29/09/2024
তামাম দুনিয়া জুড়েই মাটন জিনিসটা অসম্ভব জনপ্রিয় হলেও বাঙাল মুলুকে এসে কিন্তু সে আক্ষরিক অর্থেই 'গো-হারা' হেরেছে। সোজা কথায়, গরুর কাছে হেরে গেছে।
আপনি একটু খবর নিলেই দেখবেন, মাটনের হরেক রকম প্রিপারেশন, রঙবেরঙের রেসিপি দুনিয়ার কোণায় কোণায় পেটুক লোকেদের ভুঁড়ি বাড়াতে সাহায্য করছে। অথচ পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তল্লাটে এসে আম-আদমির হেঁশেলে ঢুকে এর একটাই রেসিপি - খাসির 'তরকারি'। কাচ্চি কিংবা রেজালার অস্তিত্বকে একেবারে অস্বীকার করা যাবে না - তবে সেটাও আসলে ঢাকাইয়া, শৌখিন এবং বড়লোক না হলে আপনার জিভ পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
কিন্তু খাসি আসলে 'তরকারি' করে খাওয়ার মতো আইটেম না। খাসির মাংস দিয়ে বাঙালি কায়দায় ঝোল রাঁধার সমস্যাটা হচ্ছে - খাসির পরতে পরতে চর্বি। ঠিক মতো প্রসেস করতে না পারার কারণে এক রকম দুর্গন্ধ থেকে যায় - ফলে অনেকেই সেটা খেতে পারে না। 'গন্ধের কারণে' খাসির মাংস খায় না, এমন মানুষ অগণিত।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটটা মাথায় রাখলেই বুঝবেন, গরুর মাংস বাঙালি ভোজনরসিকদের জীবনে আসমানি রহমত হিসেবেই নাজিল হয়েছে। বনি ইসরাইলের জন্য যেমন জান্নাত থেকে মান্না-সালওয়া এসেছিল, বাঙালির জন্য তেমনি এসেছে মোটাসোটা গরুর পাল। গরুর মাংস এমনই একটা বস্তু, যেটা বাঙালির মশলা এবং পাকস্থলি - দুটোর সাথেই চমৎকার খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে।
গরু দিয়ে চাইলেই আপনি বাঙালি কায়দায় ঝোল রাঁধতে পারবেন। বেশি করে হলুদ-মরিচ এবং পানি দিয়ে পাতিল ভর্তি ঝোল। অথবা চাইলে করতে পারবেন আলু দিয়ে রান্না করা বোরিং তরকারি। তেল, কাঁচামরিচ আর মশলা সহযোগে গরুর কোর্মাও বানাতে পারেন। কিংবা চাইলে বাসাতেই বানিয়ে ফেলতে পারেন গরুর শাহি রেজালা।
এলাকা ভেদে গরুর ভিন্ন ভিন্ন আইটেমও কিন্তু আছে।
যেমন ধরেন চাটগাঁইয়ারা আমাদের দিয়েছে গরুর কালাভুনা। এই একটা জিনিস - খোদার কসম করে বলছি - খাওয়ার আগেই মরে গেলে আপনার জীবনটাই বৃথা। তবে অবশ্যই অথেনটিক চাটগাঁইয়া কালাভুনা খেতে হবে; ঢাকার পশ রেস্তোরাঁয় খেলে এর স্বাদটা বুঝবেন না। তারপরে আছে সিলেট অঞ্চলের সাতকড়া দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস। সাতকড়া জিনিসটা এমনিতে তেতো - কিন্তু গরুর মাংসের সাথে রাঁধলে এর ফ্লেভারটাই বদলে যায়। বগুড়ায় আছে গরুর আলুঘাঁটি - আলু আর গরুর এমন প্রিপারেশন যে খেলে মুখে লেগে থাকবে। কিংবা খুলনায় চুঁইঝাল দিয়ে গরুর মাংস। চুঁইঝাল জিনিসটা দেখতে একটু আজব লাগে - তবে গরুর ঝোলে মিশিয়ে দিলে আর আজব লাগবে না। ঝাল লাগবে, তবু ভাল্লাগবে!
গরু এমন একটা জিনিস যাকে অখাদ্য সবজির সাথে মিশিয়েও দারুণ সুস্বাদু আইটেম বানানো যায়।
যেমন ধরেন মিষ্টি কুমড়া। জিনিসটা পুষ্টিকর; কোনো সন্দেহ নাই। তবে সেই সাথে অখাদ্যও। এবার একে গরুর মাংসের সাথে মিশিয়ে দেন - দেখবেন কেমন টেস্টবাডে ধাক্কা লাগাবে। শীতকালে ফুলকপি বা বাঁধাকপি দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস তো রীতিমতো অমৃত।
তারপর আছে পুঁইশাক। পুঁইশাক দিয়ে গরুর মাংস রাঁধা যায় - এটা অনেকে হয়তো জানেনই না। প্রথমবার শুনলে অনেকেই নাক সিঁটকাবেন। তবে পুঁইশাক দিয়ে রান্না করা গরুর মাংসে, সামান্য লেবু চিপে নিয়ে প্রথম লোকমাটা মুখে দিলেই বুঝবেন - প্রেমিকার চুমুর স্বাদকেও হার মানাবে এই জিনিস।
তারপরে আছে বুটের ডাল। বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস - এই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম খাবার - নো ডাউট! ডালের সমুদ্রের নিচে ভাত লুকিয়ে রেখে মাখো-মাখো করে লোকমা বানানো; তারপর একটু করে মাংসের আঁশ ছিঁড়ে মিশিয়ে দেয়া - আর সাথে যদি থাকে একটা সেদ্ধ ডিম তাহলে তো আর কোনো কথাই রইলো না!
বাংলাদেশ বারোমাসি বৃষ্টির দেশ। এখানে ঝুম বৃষ্টির দুপুরে গরুর মাংস দিয়ে ল্যাটকা খিচুড়ি বা ভুনা খিচুড়ি - এর চেয়ে ভালো খাবার কি বেহেশতেও পাওয়া যাবে?
গরুর পাক্কি বা তেহারির কথা নাহয় বাদই দিলাম। কিন্তু গরু ছাড়া কাবাব কীভাবে জমবে? পুরান ঢাকার কোনো ভাঙাচোরা রেস্তোঁরায় বসে তাওয়া থেকে নামানো গরম গরম রুটির সাথে দশ-বারোটা শিক কাবাব; আর শেষমেশ এক গ্লাস জাফরানি বাদাম শরবত - টু মাচ প্লেজার টু হ্যান্ডেল!
কুরবানির ঈদে হাজার হাজার গরু জবাই করা হয়। কুরবানির মাংস চুলার ওপর জ্বাল দিতে দিতে যখন ঘন থকথকে স্যুপের মতো হয়ে যায়; কিংবা বারবার রান্না করতে করতে যখন ঝুরা মাংসে পরিণত হয় - এর চেয়ে বেশি কিছু কি জীবনে চাওয়ার থাকে?
শুধু কি মাংস? গরুর অন্যান্য অঙ্গের কথা ভুলে গেলে তো অবিচার করা হবে।
গরুর জিহ্বার কথা সবার আগে চলে আসে। আমি কিছুতেই ভেবে পাই না - ঘাস খাওয়া একটা প্রাণী - যে জীবনে কোনো সুস্বাদু খাবার চেখেও দেখলো না, তার জিহ্বা খেতে এত ভালো হয় কীভাবে?
গরুর মগজ। অল্প তেলে ভুনা ভুনা করে রান্না করা। গরম ঝরঝরে ভাতের সাথে একটু একটু করে মাখাচ্ছেন আর লোকমা লোকমা করে মুখে পুরে দিচ্ছেন। কল্পনা করেই অর্গাজমের আনন্দ হয় না?
গরু বোধহয় একমাত্র প্রাণী - যার চর্বি খেতে গিয়ে আপনার বমি আসবে না। রুই-কাতলা বা অন্য কোনো মাছের তেল মুখে দিলেই নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার উপক্রম। খাসির চর্বি ঠিক মতো প্রসেস করলে কোনো রকমে খাওয়া যায়। কিন্তু গরুর চর্বি? সরিষার তেলে রান্না করা গরুর চর্বি দিয়ে মাখানো ভাত - এটুকু খেয়েই আসলে একটা জীবন পার করে দেয়া যায়।
গরুর ভুঁড়ি, অনেকে এটাকে বট বলে। এইটা ভাই একটা জিনিসই! ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট ছোট ভ্যানে এই জিনিস তেলে ভেজে বিক্রি করে - ২০ টাকা প্লেট। মুখে দিলেই মনে হয়, মানুষ হয়ে জন্মানোর সবটুকু সার্থকতা এরই মধ্যে পেয়ে গেছি - আর এক সেকেন্ডও যদি বেঁচে না থাকি তবু আফসোস থাকবে না।
কলিজার ব্যাপারে একটু বলি। এটা স্বাদের দিক দিয়ে মাঝারি মানের - তবে গুণের দিক দিয়ে একেবারে অনন্য। পৃথিবীর সবচেয়ে সহজলভ্য নিউট্রিয়েন্ট ডেন্স খাবার হচ্ছে গরুর কলিজা। প্রাচীন কালে যখন আমাদের বাপ-দাদারা শিকার করে খেতো - শিকার ধরার পর সেই পশুর কলিজাটা দেয়া হতো গোত্রের প্রধান পুরুষটিকে। ফলে, কলিজা মূলত আলফা মেলদের খাবার। ভাত বা রুটির সাথে গরুর কলিজা আসলে ভালোই মানায় - বিশেষ করে, যদি ঝাল ঝাল ভুনা বানানো হয়।
নেহারির কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? নামটা যেমন গজলের সুরে বাঁধা, খেতেও ঠিক সেরকম। গরুর পায়া, রগ, কারেলি - সব একসাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিতে দিতে ভেতরের সবটুকু সারবস্তু মিহি হয়ে মিশে যায় সুরুয়ার কণায় কণায়। হালকা ধনেপাতা দিয়ে গার্নিশ করে, কয়েক মোচড় লেবুর রসের ছিটে দিয়ে একটা নান ছিঁড়ে প্রথমবার মুখে দিলে কিছুক্ষণের জন্য আনন্দে আপনার সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠবে। এখানে একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে - নেহারি অবশ্যই সার্ভ করতে হবে বাংলাদেশি সংসারের সেই পুরনো স্টিলের বাটি আর চামচে। রেস্তোঁরার দামি আসবাবে নেহারি খেতে গেলে কিন্তু শুরুতেই এর অর্ধেক স্বাদ উবে যাবে। অতএব সাবধান!
গরুর হালিম দুই রকমের হয়। এক হচ্ছে বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে বিক্রি হওয়া - গরুর বিভিন্ন অংশ দিয়ে বানানো টিপিকাল হালিম। আরেকটা হচ্ছে মুলতানি স্টাইল - গরুর রোঁয়াগুলো ম্যাশ করতে করতে একদম মিহি ভাবে ডালের সাথে মিশিয়ে দেয়া। এই ঘন হালিম দুই বাটি খেলেই দেখবেন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার একসাথে হয়ে গেছে। নিতান্ত বীরপুরুষ না হলে এই জিনিস কেউ চার বাটি খেতে পারে না।
গরু কখন খাবেন, কী দিয়ে খাবেন - তারও আসলে ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।
পুরান ঢাকার লোকজন সকালের নাশতায় ঝাল ঝুরা মাংস দিয়ে ঘিয়ে ভাজা পরোটা খায়। কুরবানি ঈদের মোটামুটি চার দিন পর থেকে এই নাশতাটা খুবই কমন।
চালের আটার রুটি দিয়ে গরুর ঝোল খাওয়ার আনন্দ আবার অন্য রকম। ঢাকায় এই জিনিসের নাম 'ছিদ রুটি'। গরম তাওয়াতে চালের গুড়োর পেস্ট খানিকটা ছিটিয়ে দেয়া হয় - রুটির মাঝখানে ব্রাশফায়ারে নিহত শত্রুর মতো ছিদ্র ছিদ্র হয়ে থাকে। সন্ধ্যা মাত্র ঘন হয়ে এসেছে, ঝুপ করে অন্ধকার নামবে এখনই - সেই সময়টায় এই জিনিস খাওয়ার চল। আবার 'চাপটি'র সাথে গরুর চর্বিযুক্ত টুকরো মেখে নিয়ে রান্না করা হয়। এই আইটেম আপনার খাওয়ার দরকার নেই - শুধু প্লেটে নিয়ে নিজের সামনে রাখবেন। মিনিটে দশবার করে জিভ থেকে লালা টেনে নিতে হবে - নিশ্চিত থাকেন।
গরু কী দিয়ে খেতে ভালো? কেউ বলবেন রুটি, কেউ বলবেন ভাত, কেউ বা পোলাও। কিন্তু মুড়ি দিয়ে গরু খেয়ে দেখেছেন? অবশ্যই হাতে ভাজা মুড়ি হতে হবে। গামলা ভর্তি মুড়িতে সর্ষের তেলে রান্না করা গরুর ঝোল আর ৮-১০ পিস বড় সাইজের মাংস - এর চেয়ে চমৎকার ডিনার পৃথিবীতে কমই আছে।
আসলে গরুর মাংসের প্রশংসা করার মতো ভাষা আমার ভাণ্ডারে নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, খেতে খেতে মনে একটা সুরই ভাসে -
"ফাবি আইয়্যি' আলা ই রব্বিকুমা তুকাযযিবান!"
Tazriar Alam