11/10/2022
#কাজ_নাকি_অভ্যাস
আম্মু কখনোই আমাকে পারফেকশনিস্ট বানাতে চান নি৷ কিন্তু সবসময় চেয়েছেন, যে কাজগুলো না পারলেই নয়, সেই কাজগুলোতে অভ্যস্ত করে তুলতে। কারণ আম্মু চাকরিজীবী হওয়াতে এটা অন্তত জানতেন, যতো পড়াশোনা আর যত বড় চাকরি ই করি না কেনো, এই নূন্যতম কাজগুলো আমাকে করতেই হবে। আর তা করতে হবে, খুব দ্রুততার সঙ্গে। তাই খুব ছোটবেলা থেকে কিছু কাজ আমাকে দিয়ে করাতেন। আর বলতেন, এমন ভাবে তৈরী হও, যাতে কাজকে কখনো কাজ মনে না হয়।
ভাত রান্না করা টা যে কোনো কাজ, আমার কখনোই জানা ছিলো না। সকালের ভাত বরাবর ই আব্বু রান্না করতেন। আর অন্য বেলায় আমি, ভাইয়া, বোন যে যখন সুযোগ পেতাম, বা রান্নার সময় হয়ে যেতো, রান্না করে ফেলতাম।
কাজ করার সময় আম্মু কিছু কিছু ইন্সট্রাকশন দিতেন, যেটা সে সময় আমার মতো ক্লাস ২/৩ এ পড়া বাচ্চার মাথায় সহজে ঢুকে যেতো৷
১। রুটি ভাজার সময়, রুটি তাওয়া বা ফ্রাইপেনে দেওয়ার পর যখন নিচের পার্ট থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করবে, তখন উল্টিয়ে দিতে হবে।
২। মাছ ভাজার সময় যখন শব্দ বন্ধ হয়ে যাবে ( পানি শুকিয়ে যাওয়ায় শব্দ বন্ধ হয়) তখন উল্টিয়ে দিতে হবে।
৩। চালনা দিয়ে আটা চালার সময় যতটুকু সম্ভব নিজের বডিকে স্ট্রিক্ট রাখতে হবে। হাতের চেয়ে চালনী বেশি নড়বে।
৪। রুটি বানানোর সময়, রুটির মাঝখানে চাপ বেশি দিতে হবে। তাহলে বেশি চাপের বিন্দুকে কেন্দ্র করে একটা বৃত্ত হবে, মানে রুটি গোল হবে।
৫। ঘর মোছার সময় পিছনের দিকে যেতে হবে, তাহলে নিজের ময়লা পা মোছা অংশে পড়বে না
৬। কিন্তু ঘর ঝাড়ার সময় সামনে দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
৭। ঝুল ঝাড়ুর সময় ঝাড়ু রোল করতে হবে, বাড়ি দিয়ে ঝাড়া যাবে না।
৮। মশলা বাটার সময় শীল টাকে লম্বা করে টানতে হবে, তাহলে কম সময় ও কম পরিশ্রমে বাটা হয়ে যাবে।
৯। কখনোই প্রথমে গরম মশলা বা রাধুনি সজ বাটা যাবে না, তাহলে পেয়াজ রসুনেও সেই গন্ধ থেকে যাবে।
১০। সবজি বা পেয়াজ কাটতে হবে, সেটা কি দিয়ে রান্না করা হবে সেটার সাইজের সাথে মিলিয়ে। ছোট মাছের জন্য চিকন লম্বা, বড় মাছের জন্য মোটা ও লম্বা। আর মাংস বা সবজির জন্য কিউব করে কাটতে হবে
১১। দুধ সাদা বলে দুধের অনেক অহংকার আর খুব রাগ। সে চায়, সবাই তার দিক থেকে চোখ না ফেরাক। তাই দুধ জাল দেওয়ার সময় কেউ যদি একবার চোখ সরায়, সে রেগেমেগে ফুলে উঠে উপচিয়ে পড়ে যায়।
১২। প্রেসার কুকারে ডাল রান্না করলে, লিড বন্ধ করে রাবার বরাবর কয়েক ফোঁটা তেল দিতে হবে।
১৩। যে কোনো সবজি, নুডলস সেদ্ধ করার সময় ২/১ ফোঁটা তেল দিলে, সবজির কালার চ্যাঞ্জ হবে না, নুডলস ঝড়ঝড়ে হবে।
১৪। আব্বুর ফরমাল প্যান্ট ধুয়ে শুকোতে দিতে হবে উল্টো করে। আর ভাইয়ার জিন্স প্যান্ট সোজা করে।
১৫। কাপড় ৩ বার খচতে বা ধুতে হবে। প্রতিবার ধুয়ার পর কাপড় রাখার রডে ঝুলিয়ে পানি ঝড়িয়ে নিতে হবে।
১৬। কাপড়ের বেশি ময়লা জায়গাগুলোতে এক্সট্রা ডিটারজেন্ট বা সাবান দিয়ে, সেম কাপড়ের এক অংশ দিয়ে অই অংশ টা ঘষতে হবে। হাত দিয়ে ঘষলে হাতে ফোসকা পড়ে যাবে।
১৭। যে কোনো কাপড় ই সিমিট্রিকাললি ভাজ করতে হবে। শার্টের ভাজ শিখে গেলে সব কাপড় ভাজ করা যাবে। ফরমাল প্যান্ট পায়ের দিক থেকে ইস্ত্রির ভাজ বরাবর ভাজ করতে হবে। আর পায়জামা বা ক্যাজুয়াল প্যান্ট সেলাই বরাবর ভাজ করতে হবে।( আব্বুর কাছ থেকে শেখা)।
১৮। বুদ্ধিমতী রা কখনো জিনিসের অপেক্ষায় বসে থাকে না। হাতের কাছে থাকা স্বল্প জিনিস দিয়ে যে যতো সুন্দর করে কাজ করতে পারবে, সে ততো বুদ্ধিমতী।
অনেকের কাছেই মনে হবে, এগুলো তো সব জানি। আপনি আমি জানি, আমাদের বাচ্চারা জানে না। আমরা ও সেই বয়সে জানতাম না। আর করতে পারাটাও ব্যপার না। সময় আর প্রতিকুলতার সাথে তাল মিলিয়ে করাটাই ব্যপার। আম্মু আরেকটা কথা বলতে, কাজ করতে না পারা কখনো ক্রেডিট না, সবসময়ের জন্যই ডিসক্রেডিট। সে সময় টায় আসলেই মন খারাপ হতো, যখন বন্ধু বান্ধবী রা কেউ ই কোনো কাজ করতো না। আর আন্টিরা আম্মুকে এসে বলতেন, "ম্যাডাম, আপনি ছেলে মেয়েকে দিয়ে কত্তো কাজ করান। আমার ছেলেমেয়ে তো পানিটা ঢেলেও খেতে পারে না।" আম্মু মিটমিট করে হাসতেন শুধু।
Positive parenting-পজিটিভ প্যারেন্টিং