকে পেলাম। নাম গফুর। বয়স অনেক।
আমি খামের নামটা বলতেই লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি আবদুল হালিম সাহেবের ছেলের লোক?
—না। কুরিয়ার।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—আবদুল হালিম সাহেব তো নাই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—তার ছেলে কোথায়?
—বিদেশে।
—কোন দেশে?
—কানাডা।
—যোগাযোগ নেই?
—না।
—কেন?
লোকটা বলল,
—বাপ-ছেলের ঝামেলা।
বাংলাদেশের মানুষের খুব প্রিয় একটা ব্যাখ্যা আছে—“ঝামেলা ছিল।”
সবকিছুর ব্যাখ্যা যেন এই দুই শব্দেই শেষ হয়ে যায়।
আমি বললাম,
—কী ঝামেলা?
—সেইটা আমি জানি না।
একটু থেমে সে বলল,
—তবে শেষের দিকে আবদুল হালিম সাহেব প্রতিদিন বিকেলে গেটের সামনে বসে থাকতেন।
—কেন?
—ছেলের জন্য।
—ছেলে আসত?
লোকটা মাথা নাড়ল।
—না।
আমি চুপ করে গেলাম।
কানাডায় ছেলেটার নাম ছিল রাশেদ হালিম।
ফেসবুকে খুঁজলাম। পেলাম না। পরে লিংকডইনে একজনকে পেলাম। নাম মিলে যায়। ঢাকায় জন্ম, কানাডায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বয়সও মিলে।
প্রোফাইলের ছবিতে হাসিখুশি একজন মানুষ। পাশে স্ত্রী, দুই সন্তান। বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি।
ক্যাপশনে লেখা—
“Home is where your people are.”
কথাটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।
মানুষ কত সহজে ইংরেজিতে এমন কথা লিখে ফেলে!
নিজের ভাষায় বলতে গেলে বুক কাঁপে।
আমি তাকে মেসেজ পাঠালাম—
“আপনার নামে একটা চিঠি এসেছে।”
কোনো উত্তর নেই।
দুই দিন পর উত্তর এল—
“Who are you?”
আমি বললাম,
“আমি কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করি। আপনার বাবা একটা চিঠি পোস্ট করেছেন।”
সে লিখল,
“My father died years ago.”
আমি বললাম,
“চিঠিটা আপনার জন্যই।”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর এল—
“Don't contact me again.”
আমি চুপ করে গেলাম।
চিঠিটা আমার ড্রয়ারে রয়ে গেল।
এক সপ্তাহ।
দুই সপ্তাহ।
এক মাস।
আমি চিঠিটা অফিসে জমা দিইনি।
একদিন সন্ধ্যায় রাশেদের মেসেজ এল—
“What does the letter say?”
আমি বললাম,
“আমি খুলি নাই।”
সে লিখল,
“Can you send me a picture?”
আমি খামের ছবি পাঠালাম।
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর—
“That's my father's handwriting.”
আমি বললাম,
“আপনি চিঠিটা চান?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এল—
“Yes.”
আমি বললাম,
“ঠিকানা দেন।”
সে ঠিকানা দিল।
সেদিনই চিঠিটা পাঠিয়ে দিলাম।
ভাবলাম, এবার আমার দায়িত্ব শেষ।
তিন দিন পর বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এল।
—আপনি কামাল?
—জি।
—আমি রাশেদ।
—জি।
—চিঠিটা পেয়েছি।
আমি চুপ করে রইলাম।
সে বলল,
—আপনি কি জানেন, আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষবার আমাকে কী বলেছিলেন?
—না।
—বলেছিলেন, “তুই যদি কোনোদিন ফিরে আসিস, আমার কাছে আসিস না।”
আমি কিছু বললাম না।
সে বলল,
—আমি আর ফিরিনি।
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সে বলল,
—চিঠিতে কী ছিল জানেন?
—না।
সে হালকা হাসল।
—আমার বাবা কখনো কাউকে চিঠি লিখতেন না।
আমি অবাক হলাম।
বললাম,
—কিন্তু এটা তো আপনার বাবার হাতের লেখা।
—হ্যাঁ।
—তাহলে?
সে বলল,
—তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু পাঠাননি।
আমি বুঝলাম না।
রাশেদ বলল,
—চিঠিটা তিনি নিজের আলমারিতে রেখে গিয়েছিলেন। বাড়ি বিক্রি করার পর নতুন মালিক পুরোনো আলমারের কাগজপত্রের মধ্যে খামটা পান। হয়তো ভেবেছিলেন চিঠিটা পোস্ট করা হয়নি। তাই ডাকবাক্সে ফেলে দিয়েছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—চিঠিতে কী ছিল?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—একটা মাত্র বাক্য।
—কী?
সে বলল,
“আমি ভুল করেছিলাম।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—এইটুকু?
—হ্যাঁ।
—আর কিছু?
—না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?
ওপাশ থেকে কান্না থামানোর চেষ্টা করে রাশেদ বলল,
“আমি ভেবেছিলাম, বাবারা কখনো ভুল করে না।”
কথাটা শুনে আমার নিজের বাবার কথা মনে পড়ল।
আমার বাবা ছিলেন রাগী মানুষ।
আমি ছোটবেলায় একবার স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। বাবা জানতে পেরে আমাকে খুব মেরেছিলেন।
আমি রাগ করে ঠিক করেছিলাম, কোনোদিন বাবার সঙ্গে কথা বলব না।
দুদিন পরই বাবা মারা গেলেন।
আমার রাগটা রয়ে গেল।
বাবা রইলেন না।
মানুষের রাগেরও একটা সমস্যা আছে—যার ওপর রাগ করা হয়, সে না থাকলেও রাগটা থেকে যায়।
তারপর একদিন সেই রাগের কোনো ঠিকানা থাকে না।
রাশেদ হঠাৎ বলল,
—কামাল ভাই?
—জি?
—আপনি কি একটা কাজ করবেন?
—কী?
—আমার বাবার কবরটা খুঁজে দিতে পারবেন?
—পারব।
—কেন জানি না, আমি যেতে চাই।
—আসবেন?
—হ্যাঁ।
তিন মাস পর রাশেদ ঢাকায় এল।
একদিন সে আমাকে ফোন করল।
—কামাল ভাই, আমি ঢাকায়।
—কোথায়?
—পুরোনো বাসার সামনে।
আমি গেলাম।
গাড়ি থেকে নামার পর প্রথমে তাকে চিনতেই পারিনি।
ছবির মানুষ আর বাস্তবের মানুষ—এক হয় না।
সে আমাকে দেখে বলল,
—আপনিই কামাল?
—জি।
সে হাত বাড়িয়ে দিল।
আমি হাত ধরলাম।
তার হাত কাঁপছিল।
আমরা একসঙ্গে কবরস্থানে গেলাম।
তার বাবার কবর খুঁজে পেলাম।
রাশেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
কোনো দোয়া পড়ল না।
কিছু বলল না।
শুধু মাটির ওপর হাত রাখল।
অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে বলল,
“বাবা, আমি এসেছি।”
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সে আবার বলল,
“তুমি বলেছিলে, আসিস না।”
চুপ।
“আমি আসিনি।”
চুপ।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“তুমি ভুল করেছিলে।”
আবার নীরবতা।
“আমিও ভুল করেছিলাম, বাবা।”
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।
দূরে সরে গেলাম।
মানুষের কিছু কথার সাক্ষী হওয়া উচিত নয়।
কিছু কথা মৃত মানুষ আর জীবিত মানুষের মাঝেই থাকা ভালো।
ফেরার সময় রাশেদ বলল,
—কামাল ভাই, আপনি না থাকলে আমি আসতাম না।
আমি হেসে বললাম,
—আমি তো শুধু চিঠি পৌঁছাইছি।
সে মাথা নাড়ল।
—না।
—তাহলে?
সে বলল,
“আপনি আমার কাছে একটা ঠিকানা পৌঁছে দিয়েছেন।”
আমি বললাম,
—কবরের ঠিকানা?
সে মাথা নাড়ল।
—না।
—তাহলে?
সে বলল,
“বাবার কাছে যাওয়ার ঠিকানা।”
আমি কিছু বললাম না।
অফিসে ফিরে সেদিনই আমার ছেলেকে ফোন করলাম।
সে ধরল না।
আবার করলাম।
এবার ধরল।
—কী হয়েছে?
আমি বললাম,
—কিছু না।
—তাহলে ফোন করছ কেন?
আমি বললাম,
—তুই কেমন আছিস?
সে বলল,
—ভালো।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম,
—তোর সঙ্গে আমার কোনোদিন খুব বেশি রাগারাগি হয়েছে?
ওপাশে সে হেসে বলল,
—আপনার তো প্রতিদিনই রাগারাগি হয়!
আমি বললাম,
—আমি যদি কোনোদিন ভুল করে থাকি?
সে চুপ করে গেল।
আমি বললাম,
—তাহলে আমাকে বলিস।
—কেন?
—যাতে আমি ঠিক করতে পারি।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,
—আব্বা, আপনি ঠিক আছেন তো?
—হ্যাঁ।
—কিছু খাইছেন?
—না।
—খেয়ে ঘুমান।
ফোন কেটে গেল।
আমি অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ড্রয়ার খুললাম।
রাশেদের বাবার চিঠির একটা ফটোকপি সেখানে রেখেছিলাম।
মাত্র এক লাইন—
“আমি ভুল করেছিলাম।”
কাগজটা হাতে নিয়ে ভাবলাম—
মানুষ পৃথিবীতে কত কিছু লেখে।
উপন্যাস।
কবিতা।
ইতিহাস।
আইন।
প্রেমপত্র।
ক্ষমাপত্র।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন চিঠিটা হয়তো এই তিনটা শব্দের—
“আমি ভুল করেছিলাম।”
এই তিনটা শব্দ বলতে একজন বাবার পঁচাত্তর বছর লাগে।
একজন ছেলের ত্রিশ বছর।
কখনো কখনো পুরো একটা জীবন।
পরদিন অফিসে গিয়ে টেবিলে একটা পুরোনো পার্সেল পড়ে থাকতে দেখলাম।
প্রাপক মৃত।
প্রেরকের কোনো খোঁজ নেই।
ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় খামের ওপর ধুলো জমেছে।
আমি কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনে হলো, পৃথিবীতে কত অভিমান, কত না-বলা কথা, কত অসমাপ্ত সম্পর্ক—এভাবেই কোনো না কোনো টেবিলে ঠিকানাহীন হয়ে পড়ে থাকে।
অফিসে সেদিন আর ভালো লাগল না।
বাড়ি ফিরে দেখি, আমার ছেলে ঘরে বসে ফোন দেখছে।
আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম।
সে তাকাল।
আমি বললাম,
—তোর সঙ্গে আমার একটা কথা ছিল।
সে অবাক হয়ে বলল,
—কী কথা?
আমি ড্রয়ার থেকে রাশেদের বাবার চিঠির ফটোকপিটা বের করে তার সামনে রাখলাম।
সে কাগজটার দিকে তাকাল।
তারপর আমার দিকে।
অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
হঠাৎ উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
অনেক বছর পর।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
কিন্তু যথেষ্ট।
আমি তার পিঠে হাত রাখলাম।
কিছু বললাম না।
আমার মনে হলো, সেদিন যদি রাশেদের বাবার চিঠিটা আমি পৌঁছে না দিতাম, তাহলে হয়তো আমার নিজের ছেলেকেও এই কথাগুলো কোনোদিন বলা হতো না।
আমি এখনও কুরিয়ারে কাজ করি।
এখনও ভুল ঠিকানার পার্সেল আসে।
এখনও অফিসে তিনটা শব্দ লেখা হয়—
“প্রাপককে পাওয়া যায়নি।”
কিন্তু আমি আর আগের মতো সহজে এই কথাগুলো লিখতে পারি না।
কারণ আমি জানি—
কখনো কখনো মানুষ ঠিকানায় থাকে না।
অভিমানে থাকে।
দূরত্বে থাকে।
ভুল বোঝাবুঝিতে থাকে।
কখনো বিদেশে থাকে।
কখনো কবরের নিচে থাকে।
আর কখনো একই বাড়িতে থেকেও একটা দরজার ওপাশে থাকে।
তাই কোনো চিঠি হাতে নিয়ে যদি মনে হয়—
“লোকটা তো নেই।”
আমি একটু অপেক্ষা করি।
কারণ ঠিকানাটা ভুল হতে পারে।
কিন্তু চিঠিটা নয়।
চিঠি সাধারণত ঠিক মানুষটার কাছেই যেতে চায়।
শুধু পৌঁছাতে কখনো কখনো একজন কামালের দরকার হয়।