22/04/2023
রমজান মাসের শেষ দিকে আমার খুব খারাপ লাগে! এ সময় মানুষ শপিংয়ে যায়।
আমিও যাই মাঝেমাঝে। কাপড়ের দোকানগুলোতে ঘুরি। কখনো কখনো দুয়েকটা কাপড় দেখি।
কাপড়ের ওপরে হাত বুলিয়ে দেখি। কী মোলায়েম কাপড়। রংটাও ভালো। মা কে খুব মানাত।
দোকানদার কাপড়ের গুন বলে যায়। এটা খুব ভালো সুতা। পরে খুব আরাম পাবে।
কাপড়টা ধরে অনেকটা সময় আমি বসে থাকি। শেষপর্যন্ত কাপড়টা কেনা হয় না! আমার চোখের কোনে জল জমে। আমি উঠে পড়ি। দোকানদার বোধহয় কিছু বুঝতে পারে।
পিছন থেকে বলেন," ভাই কাপড়টা নিয়ে যান। আপনার জন্য কেনা দামে দিবো।"
আমি হাঁটতে থাকি। কখনো ফিরে তাকাই না। পকেটে হাত দিই। মানিব্যাগটা ফুলে আছে। এক হাজার টাকার অনেকগুলো নোট।
নগদ টাকা ছাড়াও আমার সাথে তিনটা কাড আছে। যা দিয়ে কয়েক লাখ টাকার পন্য কেনা যায়।
আমরা তখন যাত্রাবাড়ির একটা টিনসেড বাড়িতে থাকি। বাবা একটা সরকারি অফিসের কেরানির চাকরি করেন। বেতন খুব সামান্য। তারউপরে গ্রামেও টাকা পাঠাতে হয়।
ইদের সময় আসলে বাবা আমার জন্য নতুন জামা কিনতেন। মায়ের জন্য সব সময় ইদে কাপড় কিনতে পারতেন না!
একবার রমজানের শেষাশেষি বাবা আমাদের নিয়ে বের হলেন। আমরা বলতে আমি আর মা।
মা খুব একটা বের হন না। সেদিন বাবার কথায় বের হয়েছেন। একটা বড়ো শপিংমল দেখে আমার যেতে খুব ইচ্ছে হলো। মা কে বলায়। মা বাবা কে বলে রাজি করাল।
আমরা শপিংমলে ঘুরে দেখতে লাগলাম। একটা দোকানে ঢুকে মা কাপড় দেখল। বেশ কয়েকটা কাপড় দেখল। মার মনে হয় কাপড় পছন্দ হয়েছে। মা কিছুই বলল না। মা তো জানে এ কাপড় কেনার সামর্থ বাবার নেই!
আমরা দোকান থেকে বের হয়ে পড়ি। দোকানদার পিছন থেকে ডাকে। আমার বাবা বলেন," কাপড়টা তো ভালোই! নিয়েনি কী বলো?"
মা বলেন," না, কাপড়টা খুব একটা ভালো না! রংটা কেমন জানি!"
দোকানদার ডাকতে থাকে আমরা আর ফিরে যাই না।
তখন বুঝিনি! এখন বুঝি কাপড়টা মায়ের ঠিকই পছন্দ হয়েছিল।
আমি পান্জাবির দোকানে ঢুকি। বয়স্ক মানুষের পাঞ্জাবি দেখি। একটা পান্জাবি আমার খুব ভালো লাগে! কিনে ফেলতে ইচ্ছে করে!
পান্জাবিটা বাবা কে খুব মানাবে। এমন একটা পাঞ্জাবি বাবা কখনো পরেনি!
বাবার সামান্য বেতনের চাকরি দিয়ে আমার পড়াশোনার খরচ আর সংসারের খরচ চালতেই বাবা হিমশিম খেতেন। আবার এমন দামি পান্জাবি কিনবেন কী করে?
কলেজে খুব ভালো রেজাল্ট করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। বাবা কী খুশি! আমার ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট শুনে বাবা দশ কেজি মিষ্টি কিনে ফেললেন! যাকে পান ধরে বাসায় নিয়ে আসেন। মিষ্টি খাওয়ান আর আমার ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের খবর দেন।
বাবা আমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখতেন। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরের বছরই বাবা চলে গেলেন!
ভার্সিটিতে এসে মাত্র দুইটা ক্লাস শেষ করেছি। পরের ক্লাস হতে সময় লাগবে। মাঝে ঘন্টা দুয়েক সময় আছে। বসে আছি মাঠে। এ সময় মায়ের ফোন আসল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "দ্রুত বাসায় আয়।" মা আর কিছু বলতে পারল না। শব্দ করে কাঁদতে লাগল!
আমার বুকের ভিতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল! চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করলাম। দ্রুত বাসায় আসলাম। আমার অবস্থা বুঝে বন্ধু সোহেল এলো সাথে।
বাসায় ফিরে দেখলাম। বাবাকে ধবধবে একটা সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে! মা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন!
বাবা চলে যাওয়ার পর। বাবার অফিসের পেনশনের টাকা দিয়ে কোনোমতে পড়াশোনা চালালাম। সাথে দুয়েকটা টিউশনির টাকা।
পড়াশোনা শেষ করেই আমার চাকরি করার ইচ্ছে হলো না। বাবাকে তো দেখেছি। চাকরির টাকায় কিছু হয় না।
বাবার পেনশনের কিছু টাকা আর মায়ের কিছু গয়নার টাকায় ব্যবসাটা শুরু করেছিলাম। মাও কেনজানি চাকরির পক্ষে ছিলেন না। ব্যবসা করার কথায় খুশিই হয়েছিল।
বহুত দৌড়াদৌড়ি করে ব্যবসাটা যখন মোটামুটি দাঁড় করেছি। পরের বছর রমজান মাসের মাঝামাঝি সময় মা চলে গেলেন বাবার কাছে!
আমার পাঞ্জাবি কেনা হয় না। শপিংমল থেকে বের হয়ে যাই। ম্যানেজার কল দিয়েছে। দোকানের ভিতরে কথা বলা যায় না।
বাইরে এসে কল রিসিভ করলাম।
"রইস বলো।" আমার ম্যানেজারের নাম রইস। বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। খুবই কাজের ছেলে।
"স্যার, হিসাব করে ফেলেছি। এ বছর ইসলামি ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে আমাদের যাকাত হয়েছে পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার টাকা।"
আমি যাকাতের কাপড় টাপড় কিনি না। প্রতিবছর যাকাতের টাকাটা একটা পরিবার কে দিয়ে দিই। প্রতি বছর একটা পরিবার দাঁড়িয়ে যাক।
আমার মতো এমন দোকানে দোকানে ঘুরে কাপড় কেনা হয় না, আপন মানুষের অভাবে!
Nabil Mahmud
***ছবিতে ফলের ঝুড়ির খাঁটি ঘী।