10/09/2026
আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।
পৃথিবীর কোনো মানুষের জীবনই পরিপূর্ণ সুখে ভরা নয়। জীবনের এক পাশে যদি সুখ থাকে, অন্য পাশে থাকে দুঃখ। কখনো এমন কোনো দিন আসে, যখন মন আনন্দে ভরে থাকে; অথচ ঠিক তার পরের দিনটিই হয়ে ওঠে বিষাদময়। এটাই জীবন। আলো আর অন্ধকারের পাশাপাশি হাঁটার নামই জীবন।
সবার জীবনেই সমস্যা আছে। উত্থান-পতন আছে। পারিবারিক সমস্যা, বেকারত্ব, ভালোবাসার সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পেশাগত জীবনের ব্যর্থতা, হাজার রকম সমস্যায় জর্জরিত মানুষ। আর আমাদের মতো নানা সংকটে ভরা একটি দেশে সমস্যারও তো অভাব নেই।
কিন্তু মন খারাপ লাগা, বিষণ্ণ লাগা, একাকিত্বে ভোগা, এ এক বিষয়। আর নিজের জীবন শেষ করে দিতে ইচ্ছে করা, সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কাছের কোনো মানুষ মন খারাপ করে থাকলে তার পাশে বসা যায়। তার কথা শোনা যায়। তাকে একটু সাহস দেওয়া যায়, একটু সময় দেওয়া যায়। কিন্তু কেউ যখন আত্মহত্যার কথা ভাবছে বা নিজের জীবন শেষ করার পরিকল্পনা করছে, তখন শুধু কিছু উপদেশ দিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা ঠিক নয়। বরং তাকে একা না রেখে দ্রুত একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের সমাজে এখনো মানসিক অসুস্থতা নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াকে অনেক সময় দুর্বলতা, পাগলামি কিংবা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
অথচ শরীর অসুস্থ হলে আমরা যেমন ডাক্তারের কাছে যাই, মন অসুস্থ হলেও চিকিৎসা প্রয়োজন। মনের চিকিৎসা নেওয়া লজ্জার নয়; বরং নিজের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণ।
গত দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, দুজন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তাদের নিয়ে করা পোস্টগুলোর মন্তব্যের ঘরে দেখলাম নেতিবাচক মন্তব্য, বিদ্রূপ আর হাসির রিঅ্যাকশনের বন্যা।
একজন মানুষ মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়ার মতো অসহায় অবস্থায় পৌঁছে গেছে, সেই মুহূর্তে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করার কী আছে?
হয়তো আমরা জানি না, সেই মানুষটি কত রাত একা কেঁদেছে। কত কথা কাউকে বলতে পারেনি। কতটা যন্ত্রণা বুকে নিয়ে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করেছে। অনেক সময় আমরা দেখি যে, মানুষ বলে, কালকেও এত হাসিখুশি দেখলাম, আর আজ সুইসাইড করলো? যার মাঝে সুইসাইড করার প্রবণতা আছে, সেটি যখন তখন করতে পারে। এই সময় মানসিক চিকিৎসা করা বুদ্ধিমানের কাজ।
মানুষের জীবনে খারাপ সময় আসে। খুব খারাপ সময়ও আসে। কিন্তু খারাপ সময় চিরস্থায়ী নয়।
আজ যে সমস্যার জন্য চোখের জল ফেলছেন, কয়েক বছর পর হয়তো সেই সমস্যাটির কথাই আপনার মনে থাকবে না। যে মানুষটিকে ছাড়া আজ পৃথিবীটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছে, একদিন হয়তো তাকেই আপনার জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায় বলে মনে হবে। বা মনেও হবেনা। চাইলেও তার স্মৃতি মাথাতে আনতে পারবেন না। মনেই পড়বেনা এক সময়।
সময় সব সমস্যার সমাধান করে, এ কথা সবসময় আক্ষরিক অর্থে সত্য না হলেও, সময় আমাদের সমস্যাকে দেখার চোখটা বদলে দিতে পারে। আজ যে কষ্ট অসহনীয় মনে হচ্ছে, কাল সেটাই হয়তো সহনীয় হয়ে উঠবে।
জীবনে সমস্যা থাকলেও জীবন সুন্দর। কারণ সমস্যা জীবনেরই একটি অংশ; জীবন নিজে সমস্যা নয়।
আমি এমন একটি দম্পতিকে চিনতাম, যাদের কয়েক বছরের প্রেমের পর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর সম্পর্কের মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়। স্ত্রী ক্রমে অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠেন। স্বামীকে বন্ধু, পরিবার, অনেকের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কের যন্ত্রণা আর মানসিক চাপ তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। একসময় আত্মহত্যা করেন।
এই গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, একজন মানুষ চলে গেলেন, কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকল না। অন্য মানুষগুলো তাদের মতো করে জীবন চালিয়ে গেল। কয়েক বছরের মাথায় তার স্ত্রীও ঠিকই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।
এটাই আত্মহত্যার সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি। একজন মানুষ চলে গেলে তার কষ্টের অবসান হতে পারে, কিন্তু তার চলে যাওয়ার শূন্যতা থেকে যায় অন্য অনেক মানুষের জীবনে। বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান, বন্ধু। অনেক মানুষ সারাজীবন সেই প্রশ্নের সঙ্গে বেঁচে থাকে, “আর একটু যদি পাশে থাকতে পারতাম!”
তাই জীবনের কোনো একটি মানুষ, কোনো একটি সম্পর্ক, কোনো একটি ব্যর্থতা কিংবা কোনো একটি ভুলকে আপনার পুরো জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে দেবেন না।
জীবনে সমস্যা এলে মোকাবিলা করুন।
মন খারাপ হলে কাঁদুন। নারী হোন কিংবা পুরুষ, মন খুলে কাঁদুন। কান্না দুর্বলতার চিহ্ন নয়। কখনো কখনো কান্না বুকের ভেতরের ভারটুকু একটু হালকা করে।
কেউ আপনাকে প্রতারণা করলে, সম্পর্কটি শেষ করে চলে আসুন। যে মানুষ আপনাকে মূল্য দেয় না, তার হাতে আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবেন না। নিজের জীবনের চাবিকাঠি নিজের হাতেই রাখুন।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের কাছে সৎ থাকুন। সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয় না। কিছু সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাও কখনো কখনো বেঁচে থাকার অংশ।
আর একটা কথা মনে রাখবেন, কোনো মানুষের জীবনই শতভাগ নিখুঁত নয়।
ভুল করেছেন? তাতে কী হয়েছে?
অঙ্কের খাতায় কি মানুষ ভুল করে না?
জীবনের খাতাতেও আমরা ভুল করি। কখনো ভুল মানুষকে ভালোবাসি, কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিই, কখনো ভুল জায়গায় বিশ্বাস করি। সুযোগ থাকলে ভুল শুধরে নিন। সুযোগ না থাকলে সেই ভুলটাকে জীবনের একটি অধ্যায় হিসেবে রেখে সামনে এগিয়ে যান।
একটি-দুটি ভুলের জন্য একটি সুন্দর জীবনকে শেষ করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
কারণ একটি ভুল আপনার পুরো জীবন নয়।
একটি ব্যর্থতা আপনার পরিচয় নয়।
একটি বিচ্ছেদ আপনার ভবিষ্যৎ নয়।
একটি খারাপ দিন আপনার পুরো জীবন নয়।
বেঁচে থাকুন।
সুখকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচুন, দুঃখকেও সঙ্গে নিয়ে বাঁচুন। কখনো খুব আনন্দে হাসুন, কখনো খুব কষ্টে কাঁদুন। প্রয়োজন হলে সাহায্য চান। কথা বলুন। কাউকে আপনার কষ্টের কথা বলুন।
আর আপনার আশেপাশে কেউ যদি বলে, “আমি আর বাঁচতে চাই না”, তাকে উপদেশ দেওয়ার আগে তার পাশে বসুন। তার কথা শুনুন। তাকে একা ছেড়ে যাবেন না। প্রয়োজন হলে পরিবারের মানুষকে জানান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
হয়তো আপনার কাছে সেটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার সময় দেওয়া।
কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টাই হয়তো কারও পুরো জীবনটাকে বদলে দিতে পারে।
মনে রাখবেন, কালো মেঘ যত ঘনই হোক, তার ওপাশে সূর্য থাকে।
আজকের রাতটা যত দীর্ঘই মনে হোক, সকাল আসবেই।
জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, জীবনটাকে আরেকবার সুযোগ দিন।
বেঁচে থাকুন।
কারণ জীবন, সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-ভুল-ব্যর্থতা নিয়েও, সুন্দর।
(পার্টনার চিট করলে প্রয়োজনে মুখের উপর একদলা থুতু মেরে আসুন। কিন্তু কখনো আত্মহত্যার চিন্তা করবেন না।)
বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে, একটি জিনিস পড়ার সাথে সাথে বাকীগুলোও পড়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনে এটাই বোঝাচ্ছে, আপনি আত্মহত্যা করলে, আপনার জীবনের সাথে যুক্ত মানুষগুলোও ভেঙে পড়ে। তাই আত্মহত্যা থেকে দুরে থাকুন।