12/03/2025
আমরা রমজান বলতাম, সেহরি আর ইফতার বলতাম। এখন রামাদান হয়ে গেছে, সেহরিকে অনেকে সাহুরও বলে। ইফতার মাহফিল হয়ে গেছে ইফতার পার্টি, সেহরি নাইট নামে শুরু হইছে আরেক উপদ্রব। কত কিছুই যে বদলায় গেলো!
অথচ আমাদের সময়ে রোজা শীতের দিনে হত। দিন ছোট থাকতো। দুপুরের রোদ মিষ্টি লাগতো। ইফতারে আগে হালকা কুয়াশা পড়তো। সেহরীর সময় ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মন ভর্তি আনন্দে ভাত খেতাম।
এখন অনেক গরম পড়ে। দর দর করে ঘামতে থাকি দুপুরের রোদে। ইফতারের আগে গুমোট গরমে নিস্তেজ হয়ে যাই। সেহরীর সময় খুব শীতে কাঁপতে মন চায়। জ্যাকেট সোয়েটার গায়ে দিয়ে বসতে হতো ইফতারে। টিভি ছেড়ে দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত এবং ওয়াজ শুনতেন বাসার মুরব্বিরা। দূর থেকে আজান শোনা গেলেও কাছের মসজিদে আজান না দিলে সবাই পানি খেতো না। আবার শিওরও হতো জিজ্ঞেস করে, আজান দিছে না?
আমাদের সময় দূরপাল্লার বাস গুলোর যাত্রীরা সবাই ফেরিঘাটে কিংবা ফেরিতে বসে ইফতার করতো। শসা কিনতো, একটু লবন ও নিতো সাথে। বালতিতে আনা ঠান্ডা পানি কিংবা পেপসি দিয়ে সবাই যে যার মত করে ইফতার আয়োজন করতো। কোন ঠান্ডা ফল কিংবা চানাচুর চিপস। পেট ভরে যেত বিশ্বাস করুন। কোন অজানা কারনে, কোন এক খুশীতে আবার বাস ছাড়তো। মুখে পান দিয়ে ড্রাইভারের মনে কি খুশী। হেলপার লুকিয়ে গেটে সিগারেট ধরাতো। এখন বাস সেই খুশীর জ্যামে পড়ে না, ফেরিতে ওঠে না। জীবন জ্যামে পড়ে গেছে, ফেরি মিস করেছে অনেক আগে।
আমাদের সময় মা বাবাকে নিয়ে ইফতারে বসতাম। দুপুরের পর পর মায়েরা রান্না ঘরে ঢুকতেন। সেই চিরচেনা ময়দা ভেসন পেয়াজ আলুর খুব সহজ কিন্তু অদ্ভুত কারুকাজে মত্ত হতেন। অফিস থেকে আসার পথে কত কিছু নিয়ে বাবারা আসতেন, প্যাকেট ভরা জিলাপী কিংবা প্যাকেট ভরা মায়া, প্যাকেট ভরা স্নেহ, একটু ভালোবাসা।
বাবারা রান্না ঘরে অনেকে ঢুকে সাহায্য করতে গিয়ে ছ্যাড়া ব্যাড়া করে ফেলতেন এবং ধমক খেয়ে সুড়সুড় করে চলে আসতেন। বাবারা কেউ আছেন, কেউ ছেড়ে চলে গেছেন। কেউ থেকেও নেই। দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে সেই সম্পর্কে।
আমাদের সময়ে আমরা তারাবীর নামাজের সময় ঘুরতে বের হতাম। স্যান্ডেল জায়গা মত রাখা থাকতো। কয়েক রাকাত পরই একজন করে করে আস্তে আস্তে করে গায়েব হতো। জড়ো হত সবাই একটা নির্দিষ্ট জায়গায়।
ঘুরতাম ফিরতাম, আড্ডা হত, গল্প হতো কত। এখনকার ছেলেরা কেমন জানি, এরা মসজিদেও আসে ফোন নিয়ে। সময় পেলেই ফোন টিপে। কী এক অবস্থা! আমাদের আগের সেই বন্ধুরাও আর নেই আগের মত। তাদের খুঁজতে দেয় না বাস্তবতা। খুব ইচ্ছা করে সেই সব দিনের মত একজন একজন করে গায়েব হয়ে জড়ো হই কোন নির্দিষ্ট সময়ে।
সেহরিতে এখন আর দল বেধে গান গাইতে গাইতে কেউ ওঠায় না। হারিয়ে গেছে এই জিনিসটা। মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিন সুরেলা কন্ঠে গজল গাইতেন, মায়েরা সেসব শুনে শুনে রান্না বসাতেন চুলার উপরে। এখন কই হারালো সেসব সোনালী দিন!
ফজরের নামাজ শেষে ছেলেরা দলবেঁধে হাঁটতে বের হতাম। এরপর বাসায় গিয়ে ঘুম, হায়রে আমাদের নানা রঙের দিনগুলো… রমজান মাস এখন একটা স্বাভাবিক মাস হয়ে গেছে। অথচ আমরা আগে রমজান এলে পড়ে থাকতাম মসজিদে, ঈমাম সাহেব দারুল ক্বেরাত পড়াতেন, বাচ্চারা সবাই সুর মেলাতো সেই সুরে, যেই সুর মিলে যেতো আকাশে, বাতাসে, কে জানে, হয়তো ছুয়ে আসতো বেহেশতের বাতাসকেও… রমজান এলেই পণ্যের দাম বাড়ানোর এই প্রতিযোগিতা আমাদের সময়ে ছিল না। কিন্তু এখন বাজারেই যাওয়া যায় না ভয়ে…
আমাদের সময়ে ২০,০০০ টাকা কেজির জিলাপি ছিলো না, কিন্তু ঈদের তিন- চারদিন আগে গ্রামের বাড়ি যাবার ঝোক ছিলো। বড় কোন রেস্তারায় ইফতার করে চেক ইন ছিলো না, তবে পাশের বাড়ি কিংবা খালা চাচাদের বাড়িতে ইফতারে দাওয়াত ছিলো, অন্যরকম উৎসব উৎসব ভাব ছিলো। দামী কোন ইফতারের প্লাটার ছিলো না, খুব সাধারণ সব সরবত, বুটমুড়ি এসব দিয়ে আমরা আমাদের ইফতার করতাম অসাধারণভাবে।
বড় হয়ে গেছি, এখন স্মৃতিচারন করি। বলতে শিখেছি- 'আমাদের সময়ে এরকম ছিলো।' কি অদ্ভুত প্রতিশোধ নিলো সময়!
[লেখা: FaporBaz]