27/01/2024
কেন নিযামুদ্দিন মারকায ছেড়েছিলেন মাওলানা আহমেদ লাট নদভি (দা বা)?
মূলত মাওলানা সাদ সাহেবের চারটি ফায়সালা মানতে পারেন নি মাওলানা আহমেদ লাট নদভি (দা বা)
(এক)
১। মাসোয়ারা দ্বারা সিদ্ধান্ত হয়, বিভিন্ন তাকাজায় যাঁরা বিদেশ সফর করবেন, মারকাজ আর তাঁদের খরচ বহন করার জন্য কোন দায় নিবে না, কোন সওয়াল করবে না। প্রত্যেককে অবশ্যই নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। এজন্য যারাই মারকাজে বিভিন্ন তাকাজা পূরণ করতে বা তরতীবে আসবেন তাঁদের অবশ্যই সার্বজনীন উসূলের অনুসরণ করতে হবে, "নিজের জান, নিজের মাল নিয়ে, নিজের ফায়দার জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া।” [আপনা জান আপনা মাল !! ] পূর্বে সারাবিশ্বেই কিছু সাথী মারকাজের নুসরাতের নামে বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ থেকে হাদিয়া ও অর্থ সাহায্য গ্রহণ করতেন। এটা বন্ধ করা হয়েছে!
(দুই)
আগে ট্রাভেল টিকিট মারকাজ থেকে করা হত। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্ট কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ রুপি কামাই করে নিত। এ সবকিছুই বন্ধ করা হয়েছে। মারকাজ খিদমতের জন্য নয় বরং দিক নির্দেশনা বা রাহবারী করার জন্য। প্রত্যেক জামাত নিজেদের প্রয়োজনীয় খিদমত নিজেরাই করবেন। নিজেদের টিকিট নিজেরাই কাটবেন। ফলশ্রুতিতে এই অসৎ বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে। মাওলানা আহমেদ লাট নদভি (দা বা)এই ফায়সালা মানতে পারেন নি।
২। আগে বিভিন্ন নজমের সবকিছু এক নির্দিষ্ট জামাতের হাতে ছিল। যেমন, বিদেশ সফরের কাওয়ায়েফের জামাত। এখানে পাঁচ ছয় জনের একটি জামাত ছিল। মোটামুটি তাঁদের একই ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। তাঁরাই সিদ্ধান্ত নিতেন কে কে বিদেশ সফর করতে পারবে, কে কে পারবে না। তাদের রাজি না করে কোন জামাতই সফর করতে পারত না। তারা সাধারণত নিজেদের পছন্দমত লোকজনই বিদেশে পাঠাতেন। বিভিন্ন সময়ে নিজেরাও জামাতের সাথে যেতেন। গিয়ে সেখানে ব্যবস্থা করে আসতেন যাতে পরবর্তীতে আবারো ঐ সব দেশে যাওয়া যায়। এরপরে নিজামুদ্দিন ফিরে আসতেন। এরপর আবার
(তিন)
যখন জরুরত পড়ত আবার যেতেন। এ কারণেই
আজ বিভিন্ন দেশে এদের তথা আলমী শূরার লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জামাতের মাধ্যমে তারা নিজেদের দুনিয়াবী ব্যবসা বাণিজ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন সারতেন, যার সাথে এই মেহনতের কোন সংযোগ নেই। আমাদের মোবারক মেহনতকে এসব থেকে পাক রাখার জন্য কিছু সংস্কার ও পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়ে ছিল। নিজামুদ্দিনের মাসোয়ারাতে ফয়সালা হয়, এমন অনেক সাথী রয়েছেন যাঁরা বিদেশে মেহনত করার জন্য উপযোগী এবং তাদের কাওয়ায়েব পুরা আছে। তাঁদের বিভিন্ন তাকাজায় বিদেশে পাঠানো শুরু হল। এবং মারকাজে যাঁরা পুরাতন মুরুব্বী যারা আগে অনেক মেহনত, সফর ও কুরবানী করেছেন তাঁদের মারকাজেই আরাম ও বিশ্রামের সুযোগ দেয়া হল, যাতে মারকাজে দেশ বিদেশের নতুন নতুন যেসব সাথী নিজামুদ্দিনে তরতীবে আসেন তাদের সহীহ তালীম তরবীয়ত ও রাহবারী করতে পারেন।
বিদেশগামী জামাতের তাফাক্কুদকারী এই চক্রের অবলুপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনই ছিল সবচেয়ে কঠিন এবং বড় ধরনের পরিবর্তন। এই কাজটি এখন সরাসরি নিজামুদ্দিন মারকাজের শূরা হযরতগণই দেখভাল করছেন। বর্তমানে ৮
(চার)
জন্য স্থায়ী শূরা রয়েছেন। তাঁদের সাথে নজমের খিদমতে আসা মোনাসেব সাথীদের থেকে আরো বিশ ত্রিশ জন সাথী তাফাক্কুদের সময় থাকেন এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন। বলাবাহুল্য এই পরিবর্তনটি মানতে পারেন নি অনেকেই।
আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশের পুরনোদের জোরে মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা (দা বা) কয়েক বছর থেকেই আসতেন। আমরাও উনার বয়ান শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। মাঝখানে এক বছর সম্ভবত ২০১৩ সালে মাওলানা জামশেদ সাব, মাওলানা মুস্তাকিম সাব সহ নিযামুদ্দিনের মুরুব্বিদের এক জামাত এসেছিলেন। অনেকেই আফসোস করছিলেন। কিন্তু জোর শেষে সবাই বলতেছিলেন এই বছর নতুন কিছু শিখলাম, আলহামদুল্লিল্লাহ। সম্ভবত ২০১৪ সালে শুধুমাত্র মাওলানা ইব্রাহিম সাহেবকে পুরনোদের জোরে আনার জন্য জোর পেছানো হয়েছিলো এক সপ্তাহ।বাক্তিপুজা কাকে বলে?
৩। নিযামুদ্দিন মারকাযে স্পেশাল দস্তারখান চালু ছিল। বলাবাহুল্য নিযামুদ্দিনের আরও অনেক নয়মের মত এই নযমের নিয়ন্ত্রন ছিল
(পাঁচ)
আলিগরি ও গুজরাটিদের হাতে। এই নজমের জন্য দেশ বিদেশ থেকে বিপুল হাদিয়া আসতো। এগুলো ব্যয়বহুল ও রাজকীয় টাইপের দস্তরখান ছিল। দেখা যেত একদিকে মুরুব্বী ও মুকিমীনগণ বসেছেন। তাঁদের দস্তরখানে বিশ রকমের আইটেম, মুরগী মুসাল্লাম, আরো কত কি? অন্যদিকে আল্লাহর রাস্তার মেহমানদের দস্তরখানে হয়ত সাধারণ সবজি ডাল। মাশয়ারায় মাওলানা সাদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন এই দস্তরখান উমুমি ভাবে নিজামুদ্দিনে চালানো সম্ভব কিনা। জানান হল যে সম্ভব নয় । অতঃপর ফায়সালা হয় পুরা নিজামুদ্দিনে এক দস্তরখান চলবে। বর্তমানে সবাইকে একই খানা দেয়া হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খুলাফায়ে রাশেদাগণ যেভাবে সাথীদের সাথে একই দস্তরখানে বসতেন, তেমনি হজরতজী নিজেও তাঁর ছেলেদের নিয়ে আল্লাহর রাস্তার মেহমানদের সাথে বসেন। এই ফয়সালা যে অনেকের পছন্দ হবে না, তা তো জানা কথা। বিশেষত আলিগরি ও গুজরাটিরা। এই দুই শ্রেণীই পরবর্তীতে মারকাজ ছেড়েছেন।
৪। নিজামুদ্দিনের ১৫০ জন মুকিমিন হজরতদের জন্য মাওলানা সাদ সাহেবের ফিকির ছিল এনাদের মত যোগ্যতা সম্পন্ন
(ছয়)
সাথীরা যদি বছরের কিছু সময় নিজ এলাকায় দেন, এর দারা এলাকার সাথিদের বিরাট ফায়দা হবে। অপরদিকে নতুনরা মারকাজের আমলে বেশি শরিক হতে পারবে। এর দারা নতুনদের ফায়দা হবে। বয়ান, কারগুজারী, হেদায়েতী কথা, আরবী তরজমা, আরবী তালীম সবকিছুই এখন মাসোয়ারার উমুর হিসাবে আসছে এবং ফয়সালা হচ্ছে। আগে এই আমল গুলোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু লোক ছিলেন। এভাবে বেশি থেকে বেশি সাথীরা আমলের সুযোগ পাচ্ছে। তাঁদের বিভিন্ন তাকাজায় বিদেশে পাঠানো শুরু হল। এবং মারকাজে যাঁরা পুরাতন মুরুব্বী যারা আগে অনেক মেহনত, সফর ও কুরবানী করেছেন তাঁদের মারকাজেই আরাম ও বিশ্রামের সুযোগ দেয়া হল, যাতে মারকাজে দেশ বিদেশের নতুন নতুন যেসব সাথী নিজামুদ্দিনে তরতীবে আসেন তাদের সহীহ তালীম তরবীয়ত ও রাহবারী করতে পারেন। এতে একদিকে নতুনদের তরক্কী হচ্ছে অন্যদিকে পুরাতন জিম্মাদার সাথীদের নফসের মুজাহাদা হচ্ছে।একই সাথে কিছু নিরদ্রিস্ত সাথীদের বিখ্যাত হবার সুযোগ কমছে। মাওলানা আহমেদ লাট নদভি (দা বা)এই ফায়সালা মানতে পারেন নি।
(সাত)
ফয়সালাগুলো মানতে না পেরে মাওলানা আহমেদ লাট সাহেব গুজরাটি এবং আলিগরি দের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন নিজামুদ্দিন থেকে মাওলানা সাদ সাহেবকে বের করতে হবে(আরেক বর্ণনা অনুযায়ী মাওলানা সাদ সাহেব কে কতল করার সিধান্ত হয়, তাদের কয়েকটি হত্যাচেষ্টা বাৰ্থ হয়)
দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি আলিম যাদের একজন মাস্তুরাতসহ ঐ সময় নিজামুদ্দিনে অবস্থান করছিলেন আরেকজন পুরুষ জামাতে সময় দিচ্ছিলেন তাদের কারগুজারি অনুসারে পরবর্তী লেখা হয়েছে-
২০১৬ এর রমযানের কোন এক তারিখে পাকিস্তানি হেদায়েত মোতাবেক আলমী ফেৎনা বাজরা সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লীর দেড়শ গুন্ডার এক বাহিনী দিয়ে হজরতজী মাওলানা সাদকে জোরপূর্বক নিজামুদ্দিন থেকে বের করে দিবে। এই খবর মেওয়াতিদের কাছে পৌঁছানো মাত্রই তারা ৪০টি বাসে করে ১০০০ জনের জামাত নিয়ে নিযামুদ্দিন মারকাজে চলে আসে এবং গুন্ডা বাহিনীর আগেই পুরা মারকাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান নেয়। নির্দিষ্ট তারিখে ১৫০ জনের গুন্ডা বাহিনী নিজামুদ্দিনে প্রবেশ করে।
(আট)
প্রতিদিনের মত ইফতার করার জন্য হজরতজী দস্তরখানে আসেন। হজরতজী দস্তরখানে বসার সাথে সাথেই ঐ গুন্ডা বাহিনীর সরদার যে দিল্লিতে খুবই কুখ্যাত,সে হজরতজীর মুখোমুখি এসে বসে এবং বিভিন্ন ধরনের বেয়াদবি মূলক আচরণ ও কথা বলতে থাকে আর হজরতজী ও সবর করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ইয়াসিন দস্তরখান থেকে হজরতজীর খাবারের প্লেট হজরতজীর সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায় । এসবই ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তের ঘটনা। ইয়াসিন প্লেট নিয়ে যাওয়ার পর ঐ কুখ্যত গুন্ডা সরদার হজরতজীকে বলেন মোটামুটি এরকম "তোমার মামুররা তোমাকে মানে না, তাদের উপর তোমার কোন নিয়ন্ত্রন নাই, তোমার সামনে থেকে তোমার খাবার উঠিয়ে নিয়ে গেলো অথচ তুমি কিছুই করতে পারলে না তো আমি এখন ফয়সালা করলাম এখন থেকে তুমি আর আমির না, আমির হলো জুহাইরুল হাসান”। কিছু মেওয়াতিও ঐ সময় খানার কামরা এবং আশপাশে অবস্থান করছিল। মেওয়াতিরা বার বার দূর থেকে করজোড়ে হজরতজীকে ইশারার মাধ্যমে অনুনয় বিনয় করছিল যেন হজরতজি ওখান থেকে অর্থাৎ খানার কামরা থেকে চলে যায়। এক সময় হজরতজী দস্তরখান থেকে উঠে দাঁড়ান চলে যাওয়ার জন্য এবং যাওয়ার আগে
(নয়)
বলে যান যেসব ঘটনা ঘটেছে এসব নিয়ে কেউ যেন বাড়াবাড়ি না করে। হজরতজী খানার কামরা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই মেওয়াতিরা খানার কামরার দরজা আটকে দেয় তারপর ঐ কুখ্যাত গুণ্ডা সরদারসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের উত্তম মধ্যম দেয়া শুরু করে! গুণ্ডা সরদারের মাথা ফেটে রক্তারক্তিও হয়। আলমী শুরার অনুসারীরা যে প্লান করেছিল সেই মতই কিছুই হয় নি বরং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের প্রতিকুলে চলে গিয়েছে। যেখানে তাদের শেষ ভরসা পুলিশ ছিলো সেই পুলিশও সব জানার পর নিরপেক্ষভাবে তাদের ভূমিকা পালন করছে যেটা তাদের জন্য দুঃসংবাদ।এইজন্য আহমেদ লাট, ফারুক বাঙ্গালরি সহ সকল গুজরাটি এবং আলিগড়ি আলমি শুরার অনুসারী যারা মারকাজে ছিলো তারা এক এক করে গোপনে মারকাজ থেকে রাতের অন্ধকারে ভাগা শুরু করে। পরদিন ফজরের আগেই পাকিস্তানি এই ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত ছিলো তারা সবাই নিজেরাই ভেগে যায়, কেউ তাদের কিছুই বলে নাই।
সবাই যখন মারকাজ ছেড়ে যাওয়া শুরু করেছে তখন জোহাইরুল হাসান সাহেব তার চাচা
(দশ)
শশুর হযরত শেখ জাকারিয়া রহঃ এর ছেলে মাওলানা তালহা সাহেবকে ফোনে সব ঘটনা জানিয়ে পরামর্শ চান। মাওলনা তালহা সাব জোহাইরুল হাসান সাহেবকে বলেন মুটামুটি, তুমি যদি নিজামুদ্দিন মারকাজ ছেড়ে চলে যাও তাহলে তবলীগে তোমার নাম নিশানা কিছুই আর বাকি থাকবে না, তুমি বরং মারকাজেই থাকো । মাওলানা সাদ বরং আগের মতই তোমাকে ভালো জানবে। আদর যত্নের কোন কমতি মাওলানা সাদের তরফ থেকে হবে না। এই কথার প্রেক্ষিতে জোহাইরুল হাসান সাহেব ও মাওলানা ইয়াকুব সাব (রহ) মারকাজেই থেকে যান।
মুলত মাওলানা আহমেদ লাট সাব নিজামুদ্দিন ছাড়ার পরই তাবলীগ বিদ্বেষী কোলাব্যাঙ গুলো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, আর তাদের বর্ষাকাল শুরু হয়ে যায়; যা এখনো চলছে।
(এগারো)
তথ্যসূত্রঃ
১। সাভারের একজন মশহুর আলেম যিনি তাহকিকের জন্য নিজামুদ্দিন সফর করেছিলেন। তিনি সফরের পূর্বে গায়রে এতায়াতি ছিলেন।
২। দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি আলিম যাদের একজন মাস্তুরাতসহ ঐ সময় নিজামুদ্দিনে অবস্থান করছিলেন আরেকজন পুরুষ জামাতে সময় দিচ্ছিলেন তাদের কারগুজারি
৩। মুফতি মেহবুব সাহেবের বয়ানের কিস্তি....
কপি