14/07/2025
পৃথিবীর শীতলতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। যেখানে চারপাশ বরফ দিয়ে ঢাকা। কিন্তু কল্পনা করুন, হঠাৎ বরফের মাঝখান দিয়ে গাঢ় লাল রঙের পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনাকে বলা হয় ব্লাড ফলস।
🌀 এই জলপ্রপাতের শুরু কোথা থেকে?
1911 সালে অর্থাৎ 112 বছর আগে, কিছু ব্রিটিশ অভিযাত্রী অ্যান্টার্কটিকার টেলর হিমবাহে রক্ত বর্ণের জলপ্রপাত দেখেছিলেন। এক শতাব্দী আগেও মানুষ বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এই অপরূপ দৃশ্য দেখে। তারপরেই তা নিয়ে শুরু হয় বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা। কিন্তু সবকিছুর পিছনেই কোনও না কোনও বিজ্ঞান আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তাই তাঁরা এর উত্তর খুঁজে বের করতে লেগে পড়েন। সেই মতোই রক্ত বর্ণের ঝর্ণাধারার পিছনে কারণ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। গবেষণা চলতে থাকে বহু বছর ধরে। অবশেষে হয় অসাধ্য সাধন।
📌কেন পানির রং লাল?❗
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, হয়তো কোনো বিশাল দুর্ঘটনা ঘটেছে বা কোনো প্রাণীর রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আসলে এটি একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলাফল। প্রায় ২০ লাখ বছর আগে বরফের নিচে একটি লবণাক্ত হ্রদ তৈরি হয়। হ্রদটি সম্পূর্ণভাবে সূর্যের আলো ও বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন।
এই হ্রদে থাকা পানির অক্সিজেন প্রায় শূন্য। এতে প্রচুর পরিমাণে লোহার উপস্থিতি রয়েছে। যখন এই পানি বরফের ফাটল দিয়ে বাইরে আসে তখন বাতাসের সংস্পর্শে এসে লালচে রং ধারণ করে। ঠিক যেমনটা আমরা মরিচা পড়া লোহার ক্ষেত্রে দেখি।
📌 ব্লাড ফলসের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য :
১। এটি বরফের নিচের লুকানো একটি হ্রদ থেকে আসে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
২। হ্রদটিতে জীবাণু (মাইক্রো অর্গানিজম) রয়েছে। যারা অক্সিজেন ছাড়াই টিকে থাকতে পারে।
৩। হ্রদের পানি অত্যন্ত লবণাক্ত। অতিরিক্ত লবণ হ্রদটিকে বরফ হওয়া থেকে রক্ষা করে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে হয়তো ব্লাড ফলসের গোপন হ্রদটি প্রকাশিত হয়ে যাবে। তখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই বিস্ময় হারিয়ে যেতে পারে।
🌊 রক্তবর্ণের জলপ্রপাতের রহস্যটা কী?
ব্লাড ফলস পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ভিক্টোরিয়া ল্যান্ডে অবস্থিত। বিজ্ঞানীদের মতো, এই লাল রঙই বলে দেয় যে এই হিমবাহের নীচে জীবনের বিকাশ ঘটছে। এই হিমবাহের রক্ত লবণাক্ত, যা একটি অতি প্রাচীন বাস্তুতন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে এবং তারপর বিজ্ঞানীরা এর কাছাকাছি এসেছেন গবেষণার জন্য। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, এর স্বাদ রক্তের মতোই নোনতা। এই জায়গাটিতে মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থ বিজ্ঞানী কেন লেভি বলেছেন, “আমি মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে গবেষণা করে দেখেছি, এতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লোহার টুকরো রয়েছে। এমনকী এতে লোহা ছাড়াও অনেকগুলি বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। এছাড়াও হিমবাহের নীচে রয়েছে আয়রন লবণ অর্থাৎ ফেরিক হাইড্রোক্সাইড। তাদের সঙ্গে বসবাস করে অণুজীব। সেই সব কিছু বিক্রিয়ার কারণেই কারণে লাল রঙের ফোয়ারা বের হচ্ছে।”
এই জায়গাটি বিরল সাবগ্লাসিয়াল ইকোসিস্টেমের ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল। এই ব্যাকটেরিয়া এমন জায়গায় বেঁচে থাকে, যেখানে অক্সিজেন নেই। এবিষয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, রক্তবর্ণের জলপ্রপাতে লোহার পাশাপাশি সিলিকন, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও সোডিয়ামের কণা রয়েছে। ব্রিটিশ অভিযাত্রী টমাস এবং তার সহকর্মীরা এই লাল রঙটিকে শৈবাল হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে এমন রক্তের মতো লাল জলধারা বয়ে যাওয়া বিশ্বের কাছে আশ্চর্য তো বটেই!
©️ তথ্য - উইকিপিডিয়া