16/08/2024
:2
রোদ আর রোদ্রি সারার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে দেয়। সারা খেয়ে হিয়া কে নিয়ে হসপিটালে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।
সারা হসপিটালে পৌঁছে গেলে সবাই ওকে ওয়েলকাম জানায়। সারা সবার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে হিয়া কে বলে পেশেন্ট পার্টির সাথে কথা বলে ওটি রেডী করতে বলে।
এদিকে মাহির রা চলে এসেছে কিছুক্ষণ পর অপারেশন শুরু হবে। মাহির,রোহান চৌধুরী, নিশাত চৌধুরী ডাক্তারের এসিস্ট্যান্টের কথা বলছে অপারেশন বিষয়ে।ঝুমুর চৌধুরীর হাসবেন্ড এর অপারেশন নিলিমা ঝুমুরকে সান্ত্বনা দেওয়া চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই অপারেশন শুরু হয়ে যায়। অপারেশন থিয়েটারে বাইরে তার পরিবারের লোকগুলো অধির আগ্রহে বসে আছে একটা ভালো খবরে আসায়।টানা তিন ঘণ্টা ধরে অপারেশন চলে। সারা আজ পর্যন্ত কোনো অপারেশন অসফল হয়নি।আজও তাই অপারেশন সাকসেসফুল করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসে সারা। হিয়া কে পেশেন্ট পার্টির সাথে কথা বলতে বলে ওকে যে কেবিন দেওয়া হয়েছে সেখানে চলে যায় সারা। সারা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তিনটার কাছাকাছি বাজে এখন ওর বাড়ি যাওয়া দরকার। সারা ওর সব প্রয়োজনিয় জিনিস আর হিয়া কে সাথে নিয়ে কেবিন থেকে বের হলে একজন নার্স এসে বলে।
নার্স : মেম পেশেন্টের বাড়ির লোক একবার আপনার সাথে কথা বলতে চাই।
সারা : নাউ আই এম বিজি।
নার্স : মেম ওনারা দুই মিনিট কথা বলবে প্লিজ!
সারা : ওকে। হিয়া দেখোতো ওনারা আবার কি বলবে।
হিয়া : ওকে মেম।
হিয়া একটু এগিয়ে যায় পেশেন্টের ফেমেলির সাথে কথা বলতে। সারা ওর ফোনে ইমেইল চেক করতে ব্যস্ত হয়ে যায়। হঠাৎ পিছন থেকে হিয়া বলে।
হিয়া : মেম এনারা আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে।
রোহান চৌধুরী : একচুয়ালি মেম আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দি......( সামনে থাকা ব্যাক্তিকে দেখে আর কিছু বলতে পারে না। )
সারা কারো কথা শুনে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তার অতি আপনজনেরা দাঁড়িয়ে আছে। সারা ওদের দেখে তার অতীত আবার তার সামনে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নিজেকে সামলে শক্ত করে বলে।
সারা : ধন্যবাদ দেওয়া দরকার নেই।এটা আমার দায়িত্ব ছিলো।আসি।
রোহান চৌধুরী : সারা মামনি।( খুব জোরে বলে ডাকে। )
রোহান চৌধুরীর ডাক শুনে সবাই এদিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। এসে সারা কে দেখে সবার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে। সারা ফিরে তাকিয়ে বলে।
সারা : আর কিছু বলবেন আপনি।পেশেন্ট ভালো আছে কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হলে যাবে। হিয়া চলো আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
হিয়া : চলুন মেম।
সারা হাঁটা শুরু করলে নিশাত চৌধুরী এসে সারা কে জড়িয়ে ধরে বলে।
নিশাত চৌধুরী : প্লিজ মামনি আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি না জেনে তোকে যা নয় তাই বলছি। এমনকি তোর গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছি।( কান্না করে )
সারা নিশাত চৌধুরী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে।
সারা : আপনার কোথায় ভুল হচ্ছে মিসেস চৌধুরী। আপনি যাকে ভাবছেন আমি সে নই।( নিজের স্বাভাবিক রেখে )
রোহান চৌধুরী : তুই এসব কি বলছিস সারা। জানিস আমরা তোকে এই পাঁচ বছর কোথায় না কোথায় খুঁজেছি।ডাক্তর এস চৌধুরী যে তুই আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। আমাদের ক্ষমা করে দিয়ে চল না আমাদের সাথে।
সারা : তখন থেকে কি সব বলে যাচ্ছেন!আমি তো বললাম আমি আপনাদের কাউকে চিনি না।( শান্ত গলায় )
নিলিমা : মামনি তুই তোর মামনি কেও চিনতে পারছিস না।( কান্না করে )
মাহি : ভাবী তুমি জানো আমি তোমাকে কত মিস করেছি। তোমার সাথে দুষ্টুমি গুলো সবথেকে বেশি মিস করেছি।( জড়িয়ে ধরে কান্না করে বললো )
সারা মাহি কে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে।
সারা : আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে আপনারা যাকে ভাবছেন আমি সে নই।
জারা : তুই বলবি আর আমি বিশ্বাস করবো। আমি জানি তুই আমার আপু।প্লিজ রাগ করে আর থাকিস না।
আরফিন : হ্যা আপু। জারা ঠিক বলছে।প্লিজ আর রাগ করে থাকিস না।
আরাফ : আপু তুই আমার কথাও শুনবি না।
সারা কিছু বলবে তার আগেই রোদ আর রোদ্রি মাম্মা মাম্মা বলে সারার পা জড়িয়ে ধরে। সারা বেশ অবাক হয় ওদের হসপিটালে আসায়। সারা ওদের দুজনকে কোলে নিয়ে বলে।
সারা : সোনা তোমরা এখানে।
মাহিন এসে বলে।
মাহিন : আমি নিয়ে এসেছি ওদের।
সারা : কিন্তু কেনো?
মাহিন : রোদ্রি প্লান করেছে আজ বাইরে খাবে আর ওর মাম্মা কে সারপ্রাইজ দেবে তাই।( হেসে হেসে )
সারা খুব খুশি হয়ে বলে।
সারা : তাই সোনা?
রোদ্রি : ওয়য় মাম্মা।দানো মাম্মা ভাই না কি তকলেট খাবে। আমি উকে তকলেট খেতে মানা করেছি।তকলেট খেলে তো দাঁতে পুকা হয় তাই না মাম্মা।
সারা : হ্যা মা তুমি তো একদম ঠিক কথা বলেছো!
রোদ : না মাম্মা আমি থুদু না বোন ও বলছে ও নাকি আতক্রিম খাবে।আতক্রিম খেলে তো নান্ডা লাগবে।
রোদ্রি : এই পতা ছেলে আমি তুকে চুপ থাকতে বলেথি না। ( রেগে গিয়ে )
সারা : মাম্মা কিন্তু রেগে যাচ্ছে।
রোদ,রোদ্রি : থরি মাম্মা। ( বলে দুজনে সারার দুই গালে চুমু দেয়। সারা ওদের কান্ড দেখে মুচকি হেসে বলে। )
সারা : ইটস ওকে কলিজারা।
সারা ওদের সাথে কথা বলতে এটাই ব্যস্ত ছিলো।ওর আশেপাশের মানুষ যে ওর আর ওর বাচ্চাদের মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে কান্না করছে সে দিকে ওর খেয়াল নেই। হঠাৎ করে নিশাত চৌধুরী বলে।
নিশাত চৌধুরী : ওরা আমাদের নানুভাই সারা?( চোখে পানি আর মুখে হাসি নিয়ে কথাটা বললো।)
রোদ্রি : মাম্মা উনারা তারা?কানু করছে তেনো?
সারা : এনারা পেশেন্টের বাড়ির লোক। উনাদের বাড়ির লোক অসুস্থ তাই কান্না করছে।
রোদ্রি : অহহহ।কানু করো না আমার মাম্মা উনাকে তোলো করে দিবে।
রোদ্রির কথা শুনে কান্না করে সারা কে বলে।
নিশাত চৌধুরী : দিবি না ওদের আমাদের কাছে?
সারা : অপরিচিত লোকদের কাছে আমি আমার সন্তানদের দি না।
সারা এমন কথা সবার বুকে তীরের মত বিঁধে। কিন্তু ওদের বলার মত মুখ নেই। একদিন ওরাই সারা কে মিথ্যা দোষে অপমানিত করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
সারা : রোদ,রোদ্রি তোমরা তোমার ডেডার সাথে গাড়িতে গিয়ে বসো আমি এক্ষুনি আসছি কেমন।
রোদ,রোদ্রি : ওকে মাম্মা।
সারা : তুমি ওদের নিয়ে গাড়িতে বসো আমি আসছি।
মাহিন : আসো বেবিস ডেডার কাছে আসো।
মাহিন রোদ আর রোদ্রি কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। মাহির এক কোনায় দাঁড়িয়ে সব দেখছে সারা কে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। নিজের সন্তানদের দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারছে না।নিরবে চোখের পানি ফেলছে। সারা আবার বলতে শুরু করে।
সারা : মিস্টার চৌধুরী আমার মনে হয় না পেশেন্টের আর কোনো সমস্যা হবে।তাও যদি সমস্যা হয় আগে যে doctor উনাকে দেখতো তাকে দেখিয়ে নিবেন। আচ্ছা আসি। হিয়া চলো।
সারা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলে সবাই। সারা চলে গেলে নিলিমা আর মাহি ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায় মাহিরের দিকে।মাহি রেগে ওর ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলে।
মাহি : আজ শুধু আপনার জন্য আমাদের এই দিন দেখতে হয়েছে।যে ভাবী কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতো না সে ভাবী আজ এতটা বদলে গেছে।আজ শুধু আপনার জন্য আমি আমার পুচকু দুটোকে আদর করতে পারিনি। আমি কখনো আপনাকে ক্ষমা করবো না। কখনো না।( কান্না করতে করতে হসপিটাল থেকে চলে যায়। )
এদিকে সারা বাচ্চাদের নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। ওদের খাইয়ে একটু আশেপাশেটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে বিকালে বাড়ি গিয়ে বাচ্চাদের ফ্রেশ করিয়ে ওদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে সারা নিচে বাগানে হাঁটতে বের হয়। সারা কিছুক্ষণ হেঁটে বাড়ির ভিতরে গেলে দেখে মাহিন হল রুমে বসে আছে। সারা মাহিন এর পাশে বসলে মাহিন বলে।
মাহিন : আপু আজ হসপিটালে কারা এসেছিল?
সারা : আমার অতীত। আমার বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
মাহিন : কার অপারেশন করেছিস আপু?
সারা : ছোট পাপার।
মাহিন : তুই কি আগে থেকেই জানতিস আপু?
সারা : হ্যা।ইউকেতে যখন পেসেন্টের ডিটেস পাঠায় আমি পেসেন্টের নাম দেখে চিনে যাই। একবার চিন্তা করি অপারেশনটা করবো না।পরে চিন্তা করি কতদিন আর লুকিয়ে থাকবো।তাই নিজেকে শক্ত করে অপারেশন টার জন্য রাজি হয়ে যাই।
মাহিন : ভালো করেছিস। এবার থেকে সবার মুখের উপর জবাব দিবি। আমার বোনকে আরো শক্ত হতে হবে।
সারা : তোর মত ভাই থাকলে আর কিছুর প্রয়োজন হয় না রে।
সন্ধ্যায় শোহান খান বাড়িতে এলে মাহি তার বাবাই কে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়।শোহান তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে।
বাবাই : কি হয়েছে আমার মায়ের কান্না করছে কেনো?
মাহি : বাবাই জানো আজ ভাবী এসেছিলো।
বাবাই : ককককি? কখন?( অবাক হয়ে )
এরমধ্যে নিলিমা এসে বলে।
মামনি : আজ হসপিটালে এসেছিলো।আর শোহান ভাইয়ের অপারেশন টা ও করেছে।
বাবাই : সারা তোমাদের কিছু বলেনি।
মামনি : ও সবাইকে চিনতে অস্বীকার করেছে।কারো সাথে কথা বলে নি।
বাবাই : অহহহহ....( ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে। )
মাহি : জানো বাবাই ভাবীর পুচকু দুটো কি মিষ্টি দেখতে হয়েছে।রোদ্রি কি পাকা পাকা কথা বলে।( হেসে হেসে )
মামনি : জানো সারা ওদের কাউকে কোলে পর্যন্ত নিতে দেয়নি।
বাবাই : ওর সাথে যা হয়েছে এর থেকে বেশি আশা করাই তোমাদের ভুল।
মাহি : বাবাই পুচকু দুটোকে বাড়িতে আনবে না। ভাবী মনে হয় কল পরশু আবার ইউকে চলে যাবে। বাংলাদেশ এসেছিলো অপারেশন টা করতে।
মামনি : তুই জানলি কি করে?
মাহি : ভাবীর এসিস্ট্যান্টকে ফোনে কথা বলতে শুনেছি।তারা খুব তাড়াতাড়ি আবার ইউকে বেক করবে।
বাবাই : কোন মুখে সারার সাথে কথা বলবো বল।দেখি ভাগ্য আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।( দৈর্ঘ্য শ্বাস ফেলে। )
To be continue...🍁