16/08/2026
সিরাজ সিকদার বরিশালে ঈদের ছুটিতে তার গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। বাড়িতে এসে দেখে ঈদের দিন সবাই নতুন জামাকাপড় পড়ে আনন্দ করছে কিন্তু তাদের বাড়ির কাজের মেয়েটা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা কাজ করে যাচ্ছে।
নিজেরা ঈদ উদযাপন করছে অথচ বাড়ির কাজের মেয়েটা ময়লা কাপড় পড়ে পরিশ্রম করে যাচ্ছে দেখে প্রচন্ড মায়া হয়েছিল সিরাজের। সে তার মাকে বলেছিল মেয়েটাকে ছুটি দিতে কিন্তু দেয়নি।
এজন্যে দয়ালু সিরাজ তখনই কাজী অফিসে গিয়ে নিজের বাড়ির কাজের মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল, স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল।
সিরাজ সিকদার লোকটা এমনই দয়ালু আর পাগলাটে ছিল। যুদ্ধের আগেও সে মুক্তিবাহিনীতে কাজ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পছন্দ না হওয়ায় নিজেই দল গঠন করেছিল।
সবার সমান অধিকারে বিশ্বাস করতো বলে দলের নাম দিয়েছিল- 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন।'
স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে লাগল, জনগণের ভালোবাসা পেতে লাগল।
কিন্তু এটাই পছন্দ হয়নি শেখ মুজিবের।
এজন্যে ১৯৭৫ সালের এক রাতে শেখ মুজিবের নির্দেশে গ্রেফতার করা হয় তাকে। পরদিন মুজিব তার সাথে দেখা করে পদ পদবির লোভও দেখিয়েছিল কিন্তু কাজ হয়নি।
এজন্যে সেদিনই নির্জন এক জায়গায় নিয়ে পেছন দিকে হাত বেঁধে অসংখ্য গু*লি করে মেরে ফেলা হয়েছিল তাকে। এত বেশি গু*লি করা হয়েছিল যে পুরো পিঠ ঝাঁঝরা করে ফেলা হয়েছিল।
মারার পর শেখ মুজিব সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে দম্ভ নিয়ে বলেছিল- কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?
সিরাজ সিকদার এতটাই প্রতিবাদী মানুষ ছিল যে তাকে সম্মান করে সবাই 'লাল ঘোড়া' বলে ডাকতো। অথচ সেই মানুষটা আজও কোন বিচার পায়নি।
শুধু সিরাজ সিকদারই না সিরাজুল আলম খান নামে আরেকজন জনদরদী নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম" এই স্লোগানটা উনিই শেখ মুজিবকে লিখে দিয়েছিলেন।
যুদ্ধে অসংখ্য অবদান রাখার পরও তিনি দেখেছিলেন আওয়ামী লীগ জনগণের কথা রাখছে না তাই নিজে 'জাসদ' নামে আরেকটা দল গঠন করেছিলেন।
কেন সে আরেকটা দল গঠন করল এই ক্ষোভ থেকেই শেখ মুজিব রক্ষী বাহিনীদের দিয়ে জাসদের ত্রিশ হাজার কর্মীকে মেরে ফেলেছিল। আই রিপিট ৩০ হাজার!
মুজিবের পালিত রক্ষীবাহিনীরা তখন ওপেনে অ*স্ত্র হাতে শোডাউন দিয়ে ধ*র্ষণ করতো, লুটপাট করতো।
এই রক্ষীবাহিনীরই একজন গাজীপুরের এক অসহায় নতুন বউকে দিনেদুপুরে ধ*র্ষণ করেছিল। অসহায় বউটা সেদিন শেখ মুজিবের কাছে বিচার চেয়েছিল কিন্তু মুজিব বিচার তো করেই নাই উল্টো কল দিয়ে ধ*র্ষককে থানা থেকে ছুটিয়ে এনেছিল।
মুজিব বিচার করেনি কারণ বিচার করলে তার কর্মীদের মনোকষ্ট হবে, ক্ষমতা কমে যাবে।
যুদ্ধের পর মুজিব ক্ষমতার জন্যে এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছিল যে স্বৈরাচারী বাকশাল গঠন করেছিল, ৪ টা পত্রিকা বাদে বাকিসব ব্যান করে দিয়েছিল।
এরপর তাজউদ্দিন আহমেদ থেকে শুরু করে মাওলানা ভাসানী সবাইকে বাদ দিয়ে দুর্নীতিবাজদের নিজের সাগরেদ বানিয়েছিল।
তাদের লুটপাট আর চোরাচালানের কারণে ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গিয়েছিল। দেশের অসহায় মানুষগুলো, ছোট ছোট মাসুম বাচ্চাগুলো না খেয়ে মরছিল।
খাবারের এতটাই সংকট দেখা দিয়েছিল যে মানুষ ভাতের ঝাউ খেতো, গাছের শিকড় খেতো, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা লতাপাতা সিদ্ধ করে খেতো।
মহিলারা একমুঠো চালের জন্যে তাদের পড়নের কাপড়টাও বিক্রি করে দিতো। কাপড় না পেয়ে মাছ ধরার জাল পেচিয়েই দিনের পর দিন কাটিয়েছিল এই হতভাগা নারীরা।
বাচ্চা বাচ্চা শিশুগুলো মায়ের বুকের দুধের জন্যে কান্না করতো, চিৎকার করতো। কিন্তু মা দুধ দিবে কোথা থেকে? সে নিজেও যে দিনের পর দিন না খাওয়া।
সে সময়ের দুর্ভিক্ষের নিউজ করতে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক জন পিলজার এদেশে এসেছিল। তিনি এসে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হাত ধরতে গিয়ে দেখেছিলেন তাদের চামড়া তার হাতের সাথে মোমের মতো লেগে যাচ্ছে।
বাচ্চারা তখন এতটাই রোগা ছিল যে ক্ষুধার্ত কুকুর মায়ের কোল থেকে বাচ্চাদেরকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলতে চাইতো, কাক এসে ক্ষুধার জ্বালায় বাচ্চাদের মাথার মগজ খেতে ঠুকরাতো।
এই তীব্র ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে অসংখ্য মানুষ আত্মহ*ত্যাও করতে চাইতো। সেই দুর্ভিক্ষ এতটাই ভয়ানক ছিল যে ১৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। আই রিপিট ১৫ লক্ষ!
লা*শ দাফন করার মতো কাফনের কাপড়ও পাওয়া যেত না। তাই কলাপাতায় কোনরকম লা*শটা পেচিয়ে গর্তে ফেলে দেয়া হতো।
একদিকে এত এত মানুষ মরছিল অথচ অন্যদিকে মুজিবের রক্ষীবাহিনীরা রিলিফের চাল, গম ,আটা সব লুটপাট করে নিয়ে গিয়েছিল।
মুজিব সবই জানতো কিন্তু কর্মীদেরকে কিচ্ছু বলতো না।কারণ বললে তার দলের লোক কমে যাবে, ক্ষমতা কমে যাবে।
মুজিব কিছু বলতো না আবার কাউকে প্রতিবাদও করতে দিতো না। দুর্ভিক্ষের সময় কবি রফিক আজাদ 'ভাত দে হারামজাদা নয়তো মানচিত্র চিবিয়ে খাব' লাইনটা বলে প্রতিবাদ করায় তাকেও আওয়ামী বাহিনীরা মারধর করতে গিয়েছিল।
এসব করে করে আওয়ামী লীগের নেতারা তখন বেশ ভালোই দিন কাটিয়েছে, ফুর্তি করেছে।
এমনকি মুজিবও এর কিছুদিন পরই তার দুই ছেলেকে সোনার মুকুট পড়িয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিল, লাখ লাখ টাকা খরচ করেছিল।
অথচ দেশের লাখ লাখ মানুষ , ছোট ছোট বাচ্চারা তখন অনাহারে, অর্ধাহারে মারা যাচ্ছিল।
মুজিবের সেসব কালো অধ্যায়ের ইতিহাস আমাদের কাউকেই জানতে দেয়া হয়নি। যুদ্ধের আগের মুজিবকেই শুধু আমকদেরকে পড়ানো হয় কিন্তু পরের মুজিবের রূপটাকে আর দেখানো হয় না।
শেখ হাসিনা মুজিবের জন্মদিন আর মৃত্যুবার্ষিকতে কোটি কোটি টাকা খরচ করতো তার যুদ্ধের সময়কার ইতিহাসটা দেখাতে। কিন্তু পরেরগুলো আর দেখাতো না, আমরাও আর জানার চেষ্টাটুকু করিনি।
শেখ হাসিনারও ভয় হতো যদি এসব ইতিহাস জনগণ জেনে যায় তাহলে মুজিবকে মানুষ মন থেকে উঠিয়ে দিবে। এজন্যে সে ফন্দি করে সেসব ইতিহাসই বই থেকে উঠিয়ে দিয়েছিল।
টিস্যু পেপারকে ব্যবহারের পর যেমন নির্মমভাবে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় ঠিক তেমনি ৭২-৭৫ সালের সেই বীভৎস ইতিহাসগুলোও আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল।
শুধুমাত্র যুদ্ধের ইতিহাসটুকু জেনেই আমরা অনেকে হয়তো মুজিবকে আগবাড়িয়ে সম্মান দেখাই, বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই কিন্তু বাকি ইতিহাসটুকু আর মনেই করি না।
মুজিবকে মনে রাখার জন্যে হাসিনা কোটি টাকার মূর্তি বানিয়েছে, জাদুঘর বানিয়েছে, অনুষ্ঠান করেছে এজন্যে তাকে হয়তো অনেকে মনে রাখবে
কিন্তু যেই গরিব মানুষগুলো দুর্ভিক্ষে মারা গেছে, যেই অসহায় মায়ের বুক থেকে ক্ষুধার্ত কুকুর বাচ্চাকে খেয়ে ফেলার জন্যে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সেই মা'টাকে কেউ আর মনে রাখবে না, কোনদিনও না।