31/07/2026
মাসুদ সাহেব সেদিন তার ছোট মুদি দোকানটাকে সুপারশপের মতো একটু আধুনিক করার শখ করলেন।
ফেসবুকে দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা বুস্ট মারলেন—যেটা আজকাল অনেকেই করে থাকেন।
ফলাফল?
পকেটের দুই হাজার টাকা হাওয়া, কিন্তু দোকানের সামনে দুটো কাকপক্ষীও বসল না। কারণটা খুব সহজ—গাড়ির এঞ্জিন ঠিক না রেখে কেউ যদি জোরে এক্সিলারেটর চাপ দেয়, তবে গাড়ি সামনে যাওয়ার বদলে খাদে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিজ্ঞাপন বা অ্যাডস হলো ঠিক তেমনি একটা এক্সিলারেটর। আপনার ব্যবসা যদি ভেতরে প্রস্তুত না থাকে, তবে টাকা ঢেলে কোনো লাভ নেই। ফেসবুকে একটা দারুণ ক্যাম্পেইন নামানোর আগে একজন বিজনেস ওনারকে নিজের কাছে এই সাতটি প্রশ্ন করে একদম নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে—
১. আমি ঠিক কাকে কাস্টমার হিসেবে চাই?
সবাইকে আপনার কাস্টমার বানাতে যাবেন না—তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউ আপনার কাস্টমার হবে না।
আপনি যখন ঢাকার ধানমন্ডির কোনো অভিজাত বুটিক হাউসে থ্রি-পিস বিক্রি করেন, তখন আপনার কাস্টমার আর মিরপুরের দশ টাকায় হকার মার্কেট থেকে জামা কেনা মানুষটি এক নয়।
আপনার পটেনশিয়াল কাস্টমার ঠিক কোথায় থাকে, তাদের বয়স কত, তারা ঠিক কী ধরনের সমস্যায় ভুগছে—এগুলো পরিষ্কার না জানলে ফেসবুকে টাকা ঢালা মানে জলে টাকা ফেলা।
২. কাস্টমার আমার কাছ থেকেই কেন কিনবে?
আজকে ধানমন্ডি বলুন আর গুলশান—একই পণ্যের দোকান ডানে-বাঁয়ে আরও দশটা আছে। মানুষ কেন আপনার কাছেই আসবে? আপনার সার্ভিস কি অন্য সবার চেয়ে দ্রুত?
নাকি আপনার পণ্যের কোয়ালিটি এমন যা কেউ দিতে পারছে না? এই ইউনিক ব্যাপারটাই আপনার ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি। কাস্টমার যেন এক বাক্যে বুঝতে পারে আপনার কাছে আসা মানেই একটা বিশেষ সুবিধা পাওয়া।
৩. আমার অফারটা ঠিক কী?
অফার মানে কিন্তু শুধু একটা পণ্যের ছবি দিয়ে নিচে দাম লিখে দেওয়া নয়। অফার হলো এমন একটা ব্যাপার যা দেখলে ক্রেতার মনে হবে—এই মুহূর্তে এটা না কিনলে আমার জীবনের বড় একটা ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
যেমন ধরুন—একটি ফেসবুক পেজ শুধু একটা ফেসওয়াশ বিক্রি না করে সাথে একটা ট্রাভেল কিট ফ্রি দিচ্ছে এবং সাথে ফ্রি হোম ডেলিভারির সুবিধা রাখছে। এটাকে বলে একটা চমৎকার কমপ্লিট অফার।
৪. কাস্টমারের সবচেয়ে বড় অবজেকশন বা আপত্তি কী?
আমাদের দেশের ক্রেতাদের মনে কিছু চিরন্তন প্রশ্ন থাকে—পণ্য হাতে পাওয়ার আগে টাকা দিলে যদি ঠকে যাই? সাইজে না মিললে রিটার্ন করার সুযোগ আছে তো? ছবি আর আসলের সাথে মিলবে তো?
আপনার কাস্টমার পেমেন্ট করার ঠিক আগ মুহূর্তে যে কারণে দ্বিধায় ভোগে, সেই ভয় বা আপত্তিগুলোকে আগে থেকেই দূর করে দিন। পণ্যের নিচে ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা আছে কি না, কিংবা সাত দিনের রিটার্ন পলিসি আছে কি না—সেটা পরিষ্কার করে লিখে দিন।
৫. আমার গ্রহণযোগ্য কাস্টমার অ্যাকুইজিশন কস্ট কত?
একটি প্রোডাক্ট বিক্রি করতে গিয়ে ফেসবুকে আপনার কত টাকা খরচ হওয়া উচিত—সেটার একটা হিসাব থাকা চাই।
ধরুন, আপনি একটা টি-শার্ট বিক্রি করেন পাঁচশ টাকায়। সেটি বিক্রি করতে গিয়ে যদি ফেসবুক অ্যাড বাবদ চারশ টাকা খরচ হয়ে যায়, তবে ব্যবসা তো দূরের কথা, পকেট থেকে উল্টো লোকসান গুণতে হবে।
তাই প্রোডাক্টের প্রফিট মার্জিন বুঝে ঠিক করুন যে একজন কাস্টমারকে পেছনে আপনি সর্বোচ্চ কত টাকা মার্কেটিং খরচ করতে রাজি আছেন।
৬. আমার ল্যান্ডিং পেজ বা পেজটি কি বিক্রির জন্য প্রস্তুত?
কাস্টমার আপনার অ্যাড দেখে ক্লিক করে আপনার পেজে এলো, কিন্তু পেজে ঢোকার পর যদি দেখে কোনো গোছানো দাম নেই, পণ্যের কোনো ডিটেইলস নেই, কন্টাক্ট করার কোনো সঠিক উপায় বা ঠিকানা নেই—তবে সে এক সেকেন্ডও সেখানে থাকবে না।
ফেসবুক পেজ হোক কিংবা একটা সুন্দর ওয়েবসাইট—সেখানে যেন কাস্টমার আসার সাথে সাথেই বুঝতে পারে কীভাবে অর্ডার করতে হবে।
৭. ট্র্যাকিং বা পিক্সেল কি ঠিকভাবে কাজ করছে?
টাকা খরচ করে অ্যাড চালাচ্ছেন অথচ কে আপনার ওয়েবসাইটে আসছে, কে কার্ট পর্যন্ত গিয়েও পণ্য না কিনে চলে যাচ্ছে—তার কোনো ডেটা আপনার কাছে নেই। এই কাজটি করে মেটা পিক্সেল।
ফেসবুকের এই ছোট্ট কোণায় যদি টেকনিক্যাল গোলমাল থাকে, তবে আপনি ভুলেও বুঝতে পারবেন না আপনার বিজ্ঞাপন কার কাছে পৌঁছাচ্ছে আর কারা সেখান থেকে কিনছে।
তাই অ্যাড দেওয়ার আগে ট্র্যাকিং ঠিক আছে কি না তা তিনবার যাচাই করে নিন। একটি দারুণ বিজ্ঞাপন কেবল তখনই কাজ করে, যখন তার পেছনের ব্যবসায়িক ভিতগুলো পাথরের মতো শক্ত থাকে।
আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে এই সাতটি প্রশ্নের মধ্যে কোন প্রশ্নটি নিয়ে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়?
নিচে কমেন্ট করে জানান, হয়তো অন্য কোনো অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ভাই আপনাকে এ নিয়ে দারুণ কোনো পরামর্শ দিতে পারবেন।