22/02/2023
কিছু খবর আছে শুনে হতভম্ব হতে হয়, খবরটা ছিল আমাদের জন্য অনেকটা তেমন। বছর চারেক আগের ঘটনা। আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় আমার চাচাত ভাই । মাঝে মাঝে তার পেট ব্যথা করতো, কিন্তু হঠাৎ ডাক্তারী পরীক্ষায় জানা যায় তার পাকস্থলীতে ক্যান্সার। শুধু ক্যান্সার তাইনা সেই ক্যান্সারের সেল এমন ভাবে ছড়িয়ে গেছে যে ডা: বলেই দিয়েছিলেন তার আয়ু খুব বেশী হলে দেড় মাস। ক্যামোথেরাপির দেয়ার স্টেজও নাই। আমরা সবাই হতভম্ব। যে ভাই আমার নিষিদ্ধ পানীয়ের তো প্রশ্নই উঠেনা, একটা সিগারেটও দূরের কথা, সাধারণ চাও খেতো না। এত নরম একজন মানুষ ধুপ করে তার পেটে চতুর্থ স্টেজের ক্যান্সার! মাত্র দেড় মাস আয়ু!
দোলন ভাইয়াকে ঢাকার পান্থপথের এক হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে।আমার পঁচাত্তর বয়সী আব্বা আমার সাথে আদরের ভাইস্তাকে দেখতে হাসপাতাল গেলেন। আমি, আব্বা, ভাবি, কিছু আত্মীয় হসপিটালের এগারো তলার ক্যান্সার ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে। ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আমি ছোটবেলায় স্মৃতি মনে করছি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম, কে জানতো এত স্বল্পভাষী বিনয়ী ছেলেটার জীবনের শেষের বাঁশীটা রেফারী এত তাড়তাড়ি বাজিয়ে দিবেন। ভাইয়ার পাশের বেড এ একটা ক্লাশ ফাইভে পডুয়া ক্যান্সার রোগী। কমাস পর সমাপনী পরীক্ষা দেবার কথা ছিল। ছেলেকে নিয়ে কোচিং সেন্টারে দাঁড়াদৌড়ির বদলে তার মা হতভম্ব হয়ে ছেলের মাথার কাছে বসে আছেন। ঐ দিকের বেড এ আড়াই বছরের ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রোগী।পাশের অন্যান্য ক্যান্সার রোগীদের দেখে ভাবছি আমরা সবাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো কিন্তু এই মানুষ গুলোর জীবন খেলার শেষ বাঁশী বেজে গেছে।
মনটা আমার দুমড়ে- মুচড়ে যাচ্ছে বেদনায়। হঠাৎ মনে হলো হাসপাতালের মেঝে দুলছে, প্রথমে মৃদু , তারপর চরম ভাবে। ভূমিকম্প! আমি জানিনা আপনারা এগারো তলা বা তার উপরের ভূমিকম্পের দুলনী খেয়েছেন কিনা। কি ভয়াবহ দুলনী। পুরো ফ্লোর নৌকার মত দুলছে। সবাই আতঙ্কে অস্হির হয়ে গেলাম। আমার মনে হলো কেউ আমার কানে জোরে জোরে বলছে,” নীনা, পালা, পালা, তোর জীবনের শেষ বাঁশী বেজে গেছে, জলদি নীচে যা, দৌড়ে পালা।”
কিছুক্ষণ আগে ভেবেছিলাম এই ক্যান্সারের রোগীরা আর ক’মাস বাঁচবে, ভূমিকম্পের দুলুনিতে মনে হলো আমি হয়তো আর কয়েক মিনিটও বাঁচবোনা।
হাসপাতালের এত মানুষ কিন্তু দুটো মাত্র লিফ্ট। বুড়ো বাবা, মৃত্যুপথযাত্রী ভাই, শোকে স্তব্ধ হওয়া ভাবি এদের নিয়ে কিভাবে আমি এগারো তলা থেকে নামবো? দুলনী বাড়তেই থাকলো....ভাবি বললো,” নীনা, তোমরা নেমে যাও, তোমার ভাইয়া এমনিতেও তো মাত্র দেড় মাস... তোমরা নেমে যাও।”... কিন্তু ওদের ফেলে কিভাবে নামি। আতন্কগ্রস্ত হয়ে ভূমিকম্পের দোলায় দুলতে থাকলাম আমরা সবাই।
একসময় দুলুনি থামলো। আমরা আবার নতুন জীবন ফিরে পেয়ে মৃদু হাসলাম।শুধু হাসলো না ভাইয়া। কারণ ভুমিকম্পের দুলুনিতেও তার কোন বিকার ছিল না। জীবন মৃত্যুর এক ঘোরে আছে সে। চলে আসার সময় হলো আমাদের।আমি জানি হয়তো এটাই ভাইয়ার সাথে আমার শেষ দেখা। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে, আপ্রাণ চেষ্টায় চোখের পানি চোখে আটকে করুন হাসিতে ভাইয়াকে মিথ্যে আশ্বাসের বানী শুনিয়ে ফেরার পথ ধরি। একবারও পেছন ফিরে তাকালাম না। আমি জানি তাকালেই আমি কেঁদে ফেলবো।
রুমের বাইরে আসার পর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগলো, চোখের পানি আড়াল করতে করতে ভাবছিলাম আমরা সবাই মগ্ন জীবন মাঠের খেলায় । কখনও ফাউল করছি, কখনও সাফল্যের গোল দিচ্ছি। শেষ বাঁশীর কথা ভুলে আনন্দে জীবন খেলার আমরা খেলেই যাচ্ছি।কেউ কিন্তু জানি না রেফারী কখন আমাদের জীবনের শেষ বাঁশীটা বাজিয়ে দিবেন। জানি কি?
লেখাটা বেশ কয়েকবছর আগের। হঠাৎ চোখে পড়লো তাই শেয়ার করলাম।
হুমায়রা নাসরীন নীনা
ঢাকা