17/04/2026
গল্পঃ #পাঁচ_সন্তানের_প্রতিশোধ
পর্ব-০২
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥
ঢাকার সেই ব্যস্ত রাস্তায় বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটা অনেকক্ষণ ধরেই একই জায়গায় স্থির হয়ে ছিল।
চারপাশে মানুষজন আসছে যাচ্ছে, গাড়ির হর্ন, ধুলা, গরম সবকিছু যেন তার কাছে নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
তার চোখ শুধু পত্রিকার ওই ছবিগুলোর ওপর আটকে আছে।
পাঁচটা মুখ। পাঁচটা আলাদা পরিচয়। কিন্তু প্রতিটা চোখে একই আগুন, একই দৃঢ়তা।
আর সেই চোখগুলো সে চিনতে পারছে। ঠিক যেমন ছিল জন্মের সময়, যখন তারা প্রথমবার কান্না করেছিল।
ইয়াসিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত বছর ধরে সে নিজেকে বুঝিয়েছে—সে ঠিক করেছে, সে নিজের জীবন বাঁচিয়েছে।
কিন্তু আজ, এই একটা খবর তার সব যুক্তি ভেঙে দিল। সে মনে করার চেষ্টা করল শেষবার কবে সে লাবণ্যকে দেখেছিল। সেই রাতটা তার মাথায় স্পষ্ট হয়ে উঠল।
লাবণ্যের চোখের পানি, তার কাঁপা গলা, আর তার নিজের নিষ্ঠুর কথাগুলো। “শাপ”—এই শব্দটা যেন এখন তার কানে বাজতে লাগল, বারবার।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার পা কাঁপছিল, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত তাড়না কাজ করছিল। তাকে ওদের খুঁজে বের করতেই হবে।
এই শহরে এত বছর কাটিয়েছে, অনেক কিছু করেছে ভালো, খারাপ সবই। কিন্তু কখনো নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকায়নি।
আজ আর পালানোর জায়গা নেই।
পরদিন সকালেই সে সেই পত্রিকার অফিসে গেল।
অনেক অনুরোধ, অপেক্ষা, আর অপমান সহ্য করার পর অবশেষে সে কিছু তথ্য পেল। পাঁচ ভাইবোন এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।
একজন বড় ব্যবসায়ী, একজন সরকারি উচ্চপদে, একজন চিকিৎসক, একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, আর একজন সমাজকর্মী। তারা একসাথে থাকে না, কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।
ইয়াসিনের মাথা ঘুরে গেল। যাদের সে একদিন না খেয়ে মরবে ভেবেছিল, তারা আজ হাজার মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। তার মনে এক মুহূর্তের জন্য গর্ব আসল, কিন্তু সাথে সাথে লজ্জা সেই গর্বকে মাটিতে মিশিয়ে দিল।
সে প্রথমে ঠিক করল, সবচেয়ে ছোট সন্তানের কাছে যাবে। পত্রিকায় লেখা ছিল, সে ঢাকাতেই থাকে এবং একটি বড় এনজিও চালায়। দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করে।
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল।
যে সন্তানকে সে দুধ পর্যন্ত দিতে দেয়নি, সে আজ অন্যদের খাওয়াচ্ছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে সেই অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল। বড় বিল্ডিং, গেটে নিরাপত্তা।
সে নিজের মলিন কাপড়ের দিকে তাকাল। ভেতরে ঢোকার মতো অবস্থাও তার নেই। তবুও সাহস করে গার্ডের কাছে গেল। কাঁপা গলায় বলল, সে ভেতরের ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চায়।
গার্ড প্রথমে তাকে তাড়িয়ে দিতে চাইল।
কিন্তু ইয়াসিন বারবার অনুরোধ করল। শেষে গার্ড বিরক্ত হয়ে ভেতরে খবর পাঠাল। কিছুক্ষণ পর একজন সহকারী এসে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল, হয়তো ভিক্ষুক ভেবে সাহায্য করবে ভেবে।
ইয়াসিন যখন সেই কক্ষে ঢুকল, তার চোখ এক মুহূর্তে আটকে গেল।
সামনে বসে থাকা নারীটি মাথা নিচু করে কাজ করছিল। পরিপাটি পোশাক, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি।
কিন্তু তার মুখের একটা অদ্ভুত পরিচিত ছায়া ছিল।
“আপনি কী সাহায্য চান?” নারীটি মাথা না তুলেই বলল।
ইয়াসিনের গলা শুকিয়ে গেল।
এত বছর ধরে সে এই মুহূর্তটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে কিছু বলতে পারছিল না।
নারীটি এবার মাথা তুলল। দুজনের চোখ একসাথে আটকাল। একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল ঘরে।
নারীটির চোখ ছোট হয়ে এল। সে কিছু একটা খুঁজতে লাগল ইয়াসিনের মুখে। তারপর হঠাৎ তার মুখের ভাব বদলে গেল। বিস্ময়, সন্দেহ, তারপর ধীরে ধীরে এক ধরনের কঠোরতা।
“আপনি…” সে থেমে গেল।
ইয়াসিন কাঁপা গলায় বলল, “আমি… আমি তোমার বাবা…”
এই কথাটা ঘরের ভেতর ভারী হয়ে ঝুলে রইল।
নারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো পানি ছিল না, কোনো আবেগও না। শুধু ঠান্ডা এক দৃষ্টি।
“আমার বাবা?” সে ধীরে বলল। “আমার বাবা তো মারা গেছে। অন্তত আমার কাছে।”
ইয়াসিনের বুকটা যেন ছিঁড়ে গেল। সে এগিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু নারীটি হাত তুলে থামিয়ে দিল।
“আর এক পা এগোবেন না,” সে শক্ত গলায় বলল।
ইয়াসিন থেমে গেল। তার চোখ ভিজে উঠল। “আমি ভুল করছিলাম… আমি বুঝতে পারি নাই…”
নারীটি হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। “ভুল? আপনি আমাদের শাপ বলেছিলেন।
আমাদের ফেলে রেখে গিয়েছিলেন। মায়ের শেষ দিনগুলোতেও আপনি আসেননি।”
ইয়াসিন স্তব্ধ হয়ে গেল। “লাবণ্য… সে কোথায়?”
এই প্রশ্নে নারীটির চোখে প্রথমবারের মতো কষ্টের ছায়া ফুটে উঠল।
“মা আর বেঁচে নেই,” সে শান্তভাবে বলল। “অনেক বছর আগেই মারা গেছেন। শেষ সময়েও তিনি আপনাকে দোষ দেননি। শুধু বলেছিলেন, আপনি যেন ভালো থাকেন।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিন ভেঙে পড়ল। তার পা কাঁপতে লাগল, সে মাটিতে বসে পড়ল। এতদিন পরে, সে সব হারানোর সত্যিটা বুঝতে পারল।
নারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বলল, “আপনি কেন এসেছেন?”
ইয়াসিন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি শুধু একবার… তোমাদের সবারে দেখতে চাই… ক্ষমা চাইতে চাই…”
নারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে এখন একটা দ্বন্দ্ব কাজ করছিল।
মায়ের শেখানো ক্ষমা আর নিজের কষ্ট দুটোর মধ্যে লড়াই।
শেষ পর্যন্ত সে বলল, “আমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।
আমরা পাঁচজন একসাথে সিদ্ধান্ত নেই। আমি বাকিদের খবর দিচ্ছি। আপনি কাল আসবেন।”
ইয়াসিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তার ভেতরে ভয় আর আশা একসাথে কাজ করছিল।
সে ধীরে ধীরে অফিস থেকে বের হয়ে এল। আজ রাতে তার ঘুম হবে না। ৩০ বছর আগের প্রতিটা মুহূর্ত তাকে তাড়া করবে।
আর আগামীকাল… সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিচার মুখোমুখি হবে।
চলবে, তোমাদের সবার কাছে আমার অনুরোধ গল্প পড়ে অবশ্যই একটা কমেন্ট কইরো
!