03/01/2026
মাত্র সহকারী কমিশনার থেকে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হয়েছি। অনেক অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন চট্টগ্রাম মেট্রো'র উপ পরিচালক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কেন্দ্র আগ্রাবাদের এক নামকরা ডিপার্টমেন্ট স্টোর, ব্যবসার আড়ালে অবৈধ বিদেশি ম^দের ব্যবসা করে। সংবাদ পাওয়ার পর অভিযানের দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। অথচ ঐ স্টোর থেকে আমি নিজেই বাজার করি এবং অসম্ভব ভাল সম্পর্ক আমার সাথে তাদের সবার।
আমাকে দায়িত্ব দিয়ে আমার উর্ধতন কর্মকর্তা আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। বললাম, সমস্যা নেই স্যার, কাজের ক্ষেত্রে আমি বাপ মাকেও চিনি না।
সন্ধ্যায় অপারেশন হল। দূরে অবস্থিত গোডাউনে রক্ষিত প্রচুর বিদেশি ম^দসহ মালিক গ্রেফতার হল। তাকে নিয়ে যাওয়া হল, সিটি কলেজের সামনে অধিদপ্তরের ব্যারাকে। এরপর শুরু হল আসল খেলা।
চট্টগ্রাম শহরের সব প্রশাসনিক অফিসের প্রধান কর্মকর্তা (নামগুলো বললাম না)। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম। ঢাকার অনেক মন্ত্রণালয়। অনেক মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন। ফোনের পর ফোন আসা শুরু হল। তখন মোবাইল ফোন ছিল। অভিযুক্তকে ছেড়ে দিতেই হবে। মামলা দেয়া যাবে না।
সারা রাত প্রায় ৬০/৭০টি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল ব্যারাকের সামনে। এরমধ্যে সরকারি অফিসের গাড়িও ছিল। মানুষ আর মানুষ। এত সরকারি লোকজন দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক বড় কর্মকর্তাও ছিলেন। ছিলেন বড় বড় ব্যবসায়ী। সবাই এসেছে অভিযুক্তে ছেড়ে দেয়ার তদ্বিরে। আমি একজন সহকারী কমিশনার মাত্র।
মনে হল ম^দের রাজ্যময় পুরো দেশ। পরদিন তাকে চালান দিয়ে মামলা দায়ের করা হল। মজার বিষয় হচ্ছে, ঐ স্টোরের মালিকেরা পরে দোকান উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন তুলে ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ।
সরকার পার্টির জেলা সভাপতির চার চ্যালাকে গ্রেফতার করা হল প্রচুর মাদকসহ। সভাপতি বারবার ফোন দিলেন তাদের ছেড়ে দিতে। হাজতে পাঠিয়ে মামলা দেয়া হল। উনি হুমকি দিলেন, দেখে নেবেন আমাকে।
বিশাল মন্ত্রীর বন্ধুর এক ট্রাক বিদেশি বিয়ার আটক করা হল। প্রায় সাড়ে নয় হাজার হ্যা^নিকেন বি^য়ার। টেকনাফ থেকে ট্রাক যাচ্ছিল ঢাকায়।
বারবার ফোন, মাল ছেড়ে দিতে হবে। কোনো মামলা দেয়া যাবে না। নাহলে আমাকে দেখে নেয়া হবে। ট্রাকের সবাইকে গ্রেফতার দেখিয়ে যথারীতি মামলা এবং সব মাল জব্দ করে ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করা হল।
যাই হোক, সবাই দেখে নিলেন আমাকে। তিন দিন পরেই চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল বদলির আদেশ পেলাম।
চাকুরি জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ধরনের অসংখ্য কাহিনী আছে আমার। অনেকেরই আছে। তাঁদের সবাইকেই চেনেন আপনারা।
আমার ৩০ বছরের চাকুরি জীবনে কখনো কোনো মাস্তান, ক্যাডার, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, ছাত্র, অফিস কক্ষে ঢোকার বা চেহারা দেখাবার সাহস পায়নি। মন্ত্রী, সচিব, রাজনৈতিক দল, কখনো কারো অন্যায় আদেশ, নির্দেশ গ্রহন করিনি। সকল প্রকার তদ্বিরের ডিও/চিঠি পত্র, বস্তা বেঁধে ফেলে দিয়েছি। আমার বাবা মা, পরিবার, আত্মীয় স্বজন, সকলকেই বলা ছিল কোনো প্রকার তদ্বির না করার জন্য।
চাকুরি জীবনে কখনো কাউকে চাকুরী দেইনি বলে আত্মীয় স্বজন, এলাকাবাসী, গ্রামবাসী সবাই আমার উপর ক্ষুব্ধ এবং অসন্তুষ্ট। খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন।
মহান রবের অপার কৃপায় আমাকে হজম করার ক্ষমতা দুনিয়ায় কারো নেই। কাজেই কেউ আমাকে কাজের সুযোগ দেবে না। এটাই নিয়ম এদেশের।
আমলা ঠিক হলে দুষিত রাজনীতি ঠিক হতে বাধ্য। কয়জনকে বদলি আর ওএসডি করবে!!
দুষিত রাজনীতি আর দুষিত আমলাতন্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে এই দেশকে। সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী যখন দলবাজ হয়, তখন ফেরেশতাও আর পারবে না দেশকে ঠিক করতে।
সো, আমরা অনায়াসেই বলতে পারি, কেয়ামত পর্যন্ত এই দেশ আলোর মুখ দেখবে না।
(মিলন স্যার)
*** পোস্ট শেয়ার/কপি করবেন প্লিজ। নতুন বা নবীন সরকারি কর্মকর্তাদের জানা প্রয়োজন।