24/05/2022
১৮ বছরের এক তরুণ। সদা হাস্যোজ্যল।
কাউকে বুঝতে দেয় না এই হাসিমুখের আড়ালে সে কতটা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে! কতটা ঘৃনা করছে সে নিজেকে। বহুদিন আগে সে এক ভুল করেছিল-------হস্তমৈথুন আর পর্নোগ্রাফির অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়ে। তারপর কিভাবে সেই অন্ধকার, অভিশপ্ত জীবন থেকে সে বেড়িয়ে এলো শ্বাস নিলো মুক্ত বাতাসে?
----আমার যখন ১৩ বছর বয়স, তখন একদিন হঠাৎ করেই হস্তমৈথুন বিষয়টা আবিষ্কার করে ফেললাম। প্রথম প্রথম জানতাম ই না এটা খারাপ কিছু। মাঝেমধ্যেই করতাম। মাস দু-একের মধ্যে আমি পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। প্রতিদিন একবার তো বটেই, মাঝে মাঝে দিনে ৩-৪বার করে করতাম। আমি ছোট বেলা থেকেই ভদ্র ছিলাম, যাকে বলে "গুড বয়"। মেয়েদের সবসময় সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতাম। আমার পরিবার থেকেও আমাকে এটাই শিখানো হয়েছিলো। কিন্তু হস্তমৈথুনে আসক্ত হয়ে যাবার পর আমার মধ্যে আমূল একটা পরিবর্তন এসে যায়। পরিবর্তন টা যে নেতিবাচক সেটাই বাহুল্য। আমি মেয়েদের অন্য চোখে দেখা শুরু করলাম। আমার আশে-পাশের মেয়েদের, যেমন, আমার ক্লাসমেট, প্রতিবেশিনি, স্কুলের ম্যাম এদের নিয়ে আমি অন্যরকম ফ্যান্টাসিতে ভুগতাম। আমার এই ফ্যান্টাসিগুলো এতোটাই জঘন্য ছিলো যে, সেগুলো মনে হলে আমার এখন বমি আসে! আমি অবাক হয়ে ভাবি, কীভাবে আমি এই এত বাজে চিন্তা করতাম?! প্রতিবার হস্তমৈথুন করার সময় এইসব মহিলাদের নিয়ে চিন্তা করতাম! পত্রিকার বিনোদন পেইজ, ম্যাগাযিনের মডেল, নায়িকাদের ছবি, এসব আমাকে বেশি বেশি হস্তমৈথুন করতে বাধ্য করতো।
এভাবে দু-বছর কেটে গেলো। হস্তমৈথুন শুরু করার আগে আমি খুবই এনারজেটিক ছেলে ছিলাম। বিভিন্ন আউটডোর স্পোর্টস এ নিয়মিত অংশগ্রহন করতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে এসব উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম।এক সময় খেলাধুলা বলতে গেলে ছেড়েই দিলাম। সবসময় দুর্বলতা অনুভব করতাম। আমার শরীরের ওজন আশঙ্কাজনক ভাবে কমতে শুরু করলো! শুরুর দিনগুলোতে প্রচুর ভালো লাগতো। কিন্তু এই সময়টাতে প্রতিবার হস্তমৈথুন করার পর আমার মধ্যে প্রচন্ড খারাপ লাগা কাজ করত। আদিগন্ত বিস্তৃত বিষণ্নতা আমাকে গ্রাস করতো। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম এটা আমার জন্য ক্ষতিকর, এটা আমার ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। কিন্তু আমি কিছুতেই ছাড়তে পারছিলাম না! নিজেকে প্রচুর ঘৃণা করতাম।
১৮ বছর বয়সটা আমার জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। এ সময়টাতে দিনে প্রায় ২/৩ বার করে হস্তমৈথুন করতাম। পথেঘাটে মেয়েদের টাইট, আঁটসাঁট পোশাক, তাদের চলাফেরা, অঙ্গভঙ্গি, পত্রিকার বিনোদন পেইজ, ম্যাগাযিনে নায়িকাদের খোলামেলা ছবি, আইটেম সং আমাকে পাগল করে তুলতো। আমি যেন একটা পশুতে পরিনত হতাম। মনে হতো এখন, এ মুহুর্তে যে কোন মূল্যে আমার একটা শরীর চাই; নারীর শরীর হোক সে রাস্তার পতিতা! ১৩ বছর বয়স থেকে হস্তমৈথুনে আসক্ত হলেও, আমার সৌভাগ্য আমি তখনও পর্ন ভিডিওতে আসক্ত হইনি! ১৮ বছর বয়সে এক বন্ধুর মাধ্যমে আমি "চটিবই'' এর খোঁজ পাই। রাত জেগে, ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে, এমনকি ক্লাসেও লুকিয়ে লুকিয়ে চটি পড়তাম এবং অতি অবশ্যই প্রতিবার চটি পড়ার পর হস্তমৈথুন করতাম। এমন বাজে অবস্থা হয়েছিলো যে, আমি রমাদ্বান মাসে রোজা রাখা অবস্থায় ও চটি পরতাম এবং হস্তমৈথুন করতাম।
আমার পড়াশোনা শিকেয় উঠলো, স্বাস্থ ভয়ানক ভাবে ভেঙ্গে পড়ল, চুল পরতে শুরু করলো, সেই সাথে ভয়ানক মাথাব্যথা।
চটিগল্প আমার চিন্তাজগতকে পুরোপুরি কলুষিত করে দিলো। ক্লাসের ম্যাম, বাসার কাজের মেয়ে, প্রতিবেশিনি, ক্লাসের সহপাঠিনি, এমন অনেক কে নিয়ে অন্যরকম ফ্যান্টাসিতে ভুগতাম। চটিগল্পে পড়া কাহিনি গুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার চিন্তা করতাম। আশপাশ দিয়ে কোন মেয়ে গেলেই তাকে নিয়ে বাজে চিন্তা করা শুরু করতাম। আমার আশে পাশের কোন মেয়েই আমার ফ্যান্টাসির নায়িকা হওয়া থেকে রেহাই পেতো না!।
অনেক আগে থেকেই আমাকে বিষন্নতা পেয়ে বসেছিলো, এবার যেন বিষাদসিন্ধুতে হাবুডুবু খেতে থাকলাম। বিষন্নতা দূর করার উপায় হিসেবে প্রচুর গান শুনতাম। কিন্তু এতে অল্প কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগলেও পরে আবার ভয়াভহ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে পরতাম। এই ভয়াবহ সময়টাতে এমন কাউকে আমার পাশে দরকার ছিলো, যে আমার সব কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবে, আমার কষ্ট গুলো ভাগ করে নিবে, আমাকে সাহায্য করবে এ অভিশপ্ত জীবন থেকে বের হয়ে আসতে। কিন্তু লজ্জার কারণে, আমার এ ভয়াভহ অন্ধকারের গল্প শুনলে আমাকে কতটা ঘৃনা করবে এই ভেবে আমি কাউকে কিছুব বলতে পারতাম না। সবার সাথে হাসিমুখে অভিনয় করে চলতাম। কাউকে বুঝতে দিতাম না এ ১৮ বছরের ছেলেটার জীবন কতটা অভিশপ্ত, প্রতিটি দিন কিভাবে তার হৃদয়টা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে হস্তমৈথুন আর চটি নামক অভশাপ।
তার কিছুদিন পর আমি পর্ন ভিডিওতে আসক্ত হয়ে গেলাম। প্রথমদিকে নারী-পুরুষের পশুর মতো যৌন মিলন দেখে বমি আসতো। কিন্তু কয়েকদিনের ভিতরেই আমার কাছে এগুলো স্বাভাবিক হইয়ে গেলো। সফটপর্ন ছেড়ে আমি ধীরে ধীরে হার্ডকোর পর্ন দেখা শুরু করলাম। জীবন আমার কাছে অসহ্য মনে হতো। নিজেকে খুব ঘৃনা করতাম। সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চাইতাম। চাইতাম এই অন্ধকার কলুষিত জীবন থেকে বেড়িয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে।
এক-দেড় বছর পার হয়ে গেলো। আমি তখনো হস্তমৈথুনে আসক্ত। পর্ন দেখা বন্ধ করার জন্য প্রতিনিয়ত নিজের সাথে লড়াই করি, আর পরাজিত হই। হঠাত একদিন আপনাদের লেখাগুলো চোখে পড়লো (লস্ট মডেস্টি ব্লগের লিখা) আমি যেন এক অমূল্য রত্নভান্ডারের সন্ধান পেলাম। আপনাদের লেখা আমাকে খুব প্রভাবিত করলো। হস্তমৈথুন করার ইচ্ছা জাগলেই আপনাদের লেখাগুলো পড়তাম। আপনাদের কথামতো প্রচুর পরিমানে দোয়া করতাম আল্লাহর কাছে। একটা টার্গেট ঠিক করে নিয়েছিলাম-----আগামী এক সপ্তাহ ইনশা-আল্লাহ পর্ন দেখবো না, হস্তমৈথুন করবো না।
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর ইচ্ছায় আমি পর্ন এবং আসক্তি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পেরেছি। হতাশা, বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠেছি। পড়াশোনায় উৎসাহ ফিরে পেয়েছি। জীবনটাকে এখন অনেক, অনেক বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। এই গ্রীস্মের মতো জীবনটাকে এত মধুর মনে হয়নি আগে কখনও।
আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন চিরকাল এ অন্ধকার জগত থেকে দূরে থাকতে পারি। লস্ট মডেস্টি টিমের প্রত্যেক সদস্যের জন্য আমার অনেক, অনেক দোয়া এবং শুভ কামনা রইলো। আপনাদের কাজের মাধ্যমে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আমার মত অনেকেই অন্ধকার জগত থেকে বের হয়ে আসবে ইনশা-আল্লাহ।
একটা কথা বলে শেষ করবো---------
চরম্ভাবে অত্যাচারিত যৌনায়িত বর্তমান পৃথিবীতে পন্যের মতো নারীদেহের বেচে-কেনা চলছে। আইটেম সং, রিয়েলিটি শো, খেলার মাঠ, বিলবোর্ড সবকিছুই, সবসময় তরুণদের কামের আগুনকে উসকে দিচ্ছে। ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে পা হড়কানো দুটো মাউসের ক্লিকের ব্যপার মাত্র। এ রকম অস্থির এক পৃথিবীতে হয়তো আপনার সন্তান, ছোট ভাই-বোন, কাযিনও রক্ষা পায়নি পর্ন ভিডিও, হস্তমৈথুন কিংবা চটি বইয়ের কবল থেকে। হয়তো আপনার আশে পাশে আপনার সন্তান, ছোট ভাই-বোন হস্তমৈথুন পর্ন ভিডিওতে আসক্ত হয়ে বিভীষিকাময় জীবন পার করছে। সে তার কষ্টগুলো হয়তো আপনাকে বুঝতে দিচ্ছে না, হাসিমুখের আড়ালে আপনার কাছ থেকে গোপন রেখেছে তার এ অন্ধকার পৃথীবি। তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশুন। তার আস্থা অর্জন করুন, তাকে তিরস্কার করবেন না, লজ্জা না দিয়ে তার অন্ধকারের গল্পগুলো শুনুন, তার কষ্টগুলো অনুভব করুন, বাড়িয়ে দিন সাহায্যের হাত।!
আপনার সাহায্য তার খুব প্রয়োজন।
খুব বেশি প্রয়োজন!।
পিতা-মাতা রা সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করুন।
বইঃ মুক্ত বাতাসের খুঁজে।
লিখাঃ নিজ