13/09/2025
গল্প: অতীতের ছায়া
রাইমা সবসময়ই প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল। কলেজে থাকতেই তার দু’জনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছিল—ভালোবাসা, স্বপ্ন, আবার বিচ্ছেদও। সময়ের সাথে সাথে সবকিছু ফিকে হয়ে যায়, আরেকজনের সাথে বিয়েও হয় তার। স্বামী অর্ণব তাকে খুব ভালোবাসত, যত্ন করত। শুরুতে সবকিছু সুন্দরই চলছিল।
কিন্তু আজকের যুগে “অতীত”কে কখনো পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। রাইমা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে এখনো তার পুরোনো দু’জন প্রেমিকের সাথে অ্যাড ছিল। সরাসরি কথা হতো না, কিন্তু যখনই নিউজফিডে তাদের ছবি আসত—বিদেশ ভ্রমণ, নতুন গাড়ি, দামি লাইফস্টাইল—রাইমার মনে এক ধরনের অদ্ভুত চাপা তুলনা তৈরি হতে থাকত।
সে নিজের অজান্তেই অর্ণবকে ওই তুলনার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে শুরু করল।
– “ওরা এত ভালো করছে, তুমি কেন পারছো না?”
– “ওদের লাইফ এত কালারফুল, আমাদের এত সাদামাটা কেন?”
অর্ণব প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিত, কিন্তু ধীরে ধীরে এই অভিযোগ, তুলনা, অকারণ রাগ তাদের সংসারে অস্থিরতা আনতে শুরু করল। একসময় তাদের ছোট ছোট ভালোবাসার মুহূর্তগুলো হারিয়ে গেল, জায়গা নিলো ঝগড়াঝাটি, অবিশ্বাস আর মানসিক দূরত্ব।
রাইমা বুঝতেই পারল না যে সে আসলে নিজের অতীতকেই বর্তমানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। যে মানুষগুলো তার জীবনে আর নেই, তাদের ভার্চুয়াল উপস্থিতি তার সুখী সংসারকে ধীরে ধীরে ভয়ানক পরিণতির দিকে নিয়ে গেল।
শেষে যখন সম্পর্কটা প্রায় ভেঙে যাওয়ার মুখে, তখনই সে বুঝল—অতীতের ছায়া যদি হৃদয় থেকে না মুছে ফেলা যায়, তবে সবচেয়ে সুন্দর বর্তমানও অন্ধকারে ঢেকে যেতে বাধ্য।
অবশেষে একদিন অর্ণব ক্লান্ত হয়ে পড়ল। প্রতিদিনের অকারণ তুলনা, রাগ আর তিক্ত কথায় সে আর টিকতে পারল না। সে শান্ত গলায় রাইমাকে বলল—
– “তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু তোমার মনের এক অংশ এখনো অতীতেই আটকে আছে। আমি সেই লড়াই আর করতে পারছি না।”
রাইমা প্রথমে ভেবেছিল এটা সাময়িক রাগ। কিন্তু অর্ণব আর ফিরে এল না। সংসার ভেঙে গেল—যেটা সে নিজ হাতে গড়েছিল, সেটা আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
তখনই রাইমা বুঝল, সে আসলে কখনোই তার পুরোনো সম্পর্কগুলোকে ছাড়েনি। সে শুধু ভেবেছিল ছেড়েছে, কিন্তু তাদের ছবির মতো ছোট্ট জিনিসও তার মনের ভেতরে ঈর্ষা, হীনমন্যতা আর ক্ষোভ বুনে চলেছিল।
শেষে সব হারিয়ে একাই বসে থাকল সে—হাতে ফোন, সামনে সোশ্যাল মিডিয়া, আর বুকের ভেতরে এক অমোচনীয় শূন্যতা।
অতীতের ছায়া তার বর্তমানটাকে গ্রাস করে নিলো, আর ভবিষ্যতটা অন্ধকার করে দিলো।