04/10/2025
'দেবীসূক্ত' ও 'অপরাজিতা স্তব' —
আদ্যামহাদেবী ঋক্মন্ত্রে ঘোষণা করলেন আত্মপরিচয় — ঋগ্বেদ্ সংহিতা, ১০ম মণ্ডল, ১০ম অনুবাক্, ১২৫ সূক্ত, শ্লোক-১-৮ — 'দেবীসূক্ত'। বৈদিক এ সূক্তে আদ্যাশক্তি মহামায়ার মহিমা বর্ণিত হয়েছে। আটটি ঋগ্বেদীয় দেবীসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্ট্রী ঋষি হলেন অম্ভৃণ মহর্ষির কন্যা বাক্। তিনি ধ্যানযোগে সমাধি অবস্থায় নিজের মধ্যেই আদ্যাশক্তি মহামায়াকে উপলব্ধি করে এ মন্ত্রটি দর্শন করেছিলেন। সূক্তের মন্ত্রগুলোতে উপলব্ধি করা যায় যে, অম্ভৃণ মহর্ষির কন্যা বাক্ জগতের পরমেশ্বরী আদ্যাশক্তি মহামায়ার সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। এ অবস্থানেই সাধকের মুক্তি ঘটে।
"আমি” কে ? ইহা যথার্থরূপে জানার নাম আত্মজ্ঞান। জীবমাত্রেই এই আপনার স্বরূপটি জানিবার জন্য লালায়িত। যতদিন ইহা বুঝিতে না পারে, ততদিন সে সাধারণ জীবমাত্র। যখন জীব এই আত্মানুসন্ধানটি প্রত্যক্ষ করিতে পারে, তখন লোকে তাহাকে সাধক ভক্ত ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে থাকে। মানুষ যখন এই আত্মাভিমুখী গতি উপলব্ধি করিতে পারে, তখন তাহার বাহ্যিক যে সকল লক্ষণ প্রকাশ পায়, উহাই নিবৃত্তিমার্গ বা সাধনা নামে কথিত হয়।
'অহম্' ইত্যাদি অষ্ট-মন্ত্রাত্মক ঋগ্বেদীয় দেবীসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি- অম্ভৃণ মহর্ষির কন্যা বাক্, দেবতা- পরব্রহ্মময়ী আদ্যাশক্তি, কেবল দ্বিতীয় মন্ত্রটি জগতী ছন্দে এবং অবশিষ্ট সপ্ত মন্ত্র ত্রিষ্টুপ্ ছন্দে নিবদ্ধ। শ্রীজগদম্বার প্রীতির নিমিত্ত সপ্তশতী চণ্ডীপাঠান্তে দেবীসূক্ত-পাঠের বিনিয়োগ হয়।
দেবীসূক্ত — ঋগ্বেদ, ১০ম মণ্ডল, ১০ম অনুবাক্ ১২৫ সূক্ত, শ্লোক – ১-৮
ঋগ্বেদ সংহিতা দেবীসূক্তের আটটি মন্ত্র হল :
দেবীসূক্ত - ১
অহং রুদ্রেভির্বমুভিশ্চরা -
ম্যহমাদিত্যেরুত বিশ্বদেবৈঃ ।
অহং মিত্রাবরুণোভা বিভ -
র্ম্যহমিদ্ৰাগ্নী অহমশ্বিনোভা ॥ ১
আমি একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, দ্বাদশ আদিত্য এবং বিশ্ব দেবতারূপে বিচরণ করি। আমি মিত্র ও বরুণ উভয়কে ধারণ করি। আমি ইন্দ্র ও অগ্নি এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে ধারণ করি। ১
অর্থাৎ, দেবীসূক্তের ঋষি অম্ভৃণের কন্যা বাক্, যিনি একজন স্ত্রী, তিনি নিজের স্বরূপ ঘোষণা করছেন। আমি (অস্তি) যাবতীয় সৃজনের মূলরূপে রুদ্র, স্থিতিরূপে বসু, প্রকাশরূপ আদিত্যসকল, ইন্দ্রিয়রূপ দেবতা। আমিই রোগ ও মুক্তির খেলাকে নিজেই নিজেতে নির্মাণ করি।
দেবীসূক্ত - ২
অহং সোমমাহনসং বিভম্যহং
ত্বষ্টারমুত পূষণং ভগম্
অহং দধামি দ্রবিণং হবিষ্মতে
সুপ্রাব্যে যজমানায় সুম্বতে ॥ ২
আমি দেবশত্রুহন্তা সোমদেবকে, ত্বষ্টা-নামক দেবতাকে এবং পূষা ও ভগ (দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে দুইটি আদিত্য) নামক সূর্যদ্বয়কে ধারণ করি। উত্তম হবিঃযুক্ত, উপযুক্ত হবিঃ দ্বারা দেবগণের তৃপ্তিসাধনকারী এবং বিধিপূর্বক সোমরসপ্রস্তুতকারী যজমানের জন্য যজ্ঞফলরূপ ধনাদি আমিই বিধান করি। ২
অর্থাৎ, ঋষি বাক্ অস্তিত্ব শক্তির সাথে একাত্ম হয়ে বলছেন, আমিই পোষনকারী সোম, সৃজনকারী প্রজাপতি, আমিই ইন্দ্রিয়ের শক্তি, আমিই যথাযথ কর্মের ফল বিধানকারিণী।
দেবীসূক্ত - ৩
অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং
চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্ ।
তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা
ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশয়ত্তীম্ ॥ ৩
আমিই সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, উপাসকগণের ধনপ্রদাত্রী, পরব্রহ্মকে আত্মা হইতে অভিন্নরূপে সাক্ষাৎকারিণী। অতএব যজ্ঞার্হগণের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠা। আমি প্রপঞ্চরূপে বহুভাবে অবস্থিতা ও সর্বভূতে জীবরূপে প্রবিষ্টা। আমাকেই সর্বদেশে সুরনরাদি যজমানগণ বিবিধভাবে আরাধনা করে। ৩
অর্থাৎ, আমি (শুদ্ধ অস্তিরূপে) সমগ্র রাষ্ট্ররূপা, সব চেষ্টার ফল, আমিই জীবত্ব ও শিবত্ব ভেদ অপমোচনকারী। তাই, সব চেষ্টার মধ্যে আমি সর্বোত্তম। আমিই সব অনু-পরমানু হয়েছি। আমাকেই সবাই সবভাবে চায়।
দেবীসূক্ত - ৪
ময়া সো অন্নমত্তি যো বিপশ্যতি
যঃ প্রাণিতি য ঈং শৃণোত্যূক্তম্ ।
অমন্তবো মাং ত উপক্ষিয়ন্তি
শ্ৰুধি শ্রুত শ্রদ্ধিবং তে বদামি ॥ ৪
আমারই শক্তিতে সকলে আহার ও দর্শন করে, শ্বাসপ্রশ্বাসাদি নির্বাহ করে এবং উক্ত বিষয় শ্রবণ করে। যাহারা আমাকে অন্তর্যামিনীরূপে জানে না, তাহারাই জন্মমরণাদি ক্লেশ প্রাপ্ত হয় বা সংসারে হীন হয়। হে কীর্তিমান সখা, আমি তোমাকে শ্রদ্ধালভ্য ব্রহ্মতত্ত্ব বলছি, শ্রবণ কর। ৪
অর্থাৎ, এই নিষ্পাপ অস্তিভাবই সবকিছু হয়ে জীবনের খেলায় মত্ত রয়েছে। যে শুনছে ও যা শুনছে, তা গুণগতভাবে একই সত্তা। যে এই মূল বিষয় বোঝে না, সেই সংসারে দ্বন্দের যন্ত্রণা ভোগ করে। এই বোধই ব্রহ্মতত্ত্ব।
দেবীসূক্ত - ৫
অহমেব স্বয়মিদং বদামি জুষ্টং
দেবেভিরুত মানুষেভিঃ ।
যং যং কাময়ে তং তমুগ্ৰং কৃণোমি
তং ব্রহ্মাণং তমৃষিং তং সুমেধাম্ ॥ ৫
দেবগণ ও মনুষ্যগণের প্রার্থিত ব্রহ্মতত্ত্ব আমি স্বয়ং উপদেশ করিতেছি। আমি ঈদৃশ ব্রহ্মস্বরূপিণী। আমি যাহাকে যাহাকে ইচ্ছা করি তাহাকে তাহাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ করি। আমি কাহাকে ব্রহ্মা করি, কাহাকে ঋষি করি এবং কাহাকেও বা অতি ব্রহ্মমেধাবান্ করি। ৫
অর্থাৎ, এই জীবন্ত শক্তি, যা আমাদের অস্তিত্বের কেন্দ্র তাই স্বেচ্ছায় বোধ বিতরণ করে। ব্যক্তি মহৎ হয় না, এই চৈতন্য স্বতঃ যে আধারে প্রকাশিত হয়, তাই সর্বশ্রেষ্ঠ হয়। জীবনের স্বতন্ত্র বিকাশই মানুষকে ব্রহ্মত্ব, ঋষিত্ব ও জীবনের গহনতম জ্ঞাতা বানায়।
দেবীসূক্ত - ৬
অহং রুদ্রায় ধনুরাতনোমি
ব্রহ্মদ্বিষে শরবে হন্তবা উ ।
অহং জনায় সমদং কৃণোম্যহং
দ্যাবাপৃথিবী আবিবেশ ॥ ৬
ব্রাহ্মণবিদ্বেষী হিংস্র-প্রকৃতি ত্রিপুরাসুর-বধার্থ রুদ্রের ধনুকে আমিই জ্যা সংযুক্ত করি। ভক্তজনের কল্যাণার্থ আমিই যুদ্ধ করি এবং স্বর্গে ও পৃথিবীতে অন্তর্যামিনীরূপে আমিই প্রবেশ করিয়াছি। ৬
অর্থাৎ, এই আমাদের থাকার ভাবই সবশক্তির উৎস। জীবনের যত বাঁধা এই শক্তিই দূর করে পথ প্রশস্ত করে। সবকিছুর আন্তরিক জ্ঞাতৃত্ব এই নির্লিপ্ত আমিই।
দেবীসূক্ত - ৭
অহং সুবে পিতরমস্য মূর্ধন্
মম যোনিরস্বন্তঃ সমুদ্রে ।
ততো বিতিষ্ঠে ভুবনানু বিশ্বো -
তামূং দ্যাং বর্মণোপস্পৃশামি ॥ ৭
আমিই সর্বাধার পরমাত্মার উপরে দ্যুলোককে প্রসব করিয়াছি। বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যস্থ যে ব্রহ্মচৈতন্য উহাই আমার অধিষ্ঠান। আমিই ভূরাদি সমস্ত লোক সর্বভূতে ব্রহ্মরূপে বিবিধভাবে বিরাজিতা। আমিই মায়াময় দেহ দ্বারা সমগ্র দ্যুলোক পরিব্যাপ্ত আছি। ৭
অর্থাৎ, ঋষির গহন দৃষ্টিতে জীবন উর্জ্জার সর্বত্রস্থিত অবস্থিতির ঘোষনা হচ্ছে। এই চেতনশক্তিই সব লোক সৃজন করে। তা "আমার বুদ্ধি"-রও আগের অবস্থা। যত রূপ রয়েছে, সব হয়ে সেই এক চৈতন্যই খেলা করে।
দেবীসূক্ত - ৮
অহমেব বাত ইব প্ৰবাম্যা -
রভমাণা ভুবনানি বিশ্বা
পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যৈ -
তাবতী মহিনা সংবভূব ॥ ৮
আমিই ভূরাদি সমস্ত লোক সর্বভূত সৃষ্টি করিয়া বায়ুর মতো স্বচ্ছন্দে উহার অন্তরে বাহিরে সর্বত্র বিচরণ করি। যদিও স্বরূপতঃ আমি এই আকাশের অতীত ও পৃথিবীর অতীত অসঙ্গ-ব্রহ্মরূপিণী, তথাপি স্বীয় মহিমায় এই সমগ্র জগদ্-রূপ ধারণ করিয়াছি। ৮
অর্থাৎ, সেই নির্গুন জীবনই সবরূপ ধারণ করে বিচরণ করছে। সবরূপ সসীম। কিন্তু, জীবনের সৌন্দর্য এটাই যে সসীম রূপে অসীমেরই খেলা সর্বত্র বিরাজ করছে।
— (ঋগ্বেদ সংহিতা: ১০.১২৫.১-৮)
ইহা বৈদিক দেবীসূক্ত। দেবীসূক্ত বেদ ; ইহাতে এই আটটি মন্ত্র আছে। এই দেবীসূক্তই চণ্ডীর মৌলিক উপাদান। চণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্য ইহারই বিশ্লেষণমাত্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর পঞ্চম অধ্যায়ে ৮ম হইতে ৮০তম মন্ত্রকে তন্ত্রোক্ত দেবীসূক্ত বলে। কাহারও কাহারও মতে চণ্ডী তন্ত্রশাস্ত্র বলিয়া বৈদিক দেবীসূক্তের পরিবর্তে তান্ত্রিক দেবীসূক্ত পাঠই বিধেয়।
তবে জীব যাহাকে চায়-জ্ঞানে বা অজ্ঞানে জীবের যাহা যথার্থ অভীষ্ট বস্তু, তাহার প্রকৃত স্বরূপ-সম্বন্ধে একটা স্থুল জ্ঞান সর্ব্বপ্রথমে একান্ত আবশ্যক; নতুবা অভীষ্টলাভের পথ দীর্ঘ হইয়া পড়ে। তাই, দেবীসূক্ত না জানিয়া চণ্ডীতত্ত্বে প্রবেশ শাস্ত্রনিষিদ্ধ।
দেবীসূক্তের প্রতিপাদ্য বিষয়-সচ্চিদানন্দস্বরূপ পরমাত্মা। দেবীমাহাত্ম্যে এই পরমাত্মাই মহামায়ারূপে উপাখ্যানাকারে বর্ণিত হইয়াছে। পরমাত্মা ও মহামায়া অভিন্ন। দেবীসূক্তে "অহং"রূপে যে তত্ত্ব প্রকাশিত, চণ্ডীতে তাহাই মহামায়ারূপে অভিবর্ণিত হইয়াছে। দেবীসূক্তে যাহা আত্মা, চণ্ডীতে তাহাই মা। আত্মাই-আমি-মা। আমাকে চেনা-মাকে পাওয়া ও আত্মসাক্ষাৎকার করা, এই তিনই এক কথা।
আদ্যাশক্তি মহামায়া অচিন্ত্য, এরপরেও অসুর নিধনে তিনি বারেবারেই আবির্ভূতা হন। পুরাকালে শুম্ভ-নিশুম্ভ নামক দুই অসুরদ্বয় মহাপ্রতাপশালী হয়ে ত্রিলোক জয় করে নেয়। তারা স্বর্গের অধিকারের সাথে সাথে দেবতাদের যজ্ঞভাগ পর্যন্ত গ্রহণ করা শুরু করে দেয়। আসুরিক শক্তির প্রভাবে এভাবে, দৈবশক্তির পক্ষে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে। তখন সূর্য, চন্দ্র, কুবের, যম, বরুণ, অগ্নি ইত্যাদি প্রধান দেবতাগণ শুম্ভ-নিশুম্ভ নামক মহাসুরদ্বয় কর্তৃক স্ব-স্ব অধিকার হতে বিচ্যুত ও স্বর্গ হতে বিতাড়িত হয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারে আদ্যাশক্তি মহামায়ার স্মরণ করে। তখন দেবী অপরাজিতা দুর্গারূপে দেবতাদের সম্মুখে আবির্ভূত হন। অপরাজিতা তাকেই বলা হয়, যাকে কখনো পরাজিত করা যায় না।
শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর দেব্যাদূতসংবাদ নামক পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে —
হতাধিকারাস্ত্রিদশাস্তাভ্যাং সর্বে নিরাকৃতাঃ ।
মহাসুরাভ্যাং তাং দেবীং সংস্মরন্ত্যপরাজিতাম্ ॥
তয়াস্মাকং বরো দত্তো যথাপসু স্মৃতাখিলা ।
ভবতাং নাশয়িষ্যামি তৎক্ষণাৎ পরমাপদঃ ॥
— (শ্রীচণ্ডী:৫.৫-৬)
সকল দেবতারা সম্মিলিতভাবে মহাদেবীর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর উদ্দেশ্যে স্তব করে। দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে অপরাজিতারূপিণী দুর্গা শুম্ভনিশুম্ভ নামক অসুরভ্রাতৃদ্বয়কে বিনাশ করে। দেবতাদের কৃত এই স্তবকে তান্ত্রিক দেবীসূক্ত বলে অবিহিত করা হয়। স্তবটি যেহেতু মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীচণ্ডীর অন্তর্ভুক্ত তাই একে পৌরাণিক দেবীসূক্ত বলার কথা। কিন্তু কেন তান্ত্রিক দেবীসূক্ত বলা হয়, সে বিষয়টি অজ্ঞাত। অত্যন্ত পবিত্র তান্ত্রিক দেবীসূক্তকে 'অপরাজিতা স্তব' নামেও অবিহিত করা হয়। কারণ দেবতারা দেবীকে যখন স্তোত্র করছিলেন, তখন মহাদেবী এক অপরাজিতা নারীমূর্তিতে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।
নমো দেব্যাদিকং দেবীসূক্তং সর্বফলপ্ৰদম্ ।
ইমাং দেবীং স্তবন্নিত্যং স্তোত্রেণানেন মামিহ ॥ ক্লেশানতীত্য সকলানৈশ্বৰ্যং মহদশ্নুতে ॥
সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী প্রকৃতিভেদে বিষ্ণুমায়া ত্রিবিধা। এই জন্য প্রত্যেকটি শ্লোকে তিনবার করে ‘তস্যৈ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিষ্ণুমায়ার সৃষ্টিশক্তি রাজসী, স্থিতিশক্তি সাত্ত্বিকী এবং সংহারশক্তি তামসী। কায়িক, বাচিক ও মানসিক এই তিন প্রকারের প্রণামকে উপলক্ষ করে প্রত্যেক শ্লোকের শেষে ‘নমঃ' শব্দের ত্রিরুক্তি করা হয়েছে।
দেবা ঊচুঃ । ৮ (ॐ ঐ)
নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ।
নমঃ প্ৰকৃত্যৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্ম তাম্ ॥ ৯
মহামায়া অপরাজিতাকে দেবগণ বললেন — দেবীকে প্রণাম এবং মহাদেবীকে প্রণাম। সতত মঙ্গলদায়িনীকে প্রণাম। সৃষ্টিশক্তিরূপিণী প্রকৃতিকে প্রণাম। স্থিতিশক্তিরূপিণী ভদ্রাকে প্রণাম। নিত্য আমরা সমাহিত চিত্তে তাঁকে প্রণাম করি। ৮-৯
রৌদ্রায়ৈ নমো নিত্যায়ৈ গৌৰ্যৈ ধাত্র্যৈ নমো নমঃ । জ্যোৎস্নায়ৈ চেন্দুরূপিণ্যৈ সুখায়ৈ সততং নমঃ ॥ ১০
সংহারশক্তিস্বরূপা রৌদ্রাকে প্রণাম। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এ ত্রিকালাতীত সত্তারূপিণীকে নিত্যাকে প্রণাম। গৌরী এবং জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম। জ্যোৎস্নারূপা, চন্দ্ররূপা ও সুখস্বরূপাকে সতত প্রণাম। ১০
কল্যাণ্যৈ প্ৰণতা বৃদ্ধ্যৈ সিদ্ধ্যৈ কুৰ্মো নমো নমঃ ।
নৈঋত্যৈ ভূভৃতাং লক্ষ্ম্যৈ শৰ্বাণ্যৈ তে নমো নমঃ ॥১১
কল্যাণী, সমৃদ্ধিরূপা ও সিদ্ধিরূপা দেবীকে বারবার প্রণাম করি। অলক্ষ্মীরূপা, ভূপতিগণের লক্ষ্মীরূপা শর্বাণী দেবীকে বারবার প্রণাম করি। ১১
দুর্গায়ৈ দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বকারিণ্যৈ ।
খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্ৰায়ৈ সততং নমঃ ॥ ১২
দুরধিগম্যা দুর্গা, দুস্তর সংসার সমুদ্র থেকে পরিত্রাণকারী, শক্তিরূপিণী, সর্ব কারণের কারণ, আদ্যাশক্তি নামে খ্যাতা, কৃষ্ণবর্ণা ও ধূম্রবর্ণা দুর্গা দেবীকে বারবার প্রণাম করি। ১২
অতিসৌম্যাতিরৌদ্রায়ৈ নতাস্তস্যৈ নমো নমঃ ।
নমো জগৎপ্রতিষ্ঠায়ৈ দেব্যৈ কৃত্যৈ নমো নমঃ ॥ ১৩
বিদ্যারূপে অতিসৌম্যা এবং অবিদ্যারূপে অতি রৌদ্রাকে প্রণাম করি। তাঁকে বারবার প্রণাম। জগতের আশ্রয়রূপিণীকে এবং ক্রিয়ারূপা দেবীকে বারবার প্রণাম। ১৩
যা দেবী সর্বভূতেষু বিষ্ণুমায়েতি শব্দিতা।
নমস্তস্যৈ (১৪) নমস্তস্যৈ (১৫) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ১৬
যে দেবী সকল প্রাণীতে বিষ্ণুমায়া নামে বেদাদি শাস্ত্রে অভিহিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ১৪-১৬
যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে।
নমস্তস্যৈ (১৭) নমস্তস্যৈ (১৮) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ১৯
যে দেবী সকল প্রাণীর চেতনারূপে প্রসিদ্ধা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ১৭-১৯
যা দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (২০) নমস্তস্যৈ (২১) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ২২
যে দেবী সকল প্রাণীর বুদ্ধিরূপে অবস্থিতা তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ২০-২২
যা দেবী সর্বভূতেষু নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (২৩) নমস্তস্যৈ (২৪) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ২৫
যে দেবী সর্বভূতে নিদ্রারূপে বিরাজিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ২৩-২৫
যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (২৬) নমস্তস্যৈ (২৭) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ২৮
যে দেবী সর্বভূতে ক্ষুধারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ২৬-২৮
যা দেবী সর্বভূতেষু ছায়ারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (২৯) নমস্তস্যৈ (৩০) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৩১
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে ছায়ারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ২৯-৩১
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৩২) নমস্তস্যৈ (৩৩) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৩৪
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে শক্তিরূপে অধিষ্ঠিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৩২-৩৪
যা দেবী সর্বভূতেষু তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৩৫) নমস্তস্যৈ (৩৬) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৩৭
যে দেবী সর্বভূতে বিষয়-বাসনা নামক তৃষ্ণারূপে সংস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৩৫-৩৭
যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৩৮) নমস্তস্যৈ (৩৯) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৪০
যে দেবী সর্বভূতে ক্ষমারূপে, অর্থাৎ সামর্থ্যসত্ত্বেও অপকারীর প্রতি অপকারের অনিচ্ছারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৩৮-৪০
যা দেবী সর্বভূতেষু জাতিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৪১) নমস্তস্যৈ (৪২) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৪৩
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে জাতিরূপে সংস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৪১-৪৩
যা দেবী সর্বভূতেষু লজ্জারূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ (৪৪) নমস্তস্যৈ (৪৫) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৪৬
যে দেবী সর্বভূতে লজ্জারূপে; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৪৪-৪৬
যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৪৭) নমস্তস্যৈ (৪৮) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৪৯
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে শান্তিরূপে সংস্থিতা;তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৪৭-৪৯
যা দেবী সর্বভূতেষু শ্রদ্ধারূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ (৫০) নমস্তস্যৈ (৫১) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৫২
যে দেবী সর্বভূতে শ্রদ্ধারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৫০-৫২
যা দেবী সর্বভূতেষু কান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৫৩) নমস্তস্যৈ (৫৪) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৫৫
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে কান্তিরূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৫৩-৫৫
যা দেবী সর্বভূতেষু লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৫৬) নমস্তস্যৈ (৫৭) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৫৮
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে লক্ষ্মীরূপে অবস্থিতা;তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৫৬-৫৮
যা দেবী সর্বভূতেষু বৃত্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৫৯) নমস্তস্যৈ (৬০) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৬১
যে দেবী সর্বভূতে কৃষি, গোরক্ষা ও বিবিধ বাণিজ্যাদি জীবিকা রূপে সংস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৫৯-৬১
যা দেবী সর্বভূতেষু স্মৃতিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৬২) নমস্তস্যৈ (৬৩) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৬৪
যে দেবী সর্বভূতে স্মৃতিরূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৬২-৬৪
যা দেবী সর্বভূতেষু দয়ারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৬৫) নমস্তস্যৈ (৬৬) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৬৭
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে দয়ারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৬৫-৬৭
যা দেবী সর্বভূতেষু তুষ্টিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৬৮) নমস্তস্যৈ (৬৯) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥৭০
যে দেবী সর্বভূতে সন্তোষরূপে বা যথালাভে তুষ্টি, প্রাপ্ত বস্তুর অধিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা শূন্যতারূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৬৮-৭০
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ (৭১) নমস্তস্যৈ (৭২) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৭৩
যে দেবী সর্বপ্রাণীতে মাতৃরূপে অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৭১-৭৩
যা দেবী সর্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা । নমস্তস্যৈ (৭৪) নমস্তস্যৈ (৭৫) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ ৭৬
যে দেবী সর্বভূতে ভ্রান্তিরূপে সংস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৭৪-৭৬
ইন্দ্রিয়াণামধিষ্ঠাত্রী ভূতানাঞ্চাখিলেষু যা ।
ভূতেষু সততং তস্যৈ ব্যাপ্তিদেব্যৈ নমো নমঃ ॥৭৭
যিনি সকল প্রাণীতে চতুর্দশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতারূপে বিরাজিতা এবং যিনি পৃথিবী আদি পঞ্চ স্থূল ও পঞ্চ সূক্ষ্ম ভূতের প্রেরয়িত্রী, সেই বিশ্বব্যাপিকা' ব্রহ্মশক্তিরূপা দেবীকে বারংবার প্রণাম। ৭৭
চিতিরূপেণ যা কৃৎস্নমেতদ্ ব্যাপ্য স্থিতা জগৎ । নমস্তস্যৈ (৭৮) নমস্তস্যৈ (৭৯) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥৮০
যিনি চিৎশক্তিরূপে এই সমগ্র জগৎ ব্যাপিয়া অবস্থিতা; তাঁকে নমস্কার। তাঁকে নমস্কার। তাঁকে বারংবার নমস্কার। ৭৮-৮০
— (শ্রীচণ্ডী:৫.৮-৮০)
তন্ত্রমতে ইহাই দেবীসূক্ত। ইহাকে 'অপরাজিতা স্তব' বলে। লক্ষ্মীতন্ত্রে এই স্তব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এই দেবীসৃক্ত সর্বফলদায়ক। এই সৃক্ত দ্বারা নিত্য দেবীর স্তব করলে মানুষ সকল ক্লেশ অতিক্রম করে মুক্তিরূপ মহাঐশ্বর্য লাভ করেন।
নারায়াণী স্তুতি —
ॐ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে ।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে ॥
হে দেবী, তুমি সর্বমঙ্গলস্বরূপা, সর্বাভীষ্টসাধিকা, একমাত্র শরণযোগ্যা, ত্রিভুবন-জননী (বা ত্রিনয়না = সূর্যচন্দ্রাগ্নিলোচনা) ও গৌরবর্ণা। হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম।
সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনী ।
গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণী নমোহস্তুতে ॥
হে দেবী, তুমি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের শক্তিরূপিণী (অর্থাৎ শৈবী, বৈষ্ণবী ও ব্রাহ্মী)। তুমি সনাতনী ও ত্রিগুণের আধারভূতা (নির্গুণা), অথচ ত্রিগুণময়ী। হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম।
শরণাগতদীনার্তপরিত্রাণপরায়ণে ।
সর্বস্যার্তিহরে দেবী নারায়ণী নমোহস্তুতে ॥
হে দেবী, তুমি শরণাগত, দীন ও আর্তগণের পরিত্ররাণ-পরায়ণা (সর্বাপৎনাশিনী বা মুক্তিদায়িনী) এবং সকলের দুঃখ (জন্মমরণাদি)-নাশিনী। হে নারায়াণী, তোমাকে প্রণাম।
— (শ্রীচণ্ডী:১১.১০-১২)
জয় মা
(সংগৃহীত)